গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদিত হয়েছে। ১ জুলাই থেকে এই বাজেট কার্যকর বা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এবারের জাতীয় বাজেট ছিল নানা কারণেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা জটিল অর্থনৈতিক সমস্যা ও সংকটকালীন অবস্থায় এই বাজেটে প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত আর কখনোই এমন জটিল অবস্থার মধ্যে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হয়নি। তাই ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যা কোনো দেশ বা অঞ্চলের একার পক্ষে সমাধান বা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী গত আড়াই বছর ধরে চলমান করোনা অতিমারির প্রভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক জটিলতার আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবরোধ এবং এর পালটা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া জ্বালানি তেল বিক্রিতে শর্তারোপ এবং খাদ্যপণ্য রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
এমনই এক অবস্থায় অর্থমন্ত্রী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়ন করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেট ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। মুদ্রানীতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটা সব সময়ই বাজেটের অনুগামী হয়। অর্থাৎ, বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, মুদ্রানীতিতে সেই সব টার্গেট অ্যাড্রেস করে তা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় লক্ষ করা গেছে। এবারের বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত রাখা। বাজেটে চলতি অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল গ্রহণ করেছে। কিন্তু তাদের এই কৌশল বিভিন্নভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমানো হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বাজেটে চলতি অর্থবছরের জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার খুব একটা বাড়েনি। তাই এক লাফে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশে উন্নীত হওয়াটা কোনোভাবেই অর্জনযোগ্য বলে মনে হয় না। এদিকে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলে অবশ্যই ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য এবং বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জন্য ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। গত অর্থবছরে এটা ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বাস্তবে গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবাহের হার ছিল ১১ শতাংশের কিছু বেশি। বাজেটে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর কথা বলা হলেও মুদ্রানীতিতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যক্তি খাতে অর্থায়ন কমে যায়। বাজেট ঘাটতির ৪৩ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে মেটানো হবে। এজন্য ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে বর্ধিত মাত্রায় ঋণ গ্রহণ করলে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে। ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে সার্বিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিনতর হয়ে পড়তে পারে।
কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের মতে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়াতে হলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার জিডিপির পরিপ্রেক্ষিতে ৪ শতাংশ বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে, তাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার অন্তত ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে প্রণীত ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৬তম। এই অবস্থা থেকে শিগ্গিরই কি বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে?
গত অর্থবছরে (২০২১-২০২২) প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন (৫ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। এই সাফল্যের দৃশ্যমান কিছু কারণ উল্লেখ করা হলেও এর প্রকৃত কারণ হলো, মূল্যস্ফতির ঊর্ধ্বগতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত-অনুন্নতনির্বিশেষে অধিকাংশ দেশের ভোক্তারা তাদের ভোগব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বেশির ভাগ জুড়ে আছে তৈরি পোশাক। বাংলাদেশ লো-এন্ড তৈরি পোশাক রপ্তানি করে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তারা বাংলাদেশি তৈরি পোশাক লুফে নিচ্ছে। মূলত এ কারণেই রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করতে পেরেছে। অর্থাত্, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য ‘শাপে বর’ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। তৈরি পোশাক খাত আমদানিনির্ভর কাঁচামালভিত্তিক বিধায় এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন করে। অবশিষ্ট ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি বাবদ পুনরায় দেশের বাইরে চলে যায়। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আমদানি বাণিজ্যে উলটো ফল দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে আমদানি ব্যয় অনেকটাই বেড়ে গেছে। স্থানীয় বাজারে মার্কিন ডলারের মূল্য বাংলাদেশ ব্যাংক কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে অনেক দিন ধরেই। এর বিরূপ প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।
মার্কিন ডলারের ব্যাংক রেট এবং কার্ব মার্কেট রেটের মধ্যে ব্যবধান এক পর্যায়ে ৯ টাকায় উন্নীত হয়েছিল। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের উপার্জিত অর্থ বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাচ্ছে। ফলে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে স্থানীয় বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১০ টাকারও বেশি বেড়েছে। আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত অধিকাংশ পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষগুলো খুবই অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির হার আরো অনেক বেড়ে যাবে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ এমনও বলছেন, সরকার যদি মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশে সীমিত রাখতে পারে, সেটাই হবে একটি বিরাট সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অর্থনীতি সংবলিত দেশের মূল্যস্ফীতির হার জুন মাসে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গত ৪০ বছরের মধ্যে দেশটি আর কখনোই এত উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেনি। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার বর্তমানে ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এটা দরিদ্র মানুষের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।
কারণ মূল্যস্ফীতির যে হার প্রদর্শন করা হচ্ছে তা গড় হার। আমরা যদি খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম আলাদাভাবে প্রদর্শন করি, তাহলে তা আরো অনেক বেশি। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিছুদিন আগে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির হার ১২ শতাংশের ওপরে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে আমানত সংগ্রহের হার ছিল বেশ উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ কোটি টাকা করে আমানত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু এ বছর তা কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করছে। আর মূল্যস্ফীতি যদি ৭ বা তারও বেশি হয়, তাহলে বছর শেষে আমানতকারীকে লোকসান গুনতে হবে। কেউ নিশ্চয় ব্যাংকে আমানত রেখে লোকসান দেবে না। অর্থমন্ত্রী তার এক বক্তব্যে বলেছেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার মতো।
এছাড়া ২৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আদায় করা যাচ্ছে না। ২ শতাংশ এককালীন ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃ তপশিলিকরণের সুযোগ দেওয়ায় ১৩ হাজার ৩০৭ জন ঋণখেলাপি ও প্রতিষ্ঠান তাদের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃ তপশিলিকরণ করে নিয়মিত করেছেন। এদের কাছে কত টাকা পাওনা আছে, অর্থমন্ত্রী তা উল্লেখ করেননি। এদের কাছে পাওনা বিপুল অঙ্কের ঋণ আবারও খেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, আজ থেকে আর এক টাকাও খেলাপি ঋণ বাড়বে না। কিন্তু তার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি।
বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে টার্গেট পূরণের সাফল্য দাবি করা যেতে পারে, কিন্তু সেটা দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে ফেলতে পারে। তাই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা অর্জনের জন্য আমাদের আরো বাস্তববাদী হতে হবে। এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে দেশের অর্থনীতি সমস্যাগ্রস্ত হতে পারে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক
