অপার সম্ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত হউক

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ০৫:৫৮

প্রতি বৎসর পবিত্র ঈদুল আজহায় পশুর চামড়া ক্রয়বিক্রয়ে বিপুল অর্থ লেনদেন হইয়া থাকে। ইহা আমাদেত্র অর্থনীতির জন্য অনেক বড় আশীর্বাদ। গত দুই বত্সর কোভিডের বৈশ্বিক মহামারির কারণে দেশের অর্থনীতি কিছুটা বিপর্যস্ত ছিল। ফলে গত দুই ঈদে অর্থনৈতিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হইয়াছে। আমরা এইক্ষণে স্মরণ করিতে পারি, ২০১৫ সালে আকস্মিকভাবেই আমাদের একটি বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ, যেইখান হইতে সবচাইতে অধিক গরু আসিত, সেই দেশটি বাংলাদেশে গরু প্রবেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। উহা অবশ্য আমাদের জন্য শাপে বর হয়। কারণ, ইহার ফলে দেশের কৃষক ও খামারিরা ঝাঁপাইয়া পড়েন এবং তাহার পর হইতে দেশে উত্পাদিত গরু দিয়াই ঈদে কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হইতেছে। এমনকি বর্তমানে কয়েক বৎসর ধরিয়া কোরবানির চাহিদা মিটাইয়া গরু উদ্বৃত্ত থাকিয়া যাইতেছে। দেশে এখন ছোট-বড় ১৭ লক্ষ গরুর খামার রহিয়াছে বলিয়া খামারিদের সমিতি বলিতেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে এই বত্সর গরু, ছাগল, ভেড়া ও উট মিলাইয়া ১ কোটি ২১ লক্ষ ২৪ হাজার ৩৮৯টি পশু প্রস্তুত করা হইয়াছে। বিপরীতে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হইয়াছে ৯৭ লক্ষ ৭৫ হাজার ২৩৫টি, যাহা গত বত্সরের চাইতে ৬ লক্ষ ৯১ হাজার ৯৯৩টি অধিক।

কোরবানির ঈদ এবং তাহার সহিত কাঁচা চামড়ার সরবরাহের সম্পর্ক বহুকালের। চামড়াশিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার মূল্য কিছুটা বাড়তি রহিয়াছে। তবে চামড়া প্রসেস করিতে যেই কেমিক্যাল লাগে তাহার মূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিভিন্ন কারণে দেশে চামড়াশিল্পে অনেক ধরনের সমস্যা রহিয়াছে। এই সকল সমস্যা ও সংকট কাটাইয়া উঠিতে না পারিলে আমাদের চামড়ার বাজারের খুব অধিক উন্নতি হইবে না। কোরবানিযোগ্য পশুর কাঁচা চামড়া লইয়া অতীতে আতঙ্কিত হইতে দেখা গিয়াছে সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীদের। দেখা গিয়াছে লক্ষ লক্ষ কাঁচা চামড়া পচিয়া গলিয়া গিয়াছে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ চামড়া খাতে ইউরোপের রপ্তানি বাজার হারাইয়াছে, যাহার কারণে ডলার (কাঁচা চামড়া) অতীতে কুকুরকে খাইতে দেখা গিয়াছে। এইদিকে আমাদের ট্যানারি মালিকরা চামড়ার গুণমান ধরিয়া রাখিতে পারেন নাই বলিয়া অভিযোগ আছে। ইহা ছাড়াও পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকার কারণে বাজার হারাইয়াছে বাংলাদেশ। আর এই বাজার দখল করিয়াছে প্রতিবেশী একটি দেশ।

সুতরাং আমাদের মনোযোগ দিতে হইবে এই বৃহত্তর শিল্প রক্ষায়। মনে রাখিতে হইবে, ইহার সহিত আমাদের অর্থনীতির যোগ অত্যন্ত নিবিড়। সংশ্লিষ্ট তথ্যে দেখা গিয়াছে, দেশে প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন স্কয়ার ফুট ক্রাস্ট ও ফিনিশিড চামড়ার সরবরাহ আছে, তাহার বৃহত্তর অংশই আসে কোরবানির সময়। প্রতিটি চামড়ার গড়মূল্য যদি ২০০-২৫০ টাকা (গরু, ছাগল, মহিষ মিলাইয়া) করিয়াও হয়, তাহা হইলে প্রায় ১৫ বিলিয়ন টাকার ক্রয়বিক্রয় হইতে পারে। স্থানীয় ও রপ্তানি বাজার মিলাইয়া এবং মূল্যসংযোজিত পণ্য ধরিয়া ইহার একটি বিপুল অর্থনীতি রহিয়াছে, তাহা ঠিকভাবে ম্যানেজ করিতে পারিলে ইহা হইতে বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানিমূল্য আরো পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাইয়া ৭৫ বিলিয়ন টাকার মতো হইতে পারে বলিয়া মনে করেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

আমরা ভাতে যেমন স্বয়ংসম্পন্ন, তেমনি কোরবারির পশুতেও স্বয়ংসম্পন্ন হইলাম। ইহা একটি বড় অর্জন নিঃসন্দেহে। তবে এই অর্জন গত কয়েক বৎসরের ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফসল। আজ গরু-ছাগলের আধুনিক খামার গ্রামে-গঞ্জে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। মুরগির ফার্ম তো বলিতে গেলে ঘরে ঘরে রহিয়াছে। এখানে স্মর্তব্য যে, আমাদের অনেক মেধাবি ও কর্মঠ তরুণ খামারি শিল্পের উদ্যোক্তা হইয়াছেন। অনেকে বিদেশ হইতে উচ্চতর ডিগ্রি লইয়াও এই পেশায় আসিয়াছেন। তাহা ছাড়া চোরাইপথে কোরবানির পশু যাহাতে না আসে, এই জন্য সরকার সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি বৃদ্ধি করিয়াছে। এইভাবে দেশে গরু-ছাগলের খামারের বিকাশ ত্বরান্বিত হইয়াছে। ফলে একদিকে চামড়াশিল্পের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অন্যদিকে খামারের বিকাশে ব্যাপক কর্মসংস্থান—সব মিলাইয়া কোরবানির অর্থনীতি আমাদের অপার সম্ভাবনা তৈরি করিয়াছে। সেই অপার সম্ভাবনার দিগন্ত আরো প্রসারিত হউক, ইহাই আমরা কামনা করি।

ইত্তেফাক/এসটিএম