রোববার, ০৭ আগস্ট ২০২২, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ১১:০৪

খুলে গেল দখিনের দুয়ার। অনেক অপেক্ষা, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, সংকল্প শেষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে উৎসবে মাতে দেশ। স্বাধীনতার পর এত বড় উৎসব বাঙালির জীবনে খুব কমই এসেছে। মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়সংকল্প নেতৃত্বের কারণেই অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে। তাই জনপ্রত্যাশা ছিল তার নামেই পদ্মা সেতুর নাম হবে ‘শেখ হাসিনা সেতু’। আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিপরিষদ থেকে প্রস্তাবও যায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। নামে নয়, কাজেই তিনি বিশ্বাসী। ক্রমাগত তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতির নিয়মে এক দিন সবাইকে চলে যেতে হবে। তিনিও থাকবেন না। তাই রবীন্দ্রনাথের শাজাহান কবিতার চরণ এক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক— ‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ/ তাই তব জীবনের রথ/পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারংবার/ চিহ্ন তব পড়ে আছে তুমি হেথা নাই।’

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্পই নয়, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও দৃঢ়সংকল্প নেতৃত্বের সাহসের প্রতীক যেন। সত্যি বলতে কি সেতু উদ্বোধনের পর এখন বাংলাদেশ প্রবেশ করবে অন্য এক অধ্যায়ে। পদ্মা শুধু কংক্রিটের সেতুই নয়, বাংলাদেশে রাজনীতিতে দীর্ঘকালীন ইতিবাচক প্রভাববিস্তারী সেতু হিসেবেও পদ্মা সেতুর নাম রয়ে যাবে। পদ্মা সেতু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক নতুন জাগরণ নিয়ে আসবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এ সেতু। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘটবে অভূতপূর্ব উন্নয়ন। মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহনে সময় বাঁচবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসায়-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে নিশ্চিত করেই।

পদ্মা সেতু ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। এ সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগের একটা বড় লিংক। তাই আঞ্চলিক বাণিজ্যে এ সেতুর ভূমিকা অপরিসীম। তাছাড়া পদ্মার দুপাড়ে পর্যটন শিল্পেরও ব্যাপক প্রসার ঘটবে। সত্যি মাথা নোয়ায়নি বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এতে দেশে এক অভূতপূর্ব জনজাগরণের সৃষ্টি হয়। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এক অভিনব দেশাত্মবোধের উন্মেষ ঘটে। সবাই ‘যার হাতে যা আছে’ তাই নিয়ে পদ্মা সেতুর জন্য সাহাঘ্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

অনেক জল ঘোলা করা হয়েছে। ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হয়েছে। পদ্মা সেতুতে ‘মানুষের মাথা লাগবে’ বলে গুজবের ডালপালাও গজিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো বাধাই স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি। মানুষ আসলে তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। পদ্মা সেতু যেন এই সত্যটিকে আরো বেশি করে উদ্ভাসিত করছে।

সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করেছিল। একই পথ অনুসরণ করেছিল অন্য উন্নয়ন সহযোগীরাও। পদ্মা সেতু প্রকল্পে সম্ভাব্য দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয় কানাডার একটি আদালতেও। ইতিমধ্যে সে মামলার রায়ে আদালত একে নিছকই ‘অনুমান ও গুজব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং কানাডার সেই কোম্পানির অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তাকে অব্যাহতিও দেন। দুর্নীতির অভিযোগটি কেবল কিছু ব্যক্তি, সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও।

তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরে যেতে হয়। একজন সচিব ও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং তাদের কিছুদিন কারাবাসও করতে হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ পেতে কানাডার একটি কোম্পানি ঘুষ দিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ব্যাপারে দুই দফা তদন্ত করেও অভিযোগের সত্যতা পায়নি। এটা ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক বিরাট দুঃসংবাদ। সরকারও বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্েত বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন তত্কালীন মহাজোট সরকারের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। সেজন্য ক্ষমতায় এসেই পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার।

বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তের কারণে মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। যদিও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হচ্ছে। নানামুখী অসুবিধা ও প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আচরণ ছিল স্পষ্টতই অপেশাদারি। এর পেছনে দেশে-বিদেশে অনেকেই কলকাঠি নেড়েছেন এমন অভিযোগও আছে। স্বপ্নের এই সেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। বাংলাদেশ যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে তার প্রমাণ পদ্মা সেতু।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা ও দৃঢ়সংকল্প নেতৃত্বের সাহসের প্রতীক হয়ে থাকবে এটাই আমাদের বিশ্বাস। দেশের সর্ববৃহত্ এ নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা পারি। এটা ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, বড় সিদ্ধান্তের বিষয়। এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত ছিল। এমন বৃহত্ ও খরস্রোতা একটা নদীর ওপর এত বড় সেতু নির্মাণ করে আমরা বিশ্বের সামনে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম। আমরা বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা যদি সৎ ও অবিচল থাকি তবে আমার যা চাই, তাই করতে পারি।’ বাংলাদেশ যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে তার প্রমাণ পদ্মা সেতু। স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ২২ জুন সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সব ষড়যন্ত্র-প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি। মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে লাখো শুকরিয়া। আমি বাংলাদেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে চাই— তারা আমার পাশে ছিলেন। তাদের সহযোগিতার জন্যই আজ পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।’

২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করা হয়। এরপর শুরু হয় ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের পেছনে কে বা কারা ছিল তা বহুবার বলেছি। ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের জন্য দেশের মানুষের কেউ ক্ষতি করতে পারে, এটা সত্যিই কল্পনার বাইরে ছিল। এই ষড়যন্ত্রকারীরা ছাড়াও বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরের একটি গ্রুপ ছিল যারা অন্যাঘ্যভাবে কিছু বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল।

পদ্মা সেতু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক নতুন জাগরণ নিয়ে আসবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এ সেতুটি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘটবে অভূতপূর্ব উন্নয়ন। মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহনে সময় বাঁচবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসায়-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে নিশ্চিত করেই। পদ্মা পাড়ের কিছু মানুষ তাদের প্রাক্তন পেশা হারালেও বৃহত্তর অর্থে কর্মসংস্থান বাড়বে। যাতায়াত সহজ ও সময় কম লাগায় দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর একটি সেতুবন্ধ রচিত হবে। বাড়বে বিনিয়োগ। দক্ষিণাঞ্চলে নতুন নতুন ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং শিল্পের প্রসার হবে। জিডিপিতেও বড় অবদান রাখবে পদ্মা সেতু।

হাজার হাজার মানুষের শ্রমে স্বপ্নের সেতু নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, জাপান, ডেনমার্ক, ইতালি, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, নেপাল ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলী এ সেতু নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নির্মাণ শৈলীর দিক থেকেও এটি অনন্য এক স্থাপনা। আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল দেশপ্রেম। দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়েই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আপামর জনতা। ৩০ লাখ প্রাণ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন ভূখণ্ড, লাল সবুজের পতাকা আর জাতীয় সংগীত—‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

দেশপ্রেম থাকলে, সত্য আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃঢ়সংকল্প থাকলে পদ্মা সেতুর মতো স্থাপনা সৃষ্টি করা কোনো ব্যাপার নয়। আমরা মহাকাশে বঙ্গবন্ধুর নামে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি। এখন শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। আমরা যেন বীর শহিদদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও আত্মদানের কথা কখনো ভুলে না যাই। তবেই বাংলাদেশ অবাক করা সব সাফল্য বয়ে আনবে। সাফল্যের সেই আনন্দ উচ্ছ্বাসে কাঁপবে দেশ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চাই মূল্যবোধভিত্তিক নির্মল সমাজ

বরিস জনসন ও রাজনীতিতে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

রেললাইন ব্যবহার ও রেলক্রসিং পারাপার

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিধানসমূহ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিজ্ঞান প্রচারে রবীন্দ্রনাথ

চীন-মার্কিন মুখোমুখি অবস্থায়, শান্ত তাইওয়ান

দক্ষিণাঞ্চলে খাতভিত্তিক উন্নয়নের সম্ভাবনা

শোকাবহ আগস্ট ভোলার নয়