করোনা ভাইরাস শনাক্তের ৮৪৭তম দিবসে দাঁড়াইয়াও করোনামুক্তির আশার বাণী নাই। বরং পরিস্থিতি আবার আশঙ্কাজনক। এই দুঃসংবাদ শুধু বাংলাদেশের জন্যই নহে। ‘পেশেন্ট জিরো (প্রথম শনাক্ত রোগী)’ মিলিবার ৯১৪তম দিন অতিক্রম করিতেছে বিশ্ব। এই দীর্ঘ সময়কালে কোভিডের একচ্ছত্র দাপটে অসহায় হইয়া পড়িয়াছে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ। কোনো ব্যবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণ করা যাইতেছে না অদৃশ্য ভাইরাসকে। ৫০ কোটি মানুষ সুস্থ হইয়াছে বটে, তবে সংক্রমিত হইয়াছে সমপরিমাণ। কী সাংঘাতিক এই ক্ষুদ্রকায় ভাইরাস! কোনো রোগ-ব্যাধি কিংবা ভাইরাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু বা আক্রান্ত হওয়ার নজির বিশ্বে এইটিই প্রথম। বিপদ কাটে নাই, বরং ধাইয়া আসিতেছে নূতন রূপে। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ-মৃত্যু বাড়িতেছে। বিভিন্ন দেশ রহিয়াছে করোনার চতুর্থ কিংবা পঞ্চম ঢেউয়ের মুখে। বিগত কয়েক দিন যাবৎ বাংলাদেশেও ঊর্ধ্বমুখী হইতেছে সংক্রমণ, মৃত্যু। ইতিমধ্যে দেশে করোনায় ঝরিয়াছে প্রায় ৩০ হাজার তাজা প্রাণ। সুস্থ ও আক্রান্ত হইয়াছে ২০ লক্ষ। করোনা-প্রকোপের জ্বালামুখে পড়িয়া অনাকাঙ্ক্ষিত লকডাউনে অর্থনৈতিক অবস্থা স্থবির হইয়া দুর্ভোগ-দুর্বিপাকের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন হইয়া উঠে মানুষের জীবনাচরণ। অবস্থা সামাল দিয়া সকলকে টিকার আওতায় আনার পর এখন চলিতেছে বুস্টার ডোজ। মধ্যে কিছুদিন সংক্রমণ নিম্নমুখী হইবার ফলে মানুষের মনে যখন স্বস্তি ভাব বিরাজ করিতেছে, তখন নূতন করিয়া ঢেউ আছড়াইয়া পড়িবার বার্তা আসিতেছে।
এইরূপ পরিস্থিতিতে করণীয় কী, তাহা নির্ধারণে আমাদের পিছনে ফিরিয়া তাকাইবার অবকাশ রহিয়াছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে টায়ফয়েড জ্বরের প্রকোপ দেখা দিলে জনগণ আতঙ্কিত হইয়া পড়ে। আয়ারল্যান্ড হইতে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়া মেরি মেলন নামক একজন রাঁধুনির মাধ্যমে আক্রান্ত হয় অন্তত ১০০ ব্যক্তি। ভয়াবহ সেই টায়ফয়েডে প্রতি ১০ জনে একজন মারা গিয়াছিল। কোভিডের ক্ষেত্রেও আমরা এইরূপ চিত্র লক্ষ করিয়াছি। আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটিতেছে। এই বিষয়টিকে মোটা দাগে চিহ্নিত করিয়া ইহাতে জোর গুরুত্ব দিতে বলা হইতেছে শুরু হইতেই। যেই হেতু করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত প্রতিটি ব্যক্তি এক একজন ‘সুস্থ জীবাণু বাহক’, কাজেই সংক্রমিত ব্যক্তিই থাকিতেছেন সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এই ক্ষেত্রে দুঃখজনক সত্য হইল, সংক্রমিত কিংবা সুস্থ কেউই স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করিতেছেন বলিয়া মনে হয় না। সর্বত্রই স্বাস্থ্যবিধির প্রতি চরম অনীহা লক্ষ করা যাইতেছে। এই অবস্থার মধ্যে পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসব আয়োজনকে ঘিরিয়া কয়েক কোটি মানুষ সড়ক, মার্কেটে নামিলে সংক্রমণ-মৃত্যু বৃদ্ধি পাইবে— অবস্থাদৃষ্টে এইটি পরিষ্কার দেখা যাইতেছে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করিতেছেন— করোনা ভাইরাস পৃথিবী হইতে বিদায় নেয়নি এখনো। তাহার বাস্তব চিত্র দেখা যাইতেছে বিশ্বের সর্বত্রই। অথচ সংক্রমণ, মৃত্যু এবং নূতন নূতন ধরনের আশঙ্কাকে আমলে লইতেছি না আমরা। উপরন্তু, স্বাস্থ্যবিধিকে উপেক্ষা করিয়া যথেচ্ছ চলাফিরা করিতেছি, যেন করোনার ক্ষত শুকাইয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইয়া গিয়াছে। এমতাবস্থায়, ফাইনাল বাঁশি বাজিবার পূর্বেই জয়োত্সবে মাতিয়া মাঠে নামিয়া পড়িবার মতো অপরিণামদর্শিতার খেসারত গুনিতে হইবে—সন্দেহ নাই।
উদ্বেগের সহিত লক্ষ করা যাইতেছে, টিকা কিংবা বুস্টার ডোজ গ্রহণের পরও সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে। কোনো কিছুতেই বাগে আনা যাইতেছে না কোভিডকে। দীর্ঘ বন্ধে প্রতিটি দেশই কাহিল অবস্থায় রহিয়াছে। উত্পাদন-বিপণন ভঙ্গুর হইয়া অর্থনৈতিক দুরবস্থা চরমে উঠিয়াছে। নূতন লকডাউনের ধকল সহ্য করিবার মতো অবস্থায় নাই কোনো রাষ্ট্রই। এমতাবস্থায়, করণীয় একটাই— স্ব স্ব উদ্যোগে স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ অনুসরণ। সকলে সতর্ক-সচেতন হইলেই এই আকাল অবস্থা হইতে নিষ্কৃতি মিলিতে পারে। শুধু জনগণ স্বাস্থ্যসচেতন হইলেই করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করা যাইবে— কোভিড হইতে উত্তরণের চাবি রহিয়াছে জনগণের হাতেই।
