বৈশ্বিক ক্যানভাসে সক্ষম বাংলাদেশের প্রথম চিহ্ন এঁকে দেওয়া অবকাঠামোর নাম পদ্মা সেতু। ২৫ জুন পূর্বাহ্নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুলে দিলেন বহুল আকাঙ্ক্ষিত, পরম প্রার্থিত দখিন দুয়ারের তালা। বিরতিহীন যাতায়াতের সুতো দিয়ে গেঁথে দিলেন ২১টি জেলাকে। তিনি চমৎকার উদ্বোধনী বক্তৃতা করলেন, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগে শূলে চড়া তিন জন সাবেক মন্ত্রী-উপদেষ্টা-আমলাকে পাশে টেনে নিলেন, মাওয়ার নদীতীরে স্পর্ধিত বাংলাদেশের নবচিত্র অঙ্কন করে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর ষোলকলা পূর্ণ করলেন। কিন্তু এই মহাযজ্ঞে তিনি কি সবার সমর্থন পেয়েছিলেন?
নিজ খরচে পদ্মা সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরো বিষয়টি নিয়ে ভাবমূর্তি কেমন হতে পারে, তা নিয়ে বহু চর্চা চলেছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের মোটামুটি তামাম অংশ একমত হয়েছিলেন যে, নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প শুরু করা গেলে শেষ করা যাবে না। শেষ করা গেলেও বাকি উন্নয়ন প্রকল্পে টান পড়বে অথবা অর্থনীতি তার ভারসাম্য হারাবে। তদুপরি, দাতা সংস্থাগুলো মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশ নিজের মুখ দেখানোর জায়গা আর পাবে না। কিন্তু ২৫ জুন সকালে খোলা আকাশের নিচে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসব বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রাজ্ঞজনদের অর্থনীতির নতুন পাঠ শেখালেন। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি আর প্রজ্ঞার সমন্বয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাশ্যবাদকে ছক্কা হাঁকিয়ে মাঠছাড়া করলেন। ধন্যবাদ দিলেন দেশের মানুষকে, ষড়যন্ত্রের কত জাল তিনি ছিন্ন করেছেন পরিশীলিত ভাষায় তা ব্যাখ্যা করলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষমা করলেন এবং তাদের হেদায়াতের ফরিয়াদ করলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে, বিরোধীদের অন্তরে দেশপ্রেম জাগ্রত করার আহ্বান জানালেন।
পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে আমরা মোটা দাগে আসলে কী পেলাম? দক্ষিণবঙ্গের ফলমূল, শাকসবজিসহ সব কৃষিপণ্য এখন দ্রুততম সময়ের ভেতরেই ঢাকা চলে আসবে, একটুও পচবে না। ন্যাঘ্যমূল্যের নগদপ্রাপ্তিতে কৃষকের ঘাম আর বিনা মূল্যে শুকাবে না। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিপমেন্ট বাতিল হবে না, রপ্তানিতে অবকাঠামোগত বাধা অর্ধেক হয়ে যাবে, সময় বাঁচবে অগুনতি, উত্পাদন ব্যয়ের পারদ নেমে আসবে বাধাহীন পরিবহনজনিত কাচামালের সহজপ্রাপ্তির কারণে। পরিবহন খাতে এক ঝলক মুক্ত বাতাসের আবাহন দেখা যাবে। ফেরিঘাটে ঝিমুতে থাকা ট্রাকচালক, বাসচালক, যাত্রীদের আর দেখা যাবে না। মায়ের জানাজায় যাওয়ার পথে সন্তানের আর ফেরির অপেক্ষায় বসে থাকা লাগবে না, চিকিত্সার জন্য ঢাকা আসার অ্যাম্বুলেন্সগুলো আর চিন্তাক্লিষ্ট রোগী-স্বজনদের নিয়ে রাতভর অপেক্ষায় থাকতে হবে না। সামষ্টিকভাবে কার্যকর একটি পরিবহনব্যবস্থা সৃষ্টি না হওয়ার কোনো কারণই থাকবে না, যদি পদ্মা সেতু ঘিরে সম্ভাব্য পরিবহন চাঁদাবাজি অঙ্কুরেই বিনাশ করা যায়। জিডিপি বাড়বে প্রায় ১ দশমিক ২৩ শতাংশ, অর্থনৈতিক অঞ্চল আর হাইটেক পার্কে বলীয়ান দক্ষিণবঙ্গ আকৃষ্ট করবে বিদেশি বিনিয়োগ। তবু, এই সেতুর নির্মাণ ও নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধিতা করার মানুষের অভাব নেই। বর্তমান সময়ে রাজপথের দুর্বল এবং বিভ্রান্িতকর প্রতিবিম্ব অথবা বিকল্প হয়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে অবিরাম ঘৃণার চাষ এবং অমূলক তামাশা।
বর্তমান সরকারের শাসনামলে যেসব রাজনৈতিক কর্মী রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা পদ্মা সেতু-সংক্রান্ত সব আলোচনায় নীরব অথবা বিরোধিতার মনোভাব দেখাবেন, তা বোধগম্য এবং তাদের জুতো পায়ে দিয়ে দেখলে যুক্তিযুক্ত দুটো কারণে। প্রথমত, খোলাখুলিভাবে বললে তাদের ব্যক্তিজীবনের উন্নয়নে নিজ দলের ক্ষমতায় আসার গুরুত্ব এখন পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দিনবদলের গুরুত্বের চেয়ে দুই কাঠি ওপরে অবস্থান করে স্বভাবতই। দ্বিতীয়ত, দেশের যে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড শুধু স্বীয় দলের হাত ধরে হলে তবেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক কর্মীরা উদ্যাপন করে থাকে, নইলে না। কিন্তু এই সরাসরি রাজনৈতিক কর্মীদের বাইরেও জনগণের একটি বিরাট অংশের কাছে পদ্মা সেতু শুধু তীব্র কটাক্ষের বস্ত্ত। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন এবং তৎসংক্রান্ত যাবতীয় উদ্যাপনের বিরুদ্ধে তারা ইনিয়েবিনিয়ে নানা ধরনের কারণ তুলে ধরে। যেমন: দ্রব্যমূল্যের আকাশ-ছোঁয়ার দিনে কেন এত আয়োজন, বন্যাকবলিত মানুষের প্রতি এসব আয়োজন এক ধরনের উপহাস ইত্যাদি। যদিও তাদের নিজেদের জীবনের কোনো উপলক্ষ্য উদ্যাপনে তারা পিছিয়ে নেই, তবু পদ্মা সেতুতেই যত আপত্তি, যত ক্ষোভ। সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন এই জনগোষ্ঠীর এই প্রচণ্ড প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কারণগুলো আসলে কী?
এর একটি উত্তর হতে পারে প্রজন্মান্তরে লম্বভাবে পারিবারিক রাজনৈতিক ভাবাদর্শের প্রবহন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের মানুষ পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়, নিজে থেকে চিন্তাভাবনা করে সমর্থক হয় না। আরো সহজ করে বললে, বাবার শত্রু যে দল, আমি তার বিপরীত দল; অথবা আমার এলাকায় আমি যাকে দেখতে পারি না, সে যে দল, আমি তার বিপরীত দল। পারিবারিক এবং স্থানীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ থেকে আলাদা করার অক্ষমতা থেকে বিচারবুদ্ধিহীন দলীয় সমর্থনের বিকাশ ঘটে।
এই প্রবণতাটিকে অস্বীকার করা খুব কঠিন এবং তার চেয়ে বেশি কঠিন হলো এই প্রবণতা থেকে মুক্তির পথ বের করা। ফুটবল খেলায় আমি পারিবারিকভাবে ব্রাজিল অথবা আর্জেন্টিনা সমর্থন করে এলেও রাজনীতির খেলায় যে এই রীতির বাইরে গিয়ে নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে দেশের নেতৃত্বে তুলনামূলকভাবে উপযুক্ত দলকে যে বেছে নিতে হয়, সেই ধারণা বা রীতি আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো গড়ে ওঠেনি। ব্যক্তিস্বার্থ সর্বদাই বর্তমান ব্যবস্থায় মুখ্য, জাতীয় স্বার্থ গৌণ। যেহেতু রাজনীতিবিদ এবং জনগণের মধ্যে আস্থার জায়গাটি বেশ দুর্বল, তাই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও স্বাধীনভাবে সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম জনগণের সংখ্যা বেশি হলে দেশের রাজনৈতিক আয়তনের গুণগত পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়।
আমাদের দেশের মানুষ রাজনীতি পছন্দ করে। কিন্তু রাজনীতিপ্রবণ মানুষ রাজনৈতিকভাবে সচেতন না হলে রাজনৈতিক আলোচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় অর্থহীন বাগাড়ম্বর। পদ্মা সেতু নিয়ে বাঙালির একাংশের অর্থহীন সমালোচনা থেকে মনে হতেই পারে যে, অত্যন্ত রাজনীতিপ্রবণ এই অংশটি রাজনৈতিকভাবে বেশ অসচেতন। তারা ব্যক্তিস্বার্থ আর জাতীয় স্বার্থের তফাত বুঝতে অক্ষম অথবা অনিচ্ছুক এবং পারিবারিক রাজনৈতিক আদর্শকে প্রজন্মান্তরে বহন করে চলেছে কোনো পর্যালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসা ছাড়াই। তাই পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন প্রবল, রাজনৈতিক গুরুত্বও তেমন প্রগাঢ়। জনগণের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সচেতনতার অসারত্বকে প্রকটভাবে তুলে ধরার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক প্রভাবের চেয়েও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা বেশি হওয়া প্রয়োজন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, এমআইএস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
