অ্যালোঞ্জো ক্লেমন্স চার বছর বয়সে দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পান। এই আঘাতের কারণে হয়ে ওঠেন বিস্ময়কর একজন ভাস্কর
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, আইনস্টাইন, মারি কুরি, তেসলা, মোত্সার্ট, শেকসপিয়র, রবীন্দ্রনাথ কিংবা স্টিফেন হকিং-এর মতো অনেক বিজ্ঞানী, সুরস্রষ্টা, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী, মনীষীদের কী এমন ছিল যে তাঁদের অলৌকিক প্রতিভা যুগে যুগে মানুষের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে! তাঁরা নিশ্চয়ই বহু আলোকবর্ষ দূরের অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেননি। আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই দেখতে, পার্থক্য করাই যায় না। তারপরও তাঁরা সাধারণ থেকে আলাদা, অসাধারণ প্রতিভাধর। সকল মানুষ তাঁদের মতো হয় না কেন? তবে কি কোনো উপায়ে সুপ্ত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে অমন প্রতিভাবান অতিমানুষে পরিণত করা যাবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন স্বর্ণযুগে বেশ কিছু বিজ্ঞানী এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নৃবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস গাল্টনের তত্ত্ব অনুসারে বাবা এবং মা দুজনেই খুব প্রতিভাবান, সৃজনশীল, মেধাবী অথবা চরিত্রবান হলেই যে তাদের সন্তানেরা তেমনটি হবে, বিজ্ঞানীরা আজ আর তা মানতে রাজি নন। কারণ তাদের মতে মানুষের বংশগতির উপাদানের কয়েকটি আণবিক একক (জিন) একত্রে প্রতিভা, সৃজনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা বা মন-মানসিকতার জন্য দায়ী হলেও তা সব সময়ে সন্তানে প্রকাশ পাবে, মোটেই তা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় তারা তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বংশগতির প্রভাব থাকলেও বুদ্ধিমত্তা, মেধা বা মানুষের কর্মক্ষমতা, প্রতিভা, সৃজনশীলতা, পারদর্শিতা অনেকটাই নির্ভর করে তার পরিবেশ-পরিস্হিতির ওপর। যেমন, সংগীতে অনুরাগী এবং একই প্রতিভার দুজনের একজন তার পরিবার থেকে উত্সাহ, সহযোগিতা পাচ্ছে এবং অন্যজন তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেক্ষেত্রে প্রথমজন প্রতিভা বিকাশে, সৃজনশীলতায় দ্বিতীয়জন থেকে এগিয়ে থাকবেন। আইনস্টাইনের কথাই ধরা যাক, তিনি মেধাবী বা প্রতিভাধর হিসাবে জন্ম নেননি। ছাত্র হিসাবে খুব যে চমকে দিয়েছিলেন, তা জানা যায় না। তবে যা জানা যায়, তাহলো সাধারণ যোগ-বিয়োগে ভুল করে বসতেন বা অনেক সময় অনেককিছু ভুলে যেতেন। তবে তার ভাগ্য ভালো ছিল, তিনি একটি খুব ভালো পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। মা-বাবা দুজনেই তাকে বিজ্ঞানচর্চায় উত্সাহ জোগাতেন, তার কৌতূহল, জানার স্পৃহাকে উসকে দিতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ প্রতিভার উজ্জ্বল স্ফুরণে তার মা-বাবার ভূমিকা প্রভাব ফেলেছিল।
মেধা এবং প্রতিভা এক কথা নয়, পার্থক্য আছে। অনেকেই অঙ্কে খুব ভালো, স্মরণশক্তি, স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধি প্রখর এবং মেধার জোরে পরীক্ষার খাতায় অনেকেই বেশ ভালো নম্বর পায়, সহজে তাদের ভাগ্যে চাকরিও জুটে যায়। তাদেরকে মেধাবী বলা গেলেও প্রতিভাবান বলা যাবে না। প্রতিভাবানরা হন সৃজনশীল, বিস্ময়কর উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তারা অঙ্কে কাঁচা, স্মরণশক্তি-স্মৃতিশক্তি-ধীশক্তিতে দুর্বল হলেও তারাই তাদের অবিস্মরণীয় উদ্ভাবনী জ্ঞান, প্রজ্ঞা দিয়ে পৃথিবী বদলে দিয়েছেন, মানবতাকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
তবে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বেশ কিছুদিন যাবৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করে আসছেন। কিছু দুর্ঘটনা কারো কারো জীবনে একান্ত আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে, অর্থাৎ দুর্ঘটনা কিছু কিছু ব্যক্তির প্রতিভার উন্মেষ ঘটিয়েছে।
অ্যালোঞ্জো ক্লেমন্স (জন্ম ১৯৫৮) একজন আমেরিকান প্রতিভাধর ভাস্কর। তাঁর যখন মাত্র ৪ বছর বয়স, তখন তিনি একদিন ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। ফলে তাঁর বুদ্ধিমত্তা অনেকখানি লোপ পায়। একদম হাবাগোবা ধরনের একজন মানুষ। যেখানে বেশির ভাগ মানুষের আইকিউ স্কোর ৮৫ এবং ১১৫-এর মধ্যে, সেখানে তাঁর আইকিউ স্কোর মাত্র ৪০। তবে তিনি অবিশ্বাস্য রকমের সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী হন। মাত্র এক পলক দেখেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে যে কোনো প্রাণীর নিখুঁত ভাস্কর্য সৃষ্টি করতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। কোনোরকম প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ ছাড়াই হয়ে ওঠেন বিশ্বের একজন খ্যাতনামা ভাস্কর।
অরল্যান্ডো সেরেল ১৯৭৯ সালে তখন তাঁর ১০ বছর বয়স, বেসবল খেলার সময় মাথার বাম পাশে বলের আঘাত পান। গুরুতর আহত না হলেও ঠিক পরের দিন থেকেই তিনি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলেন যে বছরের কোনো একটি দিনের উল্লেখ করলে তিনি চট করে সেদিনটির বার বলে দিতে পারেন এবং সে দিনটিতে তিনি কোথায় ছিলেন, কী করে ছিলেন, আবহাওয়া কেমন ছিল ইত্যাদি তিনি হুবহু বলতে পারেন। ২০০৬ সালে, ৩৯ বছর বয়সি আমেরিকান নাগরিক ডেরেক আমাতো পা পিছলে বেশ বেকায়দায় পড়ে গিয়ে সুইমিং পুলের শক্ত কংক্রিটে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। বেশ কয়েকদিন অচেতন ছিলেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পাঁচদিন পরে এক বন্ধুর বাসায় পিয়ানো দেখতে পেয়ে, খুব ইচ্ছা জাগে পিয়ানো বাজানোর। যিনি কি না জীবনে কখনোই পিয়ানোতে হাত রাখেননি, তিনি তাতে চমত্কার সুর তুললেন, সৃষ্টি করলেন মন মাতানো মেলোডি। বর্তমানে তিনি একজন পেশাদার পিয়ানো বাদক।
স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এ ধরনের ২০টি বিস্ময়কর দুর্ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। তারা লক্ষ করেছেন যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাথার বাম পাশে আঘাতে বিস্ময়কর প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছে। তারা নানাভাবে নিরলস গবেষণা করে যাচ্ছেন। তাদের ধারণা মানুষের মাথার এক অংশে লুকিয়ে আছে এমন রহস্যের চাবিকাঠি এবং তারা খুবই আশাবাদী, অচিরেই মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলতে সে অদৃশ্য জাদুর চাবিটি, তাদের হাতের মুঠোয় ধরা দেবে। তারা বিশ্বাস করেন, সবার মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিভা, এই প্রতিভাকে স্ফুরিত করা সম্ভব এবং প্রতিটি মানুষই অতিমানুষ।
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী
