সর্বত্র মানাইয়া চলিবার সংস্কৃতি গড়িয়া উঠুক

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২২, ১৩:০৩

বিশ্ববাসী এখন এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করিতেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই চলিতেছে চরম দুঃসময়। ইহারই প্রেক্ষাপটে এবার আসিতেছে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। এই ঈদকে কেন্দ্র করিয়া অনেকেই আছেন দুশ্চিন্তায়। যাহারা চাকুরিবাকুরি হারাইয়াছেন বা বেতনভাতা কমিয়া যাওয়ার কারণে কষ্টে আছেন, তাহাদের ঈদ কতটা আনন্দময় হইবে তাহা সহজেই অনুমেয়। তাহার পরও আমরা আশা করিব সকলের ঈদ আনন্দঘন হউক। ঈদুল আজহার প্রধান শিক্ষাই হইল স্যাকরিফাইস বা ত্যাগ। এই ঈদে বিশ্বপরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান হইতে পশু কোরবানির মতো ত্যাগের সুমহান দীক্ষায় অনুপ্রাণিত হইতে হইবে। না পাওয়ার শূন্যতা বা বেদনাকেও শিশুপুত্র ইসমাইলের (আ.) মতো সবরকারীর পরিচয় প্রদান করিয়া মানিয়া লওয়ার মানসিকতা প্রদর্শন করিতে হইবে।

কোভিড-১৯ মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাতে আমরা বিশ্ববাসী এক কঠিন সময় পার করিতেছি। বিশ্বায়নের কারণে আমরা এখন বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতিতে আমরা বহুভাবে লাভবান হইয়াছি। আবার ক্ষতিগ্রস্তও হইয়াছি নিঃসন্দেহে। কেননা আমরা এখন কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নহি বলিয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধবিগ্রহের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব খুব সহজেই আছড়াইয়া পড়িতেছে আমাদের উপর। এক ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ-শৃঙ্খলা ভাঙিয়া পড়ায় উন্নত ও অনুন্নত বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়াছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠিতে পারে, কী অবস্থা আমাদের দেশের! যাহারা চাকুরিবাকুরি করেন, তাহারা প্রকৃত অবস্থা টের পাইতেছেন না। যাহারা ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা করেন বা কলকারখানা চালান, তাহারা প্রকৃত বাস্তবতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিতেছেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদান করিতে হিমশিম খাইতেছেন। এই অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?

এইখানে একটি উদাহরণ দিলেই পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাইবে। দেশব্যাপী লোডশেডিং বাড়িয়া যাইবার পিছনে মূল কারণ বিশ্বব্যাপী চলা মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন। মুদ্রাস্ফীতির জোরে টাকা এখন মুহূর্তের মধ্যে নাই হইয়া যাইতেছে। যাহারা বিদেশ-বিভুঁইয়ে কিনাকাটা করিতেছেন তাহারা ইহার বাস্তবতা খুব সহজেই ও হাড়ে হাড়ে টের পাইতেছেন। আমদানি-রপ্তানিকারকরাও আছেন মুসিবতে। তাই গ্যাস ও ডিজেলের মতো বিদু্যত্ উত্পাদনকারী উপাদানের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি ও কয়লা না পাওয়ায় আমরা বিপাকে পড়িয়াছি। উত্পাদনক্ষমতা থাকিবার পরও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাইতেছে না। এইভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে সরকারগুলি এখন বিপদে রহিয়াছে। কোথাও কোথাও জনবিক্ষোভে সরকারের পতন ঘটিয়াছে বটে, তবে পরক্ষণে দেখা যাইতেছে অনেকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালনে রাজি হইতেছেন না। কেহ কেহ মন্ত্রিত্ব স্বেচ্ছায় ছাড়িয়া দিতেছেন। এমন পরিস্থিতিও দাঁড়াইয়া গিয়াছে যে, এখন আর কেহ কাহাকে দায়ী করিতেছেন না! না জনগণ সরকারকে, না সরকার জনগণকে! ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাইতেছে, যথাসময়ে মাল সরবরাহ না করিতে পারিলেও মানাইয়া লওয়া হইতেছে। তাহার কারণ করোনা এবং ইহাতে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকা। অতএব, সর্বত্র এই মানাইয়া চলিবার সংস্কৃতিই আমাদের মধ্যে গড়িয়া তুলিতে হইবে।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, যুদ্ধ ও করোনা কবে নাগাদ শেষ হইবে তাহা আমরা কেহ নিশ্চয়তা দিয়া বলিতে পারি না। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেহ কেহ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ ও প্রারম্ভিক সংঘাত হিসাবে দেখিতেছেন। এই জন্য আগামী দিনগুলিতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের আরো সতর্ক হইতে হইবে। শ্রীলঙ্কার মতো কৃচ্ছ সাধনের পথ গ্রহণ করিতে হইবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাইয়া সম্ভব হইলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় বাড়াইতে হইবে। আর মানাইয়া চলিবার সংস্কৃতিকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া সর্বক্ষণ ভরসা রাখিতে হইবে সৃষ্টিকর্তার উপর।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন