মানুষ সুদিনের অপেক্ষায় থাকে। আশায় থাকে উন্নত ভবিষ্যতের। কিন্তু গত আড়াই বত্সর ধরিয়া যাহা হইতেছে, তাহাকে এক বাক্যে বলিলে ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’ বলা যায়। আজকের দিনটাকে খারাপ বলিয়া মনে হইলেও আগামীকালটা আজকের তুলনায় আরো খারাপ হইতেছে। সুতরাং সেই তুলনায় আজকের দিনটা কালকের তুলনায় অবশ্যই ভালো বটে। যদিও তাহা সংকটে পরিপূর্ণ। সংকটের স্কন্ধে চাপিতেছে নূতন নূতন সংকট। এই পরিস্থিতিতে অনেকের চোখেই ঘুম নাই। মানুষ না-খাইয়া কিংবা আধপেটা খাইয়া দিন পার করিতেছে। যাহাদের অবস্থা সঙ্গিন, তাহাদের চোখে ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’ ভাবিতে ভাবিতে নিদ্রা জাঁকিয়া বসিতেও পারে। কিন্তু যাহারা ম্যানেজমেন্টে রহিয়াছেন, যাহাদের স্কন্ধে শতসহস্র মানুষের রুটিরুজির দায়িত্ব রহিয়াছে—তাহাদের চক্ষু হইতে নিদ্রা তিরোহিত হইয়া গিয়াছে। তাহাদের বিলাসিতা করিয়া বলিবার উপায় নাই—‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’। সংশপ্তকের মতো তাহাদের যুঝিয়া যাইতে হইতেছে। এই ম্যানেজমেন্টের লোকজন বুঝিতেছেন—পরিস্থিতি কতখানি ঘোলাটে হইতেছে ক্রমশ।
দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের কাছাকাছি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবচাইতে অধিক। দেশে দেশে গরিব মানুষ হইতেছে অতি গরিব। অগণিত মানুষ চলিয়া যাইতেছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। গত দুই বত্সর যাবত্ বিশ্ব ব্যস্ত ছিল কোভিডের ক্ষয়ক্ষতি পুষাইয়া লইবার সংগ্রামে। কোভিডের আঘাত মোকাবিলা করিয়া আমরাও অল্প অল্প করিয়া আগাইতে শুরু করিয়াছিলাম। কিন্তু ফেব্র‚য়ারির শেষার্ধে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পুনরায় সকল কিছু তছনছ করিয়া দিতেছে। ইতিমধ্যে ইহার নানা লক্ষণ দৃশ্যমান। প্রথমেই গ্যাস ও বিদ্যুত্সংকট প্রকট হইতেছে। এই সংকটের সঙ্গেই সৃষ্টি হইতেছে মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকি সমস্যা, রাজস্ব সমস্যা, লোডশেডিং সমস্যা। যেই আশার আলো আমরা দেখিতে শুরু করিয়াছিলাম তাহাতে ছেদ পড়িতেছে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা ইতিমধ্যে নানা সংকেত দিতেছেন। বস্ত্র ব্যবসায়ী, বস্ত্র খাতের শিল্পপতি, তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলিতেছেন তাহাদের উত্পাদন তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় ব্যাহত হইতেছে। তাহারা গ্যাস পাইতেছেন না, বিদু্যত্ পাইতেছেন না। এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজার টালমাটাল। তাহার উপর গ্যাস-বিদু্যতের অভাব ব্যবসাকে অনিশ্চিত করিয়া তুলিতেছে।
এই মুহূর্তে গোটা বিশ্ব কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি। যখন একটি দেশের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) টানা ছয় মাস হ্রাস পায়, তখন এই সময়কালকে অর্থনৈতিক মন্দা বলা হয়। যদি দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে কোনো দেশের জিডিপি ১০ শতাংশের বেশি কমিয়া যায়, তাহা হইলে তাহাকে ডিপ্রেশন বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে, ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দা আসে, যাহাকে বলা হয় দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন। অন্যদিকে, জিডিপি বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমিতে থাকিলে তাহাকে অর্থনৈতিক মন্দা বলা হয়। সেই হিসাবে বিশ্বব্যাপী নূতন করিয়া মন্দার পদধ্বনি শোনা যাইতেছে। আমেরিকা, চীন এবং ব্রিটেনসহ অন্যান্য ইউরোপীয় অর্থনীতির সামনে মন্দার ঝুঁকি আরো গুরুতর। আর ইহাদের মন্দা ঘটিলে তাহার প্রভাব বিশ্বের প্রায় সকল দেশের উপরই পড়ে। সবচাইতে বেশি প্রভাব পড়ে জীবিকার উপর। মানুষের জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাহার বাঁচিয়া থাকিবার জন্য নূ্যনতম কাজের নিশ্চয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। মহামূল্যবান জীবনকে রক্ষা করিতে জীবিকাই একমাত্র অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন ছাড়া বাঁচিবে না জীবন। অবস্থাদৃষ্টে এমন মনে হইতেছে যে, এই সংকটের গভীরতা ও তীব্রতায় উন্নয়নশীল বিশ্বের ছোট অর্থনীতির দেশগুলিকে সম্ভবত স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে নিজহাতে বাঁচাইতে হইবে।
এই অবস্থায় কোনো দেশ যদি স্বাভাবিক সময়ের মতো গতানুগতিক ম্যানেজমেন্ট দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তাহা চলমান সমস্যা ও আসন্ন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে আরো জটিল করিতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকিতে না পারিয়া ব্যবসা সংকুচিত করিয়াছে। শ্রমিক ছাঁটাই করিতে বাধ্য হইতেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধই হইয়া গিয়াছে। এই অবস্থায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি আলাদা ম্যানেজমেন্ট তৈরি না করে, তবে সামনে দীর্ঘ অন্ধকার রাত দেখা দিতেই পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকিলে অদূর ভবিষ্যতে টানেলের শেষ প্রান্তেও আলোর দেখা মিলিবে না। বিশেষ ব্যবস্থাপনার হালনাগাদ সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে হইবে। এই জন্যই স্ব স্ব ক্ষেত্রে যাহারা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে রহিয়াছেন—তাহাদের চোখে নিদ্রা নাই। ইহা এক অতি কঠিন পরীক্ষা।
