বিভীষিকাময় যুদ্ধ ও কলেরা! 

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ০৫:৫৮

পূর্ব ইউক্রেনের দোনেত্স্ক প্রদেশের প্রধান শহর মারিউপোল। সুন্দর ছিমছাম এ শহরটি আরব সাগরের তীরে অবস্থিত একটি ব্যস্ত বন্দরনগরী। শহরটি এখন পুরোপুরি রুশ সেনাদের দখলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরটির রাস্তাঘাট এখন নীরব। ভাঙাচোরা বাড়িঘরে যারা রয়েছেন তারা কার্যত অবরুদ্ধ। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নেই। খাবার সরবরাহ নেই। ড্রেনগুলো উপচে গেছে, পানি সরবরাহের সঙ্গে মিশে গেছে পূতিগন্ধময় ময়লা আবর্জনা। যেখানে-সেখানে অসমাধিস্থ মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শহরটি মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবু যুদ্ধাহত ও বেঁচে যাওয়া অনেকে প্রিয় জন্মস্থানের মায়ায় আঁকড়ে রয়েছেন নিজের ভিটেমাটিকে। ভয়ংকর মহামারির জন্য শহরটি প্রস্তুত হয়েছিল অনেক আগেই। গত মে মাস থেকে কলেরা সংক্রমণ শুরু হয় মারিউপোল শহরে। শেষ খবর পর্যন্ত সেখানে এখনো কলেরা পরিস্থিতি ভয়াবহ।

মারিউপোলের অবকাঠামো ভেঙে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নেই কোনো জীবনের আশা-ভরসা। স্বাস্থ্য পরিষেবার হার একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। তবু ১ লাখ মানুষ এখানে বন্দিময় জীবন যাপন করছে। সুপেয় পানির সংকট, হাসপাতালে চিকিৎসা-সংকট, ওষুধসংকট পরিস্থিতিকে খুবই ভয়াবহ করে তুলেছে। বিশেষ করে কলেরার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে মানুষ বেঁচে থাকার সব আশার প্রদীপ দিন দিন নিভে যেতে শুরু করেছে। উদ্ধারকারী ও সেবাদানকারীর অভাবে কলেরা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর লাশের সত্কারে সংকট দেখা দিয়েছে। লাশের সারি দীর্ঘ হতে শুরু হওয়ার পর কলেরার ভয়ে উদ্ধারকারীদের তৎপরতা কমতে থাকে। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট বেড়ে গেলে মানবিক পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

ইউক্রেনের সৈন্যরা রুশ বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণ ও কলেরার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে নিজেদের রক্ষা করতে না পেরে দক্ষিণে পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। শহরটিতে কলেরা ছাড়াও অন্যান্য বায়ুবাহিত সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় উদ্ধারকারীর অভাবে মানবতা এখানে বোবা হয়ে গেছে। ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যুগে যুগে যুদ্ধের বিভীষিকার পর কলেরা পৃথিবীর দুর্বল স্থানগুলোতে হানা দিয়েছে। যুদ্ধ যখন বন্ধ কলেরার মহামারি হওয়ার প্রবণতা তখন তেমন একটা দেখা যায় না। আগেকার দিনে মনে করা হতো, কলেরা মানুষের পয়োনিষ্কাশনের গন্ধ থেকে বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। তখন লোকেরা সুপেয় পানির উত্সের অভাবে পুকুরের পানি পান করত। অথবা রোগীর মলমূত্র ও নোংরা কাপড়চোপড় পার্শ্ববর্তী পুকুর-ডোবা অথবা নদীর পানিতে ধৌত করত। একই জায়গায় থালাবাসন ধোয়া ও গোসল করত। সেই পানি দ্বারা সংক্রমিত হয়ে এক এক পরিবারের সবাই এবং পরবর্তী সময়ে গ্রামের বা এলাকার সবাই আক্রান্ত হয়ে সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যেত। নলকূপের পানি পান করার পূর্বেকার দিনগুলোতে মানুষ ডায়রিয়া ও কলেরায় সহজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ত। অতি দ্রুত আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে বহু মানুষ একসঙ্গে মারা যেত।

উনিশ শতকেও মানুষ ভাবত যে বাতাসের মাধ্যমে কলেরা ছড়ায়। ব্রিটিশ চিকিত্সক জন স্নো প্রথম ধরে ফেলেন যে, বাতাসের পচা দুর্গন্ধ নয়— বরং দূষিত পানির মাধ্যমে কলেরা ছড়ায়। এরপর প্রচারিত হয় কলেরা পানিবাহিত রোগ। এর বাহন এক ধরনের ব্যাক্টেরিয়া। যার নাম ‘ভিবরিও কলেরা’। এই জীবাণু পানি ও খাদ্যকে দূষিত করে আক্রান্ত ব্যক্তির মল ও বর্জে্যর সংস্পর্শে পানি দূষণের মাধ্যমে।

ডাব্লিউএইচওর এক হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রতি বছর ২১ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ কলেরায় মারা যায়। ১৯০০ ও ১৯২০ সালের কলেরা মহামারিতে শুধু ভারতে ৮০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ইয়েমেনে ২০১৭ সালে এ সপ্তাহে কলেরায় ১১৫ জন মৃতু্যবরণ করেছিল। হাইতিতেে ২০১০ সালে ভূমিকম্পের পর খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে ৮ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিল। তার মধ্যে ৯ হাজার মানুষ মৃতু্যবরণ করেছিল। এসব থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, যুদ্ধ ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের অব্যবহিত পরে কোনো জনগোষ্ঠীতে ভয়াবহ খাদ্যসংকট, সুপেয় পানির সংকট ও জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সংকট থেকে কলেরা মহামারির আকার ধারণ করে। মারিউপলে যা ঘটছে তা এরূপ বিপর্যয়ের ফল বইকি।

আসলে পৃথিবী থেকে কোনো মহামারি বিদায় নেয়নি। কলেরা, গুটিবসন্ত, যক্ষা, মাঙ্কিপক্স, প্লেগ, করোনা কিছুই কখনো দূর হয়নি, শেষ হবে না। এগুলোর প্রকোপ সাময়িকভাবে কমে গিয়ে, কিছুটা দমে গিয়ে জীবাণুরা ঘুমিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের ক্রমাগত অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার সুযোগ বুঝে যে কোনো সময় পুনরায় এসব মহামারি মানবতার বিপর্যয় সূচিত করে মহাবিপদে ফেলে দিতে পারে। করোনার ধকল না কাটতেই ইউক্রেনে যুদ্ধের বিভীষিকা শুরু হলে কলেরার জীবাণু পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে। তাই পানিদূষণ ও খাওয়ার পানির ব্যাপারে আমাদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। খাওয়ার স্যালাইন, দেহে পুশ স্যালাইন মজুত রাখতে হবে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে যে কলেরার উদ্ভব, তা ঠেকানো যাবে কীভাবে? যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কি কোনো সুযোগ আছে? যারা মারিউপোলে এখনো রয়ে গেছেন, তারা একই সঙ্গে দুটি যুদ্ধ মোকাবিলা করছেন। একটি ইউক্রেন যুদ্ধ। আরেকটি কলেরার বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই। কিন্তু শেষ লড়াইটা তারা করবেন কীভাবে? যুদ্ধের কারণে মারিউপোলে এখন নেই কোনো স্বাস্থ্যসুবিধা। তাদের সেই সামর্থ্যকে ধ্বংস করা হয়েছে। এজন্য হঠকারী যুদ্ধবাজরাই দায়ী। মারিউপোলের যুদ্ধপীড়িত, ভয়ার্ত, দুঃখী মানুষগুলোকে কলেরা মহামারি থেকে বাঁচানোর জন্য ডব্লিউএইচও এবং ইউএনএইচসিআরকে বিশেষ ব্যবস্থায় জরুরি ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। নতুবা সেখানে যুদ্ধের চেয়েও বেশি মানুষ মারা যাবে কলেরায়।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন