বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফর

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২২, ১১:৩৩

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চলতি সপ্তাহব্যাপী মধ্যপ্রাচ্যে থাকবেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই অঞ্চলে এটিই তার প্রথম সফর। এখানে তিনি ১১ জন আঞ্চলিক নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করবেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তেলের ক্রমবর্ধমান দামের প্রেক্ষাপটকে এই সফরের আংশিক কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

সফরকালে বড় ধরনের কোনো কৌশলগত চুক্তি হবে বলে মনে হচ্ছে না। হোয়াইট হাউজ বলেছে, কয়েক বছর আগেকার তুলনায় এ অঞ্চলকে অধিকতর স্থিতিশীল করে তুলতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলতে চাইছেন। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যকে অপেক্ষাকৃত শান্তই বলা যায়। ইয়েমেনে সাত বছরের যুদ্ধে সহিংসতা এবং মন্দাবস্থায় বহু হতাহতের পর ইরান-সমর্থিত এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মধ্যে তিন মাসের যুদ্ধবিরতি হতে দেখা গেছে। যদিও ইসরাইলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ঘনঘন সহিংসতা হচ্ছে। তবে এটি গত বছরের গাজা যুদ্ধের মতো ঘটনা ছাড়া বড় কিছুই নয়। ইরাকে ইরান-সমর্থিত হামলা এবং মার্কিন প্রতিশোধ গ্রহণ এখন নিম্ন পর্যায়েই আছে।

মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ইতিমধ্যে সাংবাদিকদের বলেছেন, বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলটি অনেক বেশি স্থিতিশীল। তিনি বলেছিলেন, ‘অধিকতর স্থিতিশীল এবং কম যুদ্ধপূর্ণ অঞ্চল’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা করে।

আমরা দেখেছি যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর বিপরীতে সারা বিশ্বে তেল আসছে উপসাগর থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে্র গ্যাসের দাম বাড়তির দিকে এবং একই সঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। এমন অবস্থায় বাইডেন প্রশাসন উপসাগরীয় দেশগুলোকে তেলের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এই প্রেক্ষিতে যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বলছে যে বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য সফর তেলের বিষয়ে নয়। বরং হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে—‘শক্তি সুরক্ষা’ অন্যতম একটি ইস্যু।

এই সফরে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইরানকে মোকাবিলা করার পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ইয়েমেন যুদ্ধবিরতির জন্য সৌদি সমর্থন আদায়ের জোর চেষ্টা করবেন তিনি। আরেকটি আশা করা হচ্ছে, ইউক্রেনে আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য রাশিয়ার ওপর চাপ বজায় রাখতে সাহাঘ্য করার জন্য নেতাদের সহযোগিতা-সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করবেন বাইডেন।

গত বুধবার ইসরাইলে প্রথম বৈঠক শুরু হয়। ফিলিস্তিনি নেতৃৃত্বের সঙ্গে দেখা করতে পরের গন্তব্য ইসরাইল-অধিকৃৃত পশ্চিম তীর। সেখান থেকে সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি সম্মেলনে যোগ দেবেন তিনি। অতঃপর সৌদি নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্সহ কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, কাতার, ইরাক, জর্ডান এবং মিশরের নেতাদের সঙ্গে দেখা করবেন। তবে, মূল নাটকটি সামনে আসবে সম্ভবত শুক্রবার বা শনিবার, যখন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তার অসুস্হ পিতা ৮৬ বছর বয়সি সালমানের মুখোমুখি হবেন বাইডেন।

বাইডেন যখন রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দৌড়াচ্ছিলেন, সে সময় মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং ইয়েমেন যুদ্ধ বাড়ানোর জন্য দায়ী করে সৌদি আরবকে তিনি ‘দাক্ষিণাত্যের নিচ জাতি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ২০১৮ সালে সৌদি এজেন্টরা সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করে। বাইডেনের দল সে সময় প্রচার করেছিল, ঘটনার সঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমান জড়িত। তবে সে যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের উচ্চ মূল্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের স্বার্থগুলির মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে; যার ফলে তাদের উভয়েরই কথা বলা দরকার। একজন বিশ্লেষক ইতিমধ্যে বলেছেন, এই বৈঠকটি সম্পর্ককে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাবে—বরফ গলতেও পারে।

সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলিকে তেল উত্পাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইয়েমেন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্য সৌদি রাজতন্ত্রের প্রশংসা করছে বাইডেন প্রশাসন। কেননা, বাইডেনের শীর্ষ পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘যুদ্ধ শেষ করা’।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মিটিং মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্যও একটি বড় পাওয়া। এর মাধ্যমে তিনি তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা এবং পশ্চিমা বিনিয়োগ আকর্ষণ করার প্রচেষ্টা সফল করতে চেষ্টা চালাবেন। এটা সৌদি আরবকে তেল বিক্রির ওপর থেকে নির্ভরতা কমাবে। আরেকটি বিষয়, সালমান সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু অস্ত্র বিক্রির কথাও বলতে পারেন, যা ইয়েমেন যুদ্ধের কারণে বাইডেন স্হগিত করেছেন। মোটা দাগে আরেকটি বিষয় হলো, বাইডেনের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যদিও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্মুক্ত করতে চাইবে না সৌদি আরব, তবে তারা নিরাপত্তা ইস্যুতে সহযোগিতাসহ ইসরাইলের জন্য ‘ফ্লাইওভার রাইটস’ সংক্রান্ত কিছু চুক্তিতে রাজি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এটি নিশ্চিত করতে চেষ্টা করবে যে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে চলমান সম্পর্ক জোরদার করবে না সৌদি আরব। কেননা, চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তার করতে চায় এবং প্রচুর তেল কেনে। অন্যদিকে রাশিয়া তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এবং দেশটি এখন ইউক্রেন যুদ্ধের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাধাগ্রস্ত। এমতাবস্থায় রাশিয়া চাইবে সৌদি আরব তেল সরবরাহ কড়াকড়ি রাখুক, যাতে পশ্চিমা দেশগুলিকে বেকায়দায় ফেলা যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, বাইডেন এমন একটি দেশের সুনাম পুনরুদ্ধার করতে সাহাঘ্য করতে যাচ্ছেন, যেটি ভিন্নমতকে চূর্ণ করেছে এবং ইয়েমেনে বহু বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করেছে। মানবাধিকার আইনজীবীরা চান যে, বাইডেন সৌদির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই বিষয়গুলি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলুক। যদিও বাইডেন তা শুনতে বাধ্য নন। বরং তিনি বিতর্ক সম্পর্কে সচেতন। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, মানবাধিকারকে এজেন্ডায় রাখবেন তিনি।

পশ্চিম তীরে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বাইডেনের দেখা করার বিষয়ে হোয়াইট হাউজ বলেছে যে, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে চ্যানেলগুলিকে আরো গভীর করতে কাজ করা হবে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে সাহাঘ্য করার জন্য বাইডেন প্যালেস্টাইনি হাসপাতালের জন্য মার্কিন তহবিল ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যা ট্রাম্প বন্ধ করে দিয়েছিল। তাছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে শান্তির জন্য দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান এবং পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য মার্কিন সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করবেন বাইডেন—এমন আশাও করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউজ বলেছে, তারা ক্রমাগত নতুন শান্তি আলোচনার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করার উপায় খুঁজছে।

আরকেটি ইস্যু যা বাইডেন তুলতে পারেন, তা হলো, মে মাসে আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহকে হত্যা করা, যখন তিনি একটি ইসরাইলি সামরিক অভিযান কভার করছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, যে বুলেটটিতে তার মৃতু্য হয়েছে তা সম্ভবত ইসরাইলি সৈন্যদের কাছ থেকে এসেছে। যদিও ইসরাইল বলেছে, গুলিটি তার সেনা নাকি জঙ্গিদের—ঠিক কার কাছ থেকে এসেছে তা এখনো তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রায় ৫০ বছর আগে প্রথম ইসরাইলে গিয়েছিলেন এবং নিজেকে ইহুদি রাষ্ট্রের শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন। বেশির ভাগ ইসরাইলি বাইডেনের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। যদিও তারা ২০১৯ সালে ট্রাম্পকে বাইডেনের চেয়ে উচ্চতর রেটিং দিয়েছে। ট্রাম্প ইসরাইলের পক্ষ নেওয়ার জন্য বাহ্যিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন; যেমন— জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নিয়ে তার দাবিকে সমর্থন করা।

মনে রাখতে হবে, ইসরাইল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থানের মধ্যে রয়েছে। নভেম্বরে মাত্র তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে পঞ্চম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাইডেন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার ল্যাপিডের সঙ্গে দেখা করেছেন। ল্যাপিড স্বভাবতই ইসরাইলকে আপ টু ডেট রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাব্য পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে কথা বলতে চেষ্টা চালিয়েছেন। ইরানের নেতারা ইসরাইলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এবং পর্যায়ক্রমে ইসরাইলকে আক্রমণ করার হুমকি দেয়। ইসরাইলের বিশ্লেষকরা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে যে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যা অপ্রকাশিত। তারা কোনোমতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দিতে চায় না। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যা এবং ইরানে স্থাপনা নাশকতার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করে ইরান। এই সমস্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বাইডেন এই অঞ্চলে তথা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের ‘একীকরণ’ করতে চান। অর্থাত্ আরব দেশগুলির সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করতে চান। এমতাবস্থায়, যখন তিনি ইসরাইলি নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন, তখন ইসরাইলি এবং আমেরিকান কিংবা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি বহু আগে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতির কথা কতটুকু মনে পড়েছে— এটিই ভাববার বিষয়!

লেখক: মার্কিন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
এনপিআর থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসজেড