ইংরেজি ভাষায় ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এভিল’ বা প্রশাসনে অশুভ শক্তি বলিয়া একটি টার্ম চালু আছে। এই পরিভাষার ব্যবহারকারী গে বি অ্যাডাম, ড্রানি এল ব্যালফোর এবং অ্যাশলি ই নিকেলস তাহাদের রচিত ‘আনমাস্কিং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এভিল’ গ্রম্হে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি উল্লেখ করিয়াছেন তাহা বাংলায় তর্জমা করিলে অর্থ দাঁড়ায়, ‘প্রশাসনিক অশুভ শক্তি থাকে বিদ্বেষপূর্ণ। ইহারা লুকাইয়া থাকে সাংগঠনিক কাঠামোর ছায়ার নিচে। প্রশাসক ভাবেন, তাহারা সঠিকভাবেই কাজ করিতেছে। কোনো অশুভ শক্তিকে সহায়তা করিবার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসকের অজ্ঞাতসারেই এই অশুভ শক্তি মদত পাইয়া থাকে। ইহা একটি সরকারের জন্য ভয়াবহ রকমের বিপজ্জনক বিষয়। ইহারা প্রশাসকের নীতি-পলিসি বাস্তবায়নে অনীহ হইয়া থাকে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হইয়া দাঁড়ায়। অতঃপর সরকার জনসমর্থন হারায়।’
এই দুষ্টচক্রের জালে পড়িয়াছে বাংলাদেশের প্রশাসন। দেশে রাজাকার-আলবদর তথা স্বাধীনতাবিরোধীরা যেইভাবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করিয়া বসিয়াছে এবং বসিতেছে, তাহা চিন্তাশীল নাগরিকদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আমাদের বুঝিয়া উঠিতে কষ্ট হয়, এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে তাহারা কী করিয়া পোস্টিং পাইয়া থাকে! তাহাদের এসিআর দেখিবার, ব্যাকগ্রাউন্ড দেখিবার ব্যবস্থা আছে। তদুপরি গোয়েন্দা সংস্থাগুলির রিপোর্ট থাকিবার কথা। এতত্সত্ত্বেও প্রশাসনে এই সকল অপশক্তির পদায়ন হয় কী করিয়া? বাংলাদেশ এমন কোনো বড় দেশ নহে। হোমোজেনিয়াস জাতি। এইখানে কোন পরিবার, কাহারা, কী ভূমিকা রাখিয়াছে, কাহার পিতা-পিতামহের পরিচয় কী তাহা কাহারোই অজানা থাকিবার কথা নহে। অথচ তাহার পরও রাজাকার-আলবদর পোষ্যরা তাহাদের সেই স্বাধীনতাবিরোধী মানসিকতা মস্তিষ্কে বহন করিয়াই প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ঢুকিয়া পড়িতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, অনতিবিলম্বে অভিযান চালাইয়া এই সকল ব্যক্তিকে সরাইয়া দেওয়া না হইলে সরকারের জন্য তাহা বিপজ্জনক পরিণতি ডাকিয়া আনিতে পারে। ইহা কোনো অস্পষ্ট বিষয় নহে যে, এই সকল রাজাকার-আলবদর পোষ্যরা তথা স্বাধীনতাবিরোধীদের মাধ্যমেই স্বাধীনতাবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করিয়া থাকে। ইহারা কখন কী ঘটাইবে, তাহা কাহারো জানা নাই। ইহারা কখনোই সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী নহে, বরং অনিষ্ট করিবার জন্য তত্পর থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হইলেও সত্য, প্রশাসনের হেন কোনো জায়গা নাই, হেন কোনো স্তর নাই যেইখানে ইহারা সক্রিয় নহে। ইহারা অবাধে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করিয়া নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করিয়া লইতেছে। আরো বড় সত্য হইল, হেন কোনো রাজনৈতিক দল নাই যাহার অভ্যন্তরে ইহারা প্রবেশ করে নাই। এমন কোনো রাজনৈতিক দল নাই, যেইখানে তাহাদের অজানা উত্সের অর্থ ব্যবহার হইতেছে না। ইহাও কিন্তু কাহারো অজানা নহে। আরো বিপজ্জনক কথা হইল, তাহাদের বিছানো জাল উত্তরোত্তর বিস্তার লাভ করিতেছে। এমনকি সরকারে সর্বোচ্চ পদের নিকটেই তাহারা শিকড় গাড়িয়া বসিতেছে। সরকারের বড় বড় উচ্চপদস্হ কর্তাব্যক্তিদের যেই হারে তাহারা অর্থ বিতরণ করেন, উহাও কাহারো অজানা থাকিবার কথা নহে। তাহা সত্ত্বেও মানুষ মনে করে উহা বোধ করি অজানা। তাহা না হইলে এই জাল একসময় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিয়া ফেলিবে।
পৃথিবীর ইতিহাসে ভূরি ভূরি উদাহরণ রহিয়াছে, রাজদরবার ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নীরবে চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু রাজা বা সম্রাট কিছুই বুঝিতে পারেন নাই। যখন বুঝিয়াছেন, তখন তিনি অসহায়, নখদন্তহীন। কিছুই করিবার নাই। সুতরাং সেই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণের পথ এখনো খোলা রহিয়াছে। সুতরাং এখনো সময় ফুরাইয়া যায় নাই সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার। লক্ষ রাখিতে হইবে, ইহাদের যাহাতে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদে পদায়ন না করা হয়।
