ঈদে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় কুয়াকাটায়

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২২, ১৫:১২

ঈদ উল আযহার ছুটিতে নতুন রূপে সেজেছে দক্ষিণের সাগরকন্যা কুয়াকাটা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে মাত্র ৫ ঘণ্টায় কুয়াকাটায় পৌছাতে পেরে উচ্ছ্বসিত পর্যটকরা। ঈদুল আযহার তৃতীয় দিনেও গতকাল মঙ্গলবার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বেলাভূমি এই সমুদ্র সৈকতে হাজার হাজার পর্যটকের উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে।

পর্যটকরা জানিয়েছেন, ভোরে ঢাকা থেকে যাত্রা করে দুপুরের আগেই কুয়াকাটা পৌঁছে দিনভর ঘোরাঘুরি শেষে বিকেলে সূর্যোদয় দেখে রাতে আবার ঢাকায় ফিরতে পেরেছেন তারা। এক সময় ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১২ থেকে ১৪টি ফেরি সার্ভিস ছিল। সে কারণে কুয়াকাটায় পৌছাতে ২৪ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগতো। সর্বশেষ ভোগান্তি ছিল মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টের ফেরি। পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় মাত্র ৫ ঘণ্টায় কুয়াকাটা পৌছতে পেরে আনন্দিত পর্যটকরা।

পদ্মা সেতুর সুফলে এবার চট্টগ্রাম, জামালপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ সহ বিভিন্ন জেলার পর্যটকরা আসছেন সাগরকন্যা কুয়াকাটার সৌন্দর্য উপভোগ করতে।  ১৩টি দর্শনীয় স্পট দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সমুদ্রে ঢেউয়ের তালে তালে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে তরুণ তরুণীসহ নানান পেশার মানুষ। সমুদ্রে গোসল, ফুটবল খেলাসহ নানা আনন্দ উল্লাসে মেতে আছে পর্যটকরা।

রাখাইন মার্কেট, কুয়াকাটার কুয়া, শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার, মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধ মন্দির, রাখাইন পাড়া, সুন্দরবনের পূর্বাংশ ফাতরারবন, গঙ্গামতির লেক, লাল কাঁকড়ার চর, লেম্বুর বন, ইলিশ পার্ক সহ দর্শনীয় স্থান গুলোতে পর্যটকদের ভিড়। ট্যুরিজম, আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল, ঝিনুক, আচার, রাখাইন মার্কেট গুলোতে বেচা বিক্রিতে ধুম পড়েছে। বিনোদন পার্ক গুলোতে রয়েছে উপচেপড়া ভিড় এছাড়াও ফকির হাটের সোনাকাটা, লেম্বুর বন, গঙ্গামতিরচর, কাউয়ার চর বৌদ্ধ বিহার গুলোতে দেখা যাচ্ছে একই অবস্থা।

একাধিক পর্যটকরা জানান, আগে কেবল মাত্র ভোগান্তির জন্যই সাগরকন্যায় আসার আনন্দ ধুলোয় মিশে যেতো। সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত কোনোটাই দেখা সম্ভব হতো না। পরিবার-পরিজন নিয়ে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা একাধিক ব্যক্তি জানান, এবার ছুটির মধ্যেই পরিবার নিয়ে সাগরকন্যার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছেন। ঈদ উল আযহার দিন বিকেল থেকেই কুয়াকাটার একাধিক পর্যটন স্পট পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটারের সমুদ্র সৈকতে রাখাইনদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনা নিদর্শন দেখতে গভীর রাত পর্যন্ত ভিড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। পর্যটকদের চাপে এবার শতভাগ হোটেল-মোটেল বুকিং হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ৪/৫ কিলোমিটার দূরবর্তী হোটেলে কক্ষ ভাড়া নিচ্ছেন।

বরিশাল পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঈদ-উল আযহা উপলক্ষে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের ভিড় -ইত্তেফাক   

কুয়াকাটার ব্যবসায়ীরা জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই পর্যটক বাড়তে থাকে তাই এবার কোরবানির ছুটিতে প্রচুর পর্যটক আসবে এমনটাই প্রত্যাশা ছিল তাদের। তার প্রস্তুতি হিসেবে ফিশ ফ্রাইয়ের দোকানিরাও ভালো বিক্রির আশায় নানা ধরনের মাছ আগে ভাগেই কিনে ফ্রিজে মজুদ করে রেখেছিলেন। ব্যবসায়ী রহিম তালুকদার জানান, পর্যটকরা টুনা ফিস বেশি পছন্দ করেন। তাই টুনা ফিস বেশি করে মজুদ করার পাশাপাশি কাঁকড়া, কোরাল, চিংড়ি, রূপচাঁদা মাছও কিনে রেখেছেন।

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু জানান, সাগরের জলরাশিতে বেড়ানোর জন্য লাইফবোট এর পাশাপাশি স্পিডবোট, ওয়াটার বাইকে করে নিকটবর্তী লেম্বুরচর, ফাতরার চর, গঙ্গামতী, আশার চরে যাতায়াত করছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ চর বিজয় ভ্রমণ করছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। 

কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ জানান, তাদের অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত হোটেল-মোটেল রয়েছে ৭৪টি। এর বাইরে রয়েছেন ৫৬টি। কোরবানির ঈদের পূর্বেই প্রায় ৮০ ভাগ হোটেল-মোটেলই বুকিং হয়েছিল। আগে শুধু শীতকালে কুয়াকাটায় বেশি পর্যটক বেড়াতে আসতেন কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কুয়াকাটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে শুঁটকি ব্যবসায়ী, শামুক-ঝিনুকের দোকানদার, বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফার, মোটরসাইকেল চালক, ভ্যান চালক, ট্যুর অপারেটরদের আয় বেড়েছে কয়েকগুণ। তারা জানান, দুই বছরের করোনাকালের পাশাপাশি একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ব্যবসায়িক মন্দা ছিল। কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ঢাকা সহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ অতি সহজেই কুয়াকাটায় আসতে পারায় ভাগ্য ফিরছে বড়-ছোট ব্যবসায়ীদের।

কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশ জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ জানান, পর্যটকদের বাড়তি নিরাপত্তা দিতে ভ্রাম্যমাণ টিম সহ একাধিক টিম সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. আমিন উল হাসান জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজর রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে। তাই সেখানে মেগা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। পদ্মা সেতুর সুফল সবচেয়ে বেশি ভোগ করবে কুয়াকাটাবাসী। পদ্মা সেতু পারি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক কোনো প্রকার ভোগান্তি ছাড়া যাতায়াত করায় এ অঞ্চলের মানুষের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, পর্যটকদের ভোগান্তি লাঘবে ইতিমধ্যে কুয়াকাটাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমআর