জেমস ওয়েব: মানবজাতির ঐক্যের বার্তা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২২, ১০:৪৯

একটি আলোকচিত্র, উহার দিকে বিস্ময়ভরা নয়নে তাকাইয়া থাকিতে হয়। উহাতে উঠিয়া আসিয়াছে ৪৬০ কোটি বৎসর পূর্বের ছায়াপথ আর তারকাপুঞ্জের ঝলকানি। ৪৬০ কোটি বৎসর! বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স আনুমানিক ৪৫৪ কোটি বৎসর!

অর্থাৎ তখনো এই পৃথিবীর জন্ম হয় নাই। তাহা হইলে, আমরা এমন একটি তারকাপুঞ্জের ছবি দেখিতেছি, যেই সময় এই পৃথিবীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না! সেই অসম্ভব অবিশ্বাস্য ছবি তুলিয়াছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। এই টেলিস্কোপের প্রথম ছবি গত ১১ জুলাই সোমবার হোয়াইট হাউজে প্রকাশ করিয়াছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। নাসা জানাইয়াছে, ওয়েব টেলিস্কোপ মহাকাশের যেই অংশটির ছবি তুলিয়াছে উহা মহাকাশের ক্ষুদ্রতম একটি অংশ মাত্র। কতখানি ক্ষুদ্রতম— তাহা বুঝাইতে নাসা বলিয়াছে— হাতের তালুতে ধরা একটা ছোট্ট বালির দানা বলা যাইতে পারে ঐ ছবিকে। ভাবিতে অবাক লাগে যে, এই ছোট্ট বালির দানাতুল্য অংশের আলোকচিত্রই আমাদের নিকট মহাবিশ্বের চাক্ষুস রহস্যের হাট উন্মোচিত করিয়া দেয়। এই জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলিয়াছেন, ‘আমরা ১ হাজার ৩০০ বৎসর পূর্বের ছবি দেখিতেছি। কারণ, বিন্দুর মতো যেই তারাগুলি রহিয়াছে, তাহার আলো আসিতে ১ হাজার ৩০০ বৎসর সময় লাগিয়াছে।’ ইহার পর তিনি উচ্ছ্বসিত হইয়া বলেন, ‘জেমস ওয়েবের ছবিই বলিয়া দিতেছে, আমেরিকা বড় কাজ করিতে পারে। আমেরিকার মানুষ, বিশেষ করিয়া ভাবি প্রজন্মকে এই ছবি স্মরণ করাইয়া দিতেছে, আমাদের অসাধ্য বলিয়া কিছুই নাই।’ ইহার পর বাইডেন অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ কথা বলিয়াছেন, ‘আজ ঐতিহাসিক দিন। শুধু আমেরিকার জন্য নহে, পুরা মানবতার জন্য।’

বাইডেনের এইরূপ কথা শুনিয়া আমাদের মনে পড়িয়া যায় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাইয়ের কথা। চাঁদের মাটিতে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসাবে পা রাখিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নভোযাত্রী নীল আমস্ট্রং সেইদিন বলিয়াছিলেন, ‘মানুষের জন্য ইহা ছোট একটি পদক্ষেপ; কিন্তু মানবজাতির জন্য ইহা এক বিরাট লম্ফ।’ বাইডেন কেন বলিয়াছেন জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের কৃতিত্বেও দাবিদার শুধু আমেরিকা নহে, পুরা মানবজাতি— তাহার কারণ হইল, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের উদ্যোগে শামিল হইয়াছে পৃথিবীর ১৪টি দেশের সহস্রাধিক বিজ্ঞানী। তৈরি করিতে সময় লাগিয়াছে ২৫ বৎসর। মোট খরচ হাজার কোটি ডলার ছাড়াইয়াছে! সিকি শতকে বারংবার সংশোধিত হইয়াছে এই প্রকল্পের ব্যয়ভার। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি যাহা ছিল মাত্র ১০ হইতে ২০ কোটি ডলার, তাহা শেষাবধি হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হইয়াছে। ইহার ব্যয়ভার এতটাই যে, নাসার এই প্রকল্পে পরবর্তী সময়ে হাত মিলাইয়াছে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি (সিএসএ)। সমগ্র বিশ্বের কয়েক হাজার বিজ্ঞানী যুক্ত হইয়া আক্ষরিক অর্থেই ইহাকে সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত একটি প্রকল্পে পরিণত করিয়াছে। ইহা মানবজাতির একতার দারুণ এক উদাহরণ।

অতীতে আমরা দেখিয়াছি, কোনো এক বিজ্ঞানী একক প্রচেষ্টায় বড় কোনো কিছু আবিষ্কার করিয়াছে; কিন্তু গত অর্ধশতাব্দীতে ইহার আমূল পরিবর্তন আসিয়াছে। এখন যাহা হয়, তাহা হয় সম্মিলিতভাবে। অতীতের নিকোলাস, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার বা টাইকো ব্রাহের যুগ আর নাই। এখন আর আবিষ্কার বা প্রকল্প ব্যক্তিকেন্দ্রিক নহে, সামষ্টিক। এই জন্য নূতন যুগে সাফল্যও আসিয়াছে বিস্ময়কর উচ্চতায়। সামষ্টিক গবেষণায় ১৯৯৫ সালে আবিষ্কৃত হইয়াছিল টপ কোয়ার্ক কণা। পদার্থের ক্ষুদ্রতম উপাদান হইল কোয়ার্ক। ইহা আবিষ্কারে আমেরিকার ফের্মি ন্যাশনাল অ্যাক্সিলারেটর ল্যাবরেটরিতে যোগ দিয়াছিলেন হাজারখানেক বিজ্ঞানী। ইহার পর ২০১২ সালে ঘোষিত হয় আর একটি কণা— হিগ্স বোসন, যাহার আরেক নাম ঈশ্বরকণা। এই গবেষণাতেও যোগ দিয়াছিলেন কয়েক হাজার বিজ্ঞানী। ২০১৬ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সন্ধান পাইয়াছেন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের, যাহার কথা ১৯১৬ সালে বলিয়াছিলেন আইনস্টাইন। এই গবেষণাতে যুক্ত ছিল কয়েক শত বিজ্ঞানী। অর্থাত্ যাহা কিছু বিপুল বিস্ময়কর বৃহত্ অর্জন— তাহা সম্মিলিত প্রয়াসেই ঘটিয়াছে। স্পষ্ট করিয়া বলিলে, মানবজাতি যদি ‘এক’ থাকে, তাহা হইলে মানবজাতির জন্য অসম্ভব বলিয়া কিছু নাই। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ ৪৬০ কোটি বৎসর পূর্বেকার অবস্থার ছবি প্রকাশ আমাদের সেই বার্তাটিই দিতেছে— কোথায় তোমরা? এক থাকো, সাফল্য তোমাদের আসিবেই।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন