পদ্মা সেতু: বিদেশি নাগরিক ও কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ১১:৪১

বাঙালি জাতির পরম আরাধ্যের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরম লগ্নের কথা উল্লেখ করে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কয়েক জন বিদেশি নাগরিক ও কূটনীতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তা এখানে উল্লেখ করলাম। গত ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে বিসিএস মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবনগর অফিসার ও কর্মচারী সমিতির কার্যালয় ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। ’৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দ-আবেগে একে অন্যকে আলিঙ্গনে মেতে ওঠেন। সমস্বরে গেয়ে ওঠেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুরালের সামনে সবাই সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘জাতির জনকের কন্যা পেরেছেন। বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন।’

অমিত সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। সেই দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আজ সাত আসমান স্পর্শ করেছে। বাঙালির বীরত্বের ও বিজয়ের প্রতীক পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন বিশ্ববাসী গভীর আগ্রহে প্রত্যক্ষ করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠস্বরে কণ্ঠ মিলিয়ে বাংলার আকাশ-বাতাস জুড়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে— ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর, তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। বাংলাদেশের স্বর্ণযুগের মাহেন্দ্রক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশের সামনে এখন বিশ্বের সব দুয়ার খোলা। জাগো জাগো বিশ্ববাসী, তোমার সাগরতীরে এখন বাংলার সোনার তরী।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার শ্রী বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান। বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের হাইক? মিশনার বলেন, ‘যুগান্তকারী এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে ভারতের সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছে।’ তার এই মন্তব্যটি ছিল লক্ষ করার মতো, ‘বহুল প্রতীক্ষিত প্রকল্পটির সমাপ্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের সাক্ষ্য দেয়। এ সাফল্য প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে প্রমাণ করে এবং এতে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, যা আমরা অবিচলভাবে সমর্থন করে এসেছি, যখন বাংলাদেশ একাই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’

বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জন্য বাংলাদেশকে তার দেশের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান একইভাবে। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু আমার কাছে সাহসের একটি প্রতীক, সংকল্পের প্রতীক এবং সমৃদ্ধিরও প্রতীক।’ তিনি বলেন, ‘আজ একটি মহত্ দিন! বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা বহুমুখী সেতু অবশেষে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, আর এক দশকের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে! এ পর্যায়ে আমি এই অসামান্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে চাই!’ তিনি আরো বলেন, ‘সেতুটি আমার কাছে সাহসের একটি প্রতীক। স্বল্পোন্নত দেশ বাংলাদেশ এমন সেতু নির্মাণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তার পরও বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বপ্ন অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আজ সেতুটি শুধু বাস্তবায়নই হয়নি, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে এর শত ভাগ নির্মিত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, যদি সাহসের কোনো সীমা না থাকে, তাহলে আকাশ তার সীমা।’

বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়, ‘এই সেতু দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপনে বাংলাদেশের নেতৃত্বের আরেকটি উদাহরণ। মানুষ ও পণ্যকে দক্ষতার সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য টেকসই পরিবহন-অবকাঠামো নির্মাণ অন্তভু‌র্ক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উত্সাহিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ভেতরে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়-বাণিজ্যের বৃদ্ধি হবে, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে অযুত-নিযুত অভিবাদন জানানো হয়েছে। বিশেষত প্রজাতন্ত্রের বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির শৌর্য-বীর্য ও বিক্রম-পরাক্রম যারা প্রত্যক্ষ করেননি, বাঙালি জাতির ‘জোয়ান অব আর্ক’ শেখ হাসিনার বীরত্বের ও বিক্রমের স্বর্ণসৌধ পদ্মা সেতু তারা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য লাভ করলেন। চিরবিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বাঙালি জাতির ভবিষ্যত্ কান্ডারি শেখ হাসিনার বীরত্বের বন্দনা করে যেন গত শতাব্দীতে লিখে রেখে গেছেন; ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির, শির নিহারী আমারই নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির’।

১৯৭২ সাল থেকে দুই দশকব্যাপী বঙ্গভবনে ছয় জন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চাকরি ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের সহকর্মী ও পেশাগত সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করার বিরল অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। আমার বন্ধু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাবেক সচিব মাইক ম্যাকারি সম্প্রতি পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে আমাকে বলেছেন, ‘তোমাদের জাতি আজ থেকে নবমর্যাদায় উন্নীত হলো। তোমরা পাঁচ দশক পূর্বে যে বীরের জাতির মুকুট শিরে ধারণ করেছ, সে বীর ধর্ম তোমাদের ধমনিতে যে বিদ্যমান ও প্রবহমান আছে তা সত্য।’ নব্বই দশকে আমার পেশাগত বন্ধু মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহথির মোহাম্মদের সাবেক সচিব ড. দানি আমাকে জানিয়েছেন, ‘কুয়ালালামপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহের রাজধানীতে তোমাদের জ্যোতির্ময়ী নেত্রীর নামে জয়ধ্বনি উঠেছে, তার নামে জয়গান উঠেছে এবং মসজিদে মসজিদে মুসল্লিরা তার নেতৃত্বের সাফল্যের জন্য মোনাজাত করছে।’

শ্রীলঙ্কার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার প্রিয়ভাজন দিনেশ গুনাওয়ার্দেনা আমাকে ফোন করে বলেছেন, ‘তোমাদের জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যার মতো আমাদের হতভাগা জাতির জন্য কেউ যদি আকাশ থেকে নেমে আসত, আমরা মুক্তির নিশ্বাস ফেলে বেঁচে যেতাম। শেখ হাসিনার জাদুকরি নেতৃত্বে তিনি তোমাদের জাতির অনৈক্য ও বিভেদ দূর করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন বলে বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। সেক্ষেত্রে আমাদের জাতি বহু মত ও বহু পথে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে বলে আমাদের দেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।’

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কূটনীতিবিদ, আমার চার দশকের বিশ্বস্ত বন্ধু সোলেমান বিল্লাল আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমাকে উদ্ধৃত করে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম নারী নেত্রী শেখ হাসিনাকে বলো, ভারতের যেমন সপ্তমাশ্চার্য তাজমহল আছে, মুসলিম বিশ্বের মুসলিম দেশ বাংলাদেশের তেমন অষ্টমাশ্চর্য সৌধ পদ্মা সেতু আছে।’

আমার তিন দশক ধরে বন্ধু মিশরের সাবেক রাষ্ট্রদূত হাসান মাজেজ আমাকে ইমেল মেসেজে বলেছেন, ‘তোমাদের গৌরবের সঙ্গে মুসলিম বিশ্ব আজ সমান ভাগিদার। আমাদের ঐতিহাসিক সুয়েজ ক্যানেলের বিজয় আর তোমাদের ঐতিহাসিক পদ্মা সেতুর বিজয় একই অহংকার ও গর্বের মনুমেন্ট। মধ্যপ্রাচ্যের পিছিয়ে পড়া অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশকে দেখে আপন শক্তিতে জেগে উঠতে পারে।’ বাংলাদেশে এক দশক আগে সৌদি রাষ্ট্রদূত পদে চাকরিরত ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মোতাইরি (পরবর্তী সময়ে ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত) যিনি আমার পারিবারিক বন্ধুও ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার অন্তহীন শক্তির উত্থান ঘটিয়ে শত বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের এই প্রশংসিত পরহেজগার নেত্রী ভবিষ্যতে আরো কী কী বিস্ময়কর ঘটনা ঘটায় তা প্রত্যক্ষ করার জন্য বিশ্ববাসীকে অপেক্ষা করতে হবে। তোমাদের নোটে তার ছাবি ছাপা হয়েছে। তার একটা নোট আমাকে পাঠিয়ে দিয়ো।’

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধা মিত্র বাহিনীর তদানীন্তন ক্যাপ্টেন, পরবর্তী সময়ে ভারতের সেনা বাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশ-ভারত প্রাক্তন যুদ্ধ বিশারদ সংস্থার সভাপতি আমার বিশিষ্ট বন্ধু এবং বর্তমান বিজেপি সরকারের সড়ক, মহাসড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জেনারেল ভি কে সিং। পদ্মা সেতু উদ্বোধন সংবাদে তিনি উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে আমাকে টেলিফোনে বলেন, ‘শূন্য সামরিক শক্তি সম্বল করে বীরবিক্রমে যে বাংলাদেশের জন্ম এবং বীর বাঙালি জাতির উত্থান, সে বাংলাদেশ বহু দূর এগিয়ে যাবে এবং বীরের জাতি বাঙালির নতুন নতুন বিজয় অর্জনের দৃশ্য বিশ্ববাসী অবলোকন করবে ও স্বাগত জানাবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর অজেয় বীরদের এক জন হিসেবে আমি পদ্মা সেতু মনুমেন্ট উদ্বোধনের শুভলগ্নে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধচিত্তে প্রণাম জানাই।’উপর্যুক্ত প্রতিক্রিয়াগুলো কী প্রমাণ করে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা যারা এখনো পদ্মা সেতুর সমালোচনা করছি, তাদের এ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে।

লেখক: বীরমুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ রচয়িতা, সাবেক সচিব, সভাপতি, বিসিএস মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবনগর অফিসার ও কর্মচারী সমিতি

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন