গর্ভপাত নিয়ে রায়, অতঃপর...

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২২, ০৯:০৮

বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ক্যাপিটল হিল আক্রমণ-পরবর্তী ঘটনায় চরম বিভাজিত রাজনীতির মধ্যেই কয়েক দশক পর যখন মার্কিন সিনেট দুই দলের সমঝোতায় অনেক প্রতীক্ষিত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন পাশ করল, ঠিক তখনই দীর্ঘ ৫০ বছর যাবৎ চলে আসা নারীদের গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার দেওয়ার নজির বা প্রিসিডেন্ট মামলা ‘রো ভার্সেস ওয়েডে’র রায় বাতিল করে, গর্ভপাত কোনো সাংবিধানিক অধিকার নয় ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টে আমেরিকানদের আরো বেশি বিভাজিত করে তুলেছে।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বাইডেন এটিকে চরম উগ্রবাদী ধর্মীয় ধারণাপ্রসূত, সাম্প্রদায়িক ও কালো অধ্যায়ের সূচনা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এটিকে ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া রেডিক্যাল বিচারকদের নিজস্ব অভিমত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে অন্যায়ভাবে নারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। স্পিকার ন্যান্সি পেলসি বলেছেন, এই রায়ে নারীদের গালে থাপ্পড় মেরে অপমান করা হয়েছে, নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের জীবনযাপনকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও স্পিকার দুজনেই আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনেই গর্ভপাতের ইসু্যটিকে ব্যালটে যুক্ত করে এর ওপর জনগণের ভোট নিয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করার কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট এ লক্ষ্যে কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় বিল আনারও পরামর্শ দেন।

লিবারেল রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিনসসহ অনেক নেতাই এই রায় সমর্থন করেন না। সুসান কলিনস বলেন, সিনেট হিয়ারিংয়ে জাস্টিস কেভানো ও নীল গর্সাস কথা দিয়েছিলেন যে, সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত এ ধরনের প্রিসিডেন্ট বা নজির মামলার রায় বাতিল করবেন না। তারা তাদের কথা রাখেননি।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কঠোর সমালোচনা করে বলেন, রিপাবলিকান এই জাজেরা ৫০ বছরের নজিরকেই শুধু বাতিল করেননি, তারা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক মতবাদকে অধিকাংশ নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এটি নারীর স্বধীনতা হরণের শামিল। সংখ্যাগরিষ্ঠের এই রায়ের কঠোর বিরোধিতা করে জাস্টিস স্টিফেন ব্রায়ান, সোনিয়া সটোমিয়ার ও এলিনা কেগান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অত্যন্ত দুঃখজনক, নারীদের একটি সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হলো।

চিফ জাস্টিস রবার্ট নিজেও এর বিরোধিতা করে বলেন, তিনিও রো বনাম ওয়েডের বাতিল চাননি, বরং তিনি ১৫ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতকে বৈধ রাখতে চেয়েছিলেন। এদিকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে আমেরিকার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো এবং এতে কনজারভেটিভ ধর্মপ্রাণ জনগণের মনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিভাত হয়েছে।

প্রগতিশীল আমেরিকানরা এর সমালোচনা করে বলছেন, যে জীবন বর্তমান নেই, ভবিতব্য জীবনকে রক্ষার নামে অপেক্ষাকৃত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দূর্বল শ্রেণি তথা নারীর অধিকার কেড়ে নেওয়া রেসিজমেরই নামান্তর। এই রায়ের ফলে গর্ভপাতসংশ্লিষ্ট আইন নির্ধারণ করা হবে স্টেটের নিজস্ব আইন দ্বারা। যতক্ষণ কংগ্রেস কোনো পদক্ষেপ না নেয়। ইতিমধ্যে অর্ধেকেরও বেশি স্টেট গর্ভপাতকে নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করেছে। গর্ভপাতের ক্লিনিকগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালে জেন রো নামের এক নারী টেক্সাসের গর্ভপাত নিষিদ্ধ করা আইন চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন। ফেডারেল কোর্টের তিন বিচারক শুনানি শেষে গর্ভপাত নারীর সাংবিধানিক ফেডারেল অধিকার হিসেবে তার পক্ষে রায় দিলে টেক্সাস স্টেট আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে দীর্ঘ শুনানির পর (৭-২) ভোটে গর্ভাপাতকে নারীর ডিউ প্রসেস ক্লজের ১৪তম সংশোধনীর রাইট টু প্রাইভেসির স্বীকৃতি দিয়ে ২২ থেকে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে (নবভড়ত্ব ারংরনরষরঃু ড়ভ ঃযব ষরভব) গর্ভপাতের সাংবিধানিক ফেডারেল অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে রায় দেয়। সে সময় থেকেই এটি সুপ্রিম কোর্টের প্রিসিডেন্ট বা নজির হিসেবে চলে আসছে।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর রাতারাতি বিভিন্ন রিপাবলিকান স্টেট গর্ভপাতবিরোধী শতাধিক আইন প্রণয়ন করে। টেক্সাস ও মিসিসিপি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য । টেক্সাস ও মিসিসিপি স্টেটের গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে করা আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনের শুনানি শেষে ফেডারেল কোর্ট স্টেটের পক্ষে রায় দেয়। ফেডারেল কোর্টের রায়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আলোচ্য আপিলটি দায়ের করলে শুনানি শেষে ৫-৪ ভোটে রো বনাম ওয়েড মামলার রায়কে বাতিল করে দিয়ে গর্ভপাত কোনো সাংবিধানিক অধিকার নয় বলে এই রায় ঘোষণা করে।

আমেরিকান সংবিধানের মূলমন্ত্র লাইফ, লিবার্টি অ্যান্ড পারসু্যয়েট অব হ্যাপিনেসের বাস্তবায়নে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নীতি রক্ষায় শুরু থেকেই সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ও যুগান্তরকারী ভূমিকা রয়েছে। সেই ১৮০৩ সালেই তত্কালীন চিফ জাস্টিস জন মার্শালের সভাপতিত্বে শুনানি করা মারবারি বনাম মেডিসন মামলার রায়ে সৃষ্টি করা জুডিশিয়াল রিভিউর মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ, সিভিল লিবার্টিবিষয়ক মামলায় বিভিন্ন সাংবিধানিক বিধিবিধানকে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বিভিন্ন রায়ে প্রিসিডেন্ট বা নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

লেখক: বাংলাদেশি আমেরিকান, সাবেক আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন