শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘মতৈক্য’ ছাড়া মুক্তি বহুদূর

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ১৩:১৭

বিশ্ব এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করিতেছে। দুর্ভোগ-দুর্বিপাকে পড়িয়া অস্থিরতা বাড়িয়াছে প্রতিটি দেশেই। করোনা মহামারির প্রকোপ থামানো যায় নাই— সহস্রতম দিবস স্পর্শ করিতে চলিয়াছে ইহা। সার্বিক পরিস্থিতি আরো নাজুক হইয়া উঠিয়াছে ইউক্রেন যুদ্ধের দামামায়। গ্লোবাল ভিলেজের ছকে পড়িয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির অবস্থা কাহিল হইতেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ঢেউ আছড়াইয়া পড়িতেছে প্রতিটি দেশে। স্বভাবতই এই বাস্তবতার বাহিরে নহে বাংলাদেশ। দেশের অভ্যন্তরে স্থবিরতার লক্ষণ সুষ্পষ্ট। কোভিড মহামারির কারণে লম্বা সময় ধরিয়া স্বাভাবিক জীবনাচরণ রুদ্ধ হইয়া যাইবার ফলে মানুষের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ঠেকিয়াছে তলানিতে।

লক্ষ করা যাইতেছে—সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন হইয়া উঠিয়াছে, রেমিটেন্স নিম্নমুখী হইবার পাশাপাশি উর্ধ্বমুখী হইতেছে মূল্যস্ফীতি। এইরূপ পরিস্থিতির মধ্যেই বন্যায় প্লাবিত হয় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বহু এলাকা। ১২২ বছরের রেকর্ড ভাঙ্গা বন্যার ক্ষত না শুকাইতেই আভাস মিলিতেছে নূতন প্লাবনের। এই যখন অবস্থা তখন দেশে বাড়িতেছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করিয়া আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-আযহায় সমগ্রদেশে কোটি কোটি মানুষ সড়ক, মার্কেটে নামিলে পরিস্থিতি বেসামাল হইয়া পড়িবে। সেক্ষেত্রে সরকার লকডাউন দিতে বাধ্য হইলে থমকাইয়া দাঁড়াইবে অর্থনীতি। এই সকল শঙ্কা, ঘটনা-দুর্ঘটনার ঘূর্ণিপাকে পড়িয়া মানুষের জীবনযাপনে হাপিত্যেস বাড়িতেছে। প্রশ্ন উঠিতেছে— ইহা হইতে নিষ্কৃতির পথ কতদূর?

মাথায় রাখিতে হইবে, একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত সভ্যতার রঙ্গীন আলোয় বাস করিতেছি আমরা। অদৃশ্য ভাইরাস যখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রাণ সংহার করিতেছে তখন বিশ্বনেতারা মাতিয়াছেন রক্তের হলিখেলায়। শুধু রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধই নহে, উপআঞ্চলিক, আঞ্চলিক দ্বন্দ্বও ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়া উঠিতেছে। পারষ্পারিক বৈরিতা যুদ্ধের রূপ লইতেছে। রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভেদ, বিভাজন বাড়িতেছে— প্রসারিত হইতেছে স্ব স্ব নিরাপদ বলয়, সেইফ জোন আঁকড়াইয়া ধরিবার চিত্র। মহামারি কিংবা অর্থনৈতিক ধ্বস নিয়া চিন্তার পরিবর্তে বিশ্বনেতৃত্বের এই খামখেয়ালিপনা বিশ্বব্যবস্থাকে করিতেছে ভঙ্গুর।

সাম্প্রতিক শ্রীলংকার করুণ পরিণতি বিশ্ববাসীর চোখে পড়িলেও অনেক রাষ্ট্র কাহিলাবস্থায় পড়িয়াছে। কোনো কোনো রাষ্ট্রে জ্বালানীর মূল্য আকাশচুম্বি হইয়াছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিংবা খাদ্যদ্রব্য আমদানী লইয়া চোখে শরিষার ফুল দেখিতেছে অনেক দেশ। মোটকথা, মন্দাবস্থা স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে ক্রমশ। জাতিসংঘের উচ্চারণও একই। জাতিসংঘের সহযোগি সংস্থা ‘আঙ্কটাড’ ইতিমধ্যে উষ্মা প্রকাশ করিয়াছে, চলমান মন্দায় বিশ্ব অর্থনীতিতে চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হইবে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। যাহা পূর্বে প্রাক্কলন করা হইয়াছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

সংস্থাটির মতে, এই মন্দা রাশিয়াতে দীর্ঘমেয়াদি রূপ লইবে। পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপসহ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিও এ মন্দার হাওয়া হইতে পরিত্রাণ পাইবে না। এ করুণাবস্থার মধ্যে দেশগুলি তাহাদের উন্নয়ন ব্যয় কমাইতে বাধ্য হইবে। উপরন্তু, এই ভৌগোলিক সমস্যা বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে উসকাইয়া দিয়া বড় অনর্থ ডাকিয়া আনিবে। প্রকৃতপক্ষে এই চিত্রের বাস্তব অভিঘাত ইতিমধ্যে লক্ষ করা গিয়াছে। খাদ্য এবং জ্বালানির মূল্য ক্রমাগত বাড়িতে থাকায় উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে নানা সামাজিক অস্থিরতা। খাবার এবং জ্বালানির উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিনিয়োগ এবং উত্পাদন-বিপনন পড়িতেছে বাধার মুখে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বাড়িয়া যাইবার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িতেছে। আগামী দিনগুলিতে বৈদেশিক ঋণ এবং সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রেও পড়িতে হইবে বেকায়দায়।

দেশে-বিদেশে উপর্যুক্ত অচলাবস্থার পর্যবেক্ষণে আমাদের বক্তব্য, এই অবস্থা হইতে উত্তরণের একমাত্র পথ হইল ‘মতৈক্য’। চলমান প্রতিকূলতার আশু ভয়াবহতা বিবেচনায় বিশ্বনেতাদের এক কাতারে দাঁড়াইতে হইবে। পাওয়ার পলিটিক্সের গন্ডি হইতে বাহির হইয়া অশান্তি-অরাজকতার শিকল ছিড়িবার পথ খঁুজিতে হইবে। দ্বন্দ্ব, সংঘাতকে না বাড়াইয়া মানবতার পথে হাঁটিতে হইবে। উন্নয়নশীল দেশগুলিকে চলিতে হইবে আশু বিপদ-ভোগান্তির  কথা মাথায় রাখিয়া। অন্যথায়, কঠিন পরিস্থিতি পথ আগলাইয়া দাঁড়াইবে। উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশের জন্য ইহাই এখন বাস্তবতা।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন