স্মৃতিতে অবরুদ্ধ গণতন্ত্র এবং একজন নেত্রী শেখ হাসিনা 

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২২, ১৪:৪৪

ফজরের আজান দেবে দেবে—এই মুহূর্তে মোবাইল ফোনে রিংটোন বেজে উঠল। খবর এলো সকালে জজকোর্টে থাকতে হবে। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতার হতে পারেন। এমন কথায় মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কিছুটা হতাশা এলো নিজের ভেতর। তবে একটা বিষয় আমাকে সাহস জোগাচ্ছিল এই ভেবে যে, বঙ্গবন্ধুকন্যাকে যেখানেই নেওয়া হোক না কেন, তিনি যেভাবে যে অবস্হাতেই থাকুন না কেন, আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে তার একটা নির্দেশই যথেষ্ট। সে সাহসে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। চলছে অঝোর বৃষ্টি। একের পর এক ফোন করে খোঁজ নিচ্ছি সুধা সদনের। শুনেছি, নেত্রী গ্রেফতার হয়েছেন। আমি তখন ঢাকা মহানগর (দ.) ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় সদস্য। ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে নেত্রীকে আদালতে ওঠানো হবে। এমন সময় আমরা কজন পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে ঢুকে পড়ি। পুলিশ ক্ষুব্ধ হয়ে লাঠিচার্জ করে। লাঠির বাড়ি খেয়ে দুজন সরে গেছে। আমিও একটু পেছনে সরে যাই। সুযোগ বুঝে আবারও বেষ্টনীর ভেতর ঢুকে পড়ে ঠিক নেত্রীর পাশে গিয়ে দাঁড়াই। এভাবে আদালতের ভেতরে নেত্রীর সঙ্গে ঢুকে যাই।

এদিকে বাইরে পুলিশ নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করছে। আমরা তখন আদালতের ভেতর, নেত্রীকে সিএমএম কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন্নাহারের আদালতে তোলা হয়েছে। ৮টা ৩৫ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে নেত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি এবং শুনেছি। নেত্রী শেখ হাসিনা সে সময় আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার আরগুমেন্ট এবং আমার আইনজীবীদের আবেদনের ভিত্তিতে আপনি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না। আপনার ইচ্ছা থাকলেও বিচারিক মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্বাধীনভাবে আদেশ দিতে পারবেন না। আপনাকে সরকার যেভাবে আদেশ লিখে দিয়েছে, আপনি সেভাবেই করবেন। আপনার হাত-পা বাঁধা। তার পরও আমার এ আবেদন মামলার মূল নথিতে অন্তভু‌র্ক্ত হওয়া দরকার। দয়া করে আমার এ কথাগুলো মামলার মূল নথিতে লিখে দেবেন। আমার যতটুকু মনে হচ্ছে, সরকার আমার বিরুদ্ধে এ মামলার রায়ও লিখে রেখেছে। আমার বিরুদ্ধে করা এই মামলার বাদীকে আমি জীবনেও দেখিনি। তার নামও শুনিনি। আমাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে দেশের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে আমাকে বাদ দিয়ে যেনতেন নীলনকশার নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য এটা করা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আমাকে গ্রেফতার করতে গেলে ওয়ারেন্ট আছে কি না জানতে চাইলে তারা ওয়ারেন্ট দেখাতে পারেনি। আমি বিচারের মুখোমুখি হতে ভয় পাই না। জেলজুলুম, নির্যাতন, এমনকি মৃতু্যকেও ভয় পাই না। এ কারণেই আমি বিচারের মুখোমুখি হয়েছি। আমি মহান আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। জনগণ আমার সঙ্গে আছে। আল্লাহতাআলা সহায় হলে কোনো চক্রান্ত সফল হবে না। আগেও আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর আমি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলাম। এটাই ছিল দেশের স্বর্ণযুগ। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছি। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে কখনো নিজে নীতি ও আদর্শচু্যত হওয়ার ব্যাপারে কল্পনাও করতে পারিনি। চাঁদাবাজি তো দূরে কথা আমার শাসনামলে ১ শতাংশ দুর্নীতিও হয়নি। বিদেশের মাটিতে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছি। যদি চাঁদাবাজ বা অর্থলোভী হতাম, তাহলে বিশ্বের সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করত না। এই ডক্টরেট ডিগ্রি ছাড়াও বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি, যা দেশের মর্যাদাকে অনেক উঁচুতে উঠিয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের দুই মেয়ে আমরা, রাষ্ট্র থেকে কিছুই নিইনি। বরং ত্যাগের ব্যাপারে উদাহরণ সৃষ্টি করেছি। ফারাক্কা চুক্তি-শান্িতচুক্তির মাধ্যমে দেশের অনেক দিনের সমস্যা আমিই সমাধান করেছি। অন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার ভিন্ন ধরনের ইমেজ রয়েছে। চাঁদাবাজি করলে এগুলো অর্জন করতে পারতাম না। ’৬২ সাল থেকে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে অভ্যস্ত। মৃতু্যভয়ও আমাকে সংগ্রাম থেকে পিছু হটাতে পারবে না।

এই সরকার দেশটাকে ধ্বংসের কাছে নিয়ে এসেছে। দেশ ও জনগণের প্রতি দরদ ও দায়বোধ নেই। বিদু্যত্ সমস্যা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা। আমি এ ব্যাপারে কথা বলিয়ে আমাকে হেনস্তা করতে এ মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি দুর্নীতি বা চাঁদাবাজি করেছি—এ কথা দেশের একজন অন্ধ মানুষও বিশ্বাস করবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ নিয়ে এরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। ছয় মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত ভোটার তালিকা তৈরির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। নির্বাচনের জন্য ৮৭% একটি তামাশার রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। সরকার এখন মানুষের ভোটাধিকার লঙ্ঘন করে বন্দুকের নল দিয়ে মানুষের অধিকার হরণ করতে চায়।’

জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে নেত্রী বলেন, মাননীয় আদালত, আমি জানি আপনি আমাকে ইচ্ছা থাকলেও জামিন দিতে পারবেন না। তবে দয়া করে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠাবেন না। সেখানে ’৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি রয়েছে। এটাকে আমি নিজের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করি।’

আদালত সেদিন নেত্রীর জামিন নামঞ্জুর করেন। আমরা কর্মীরা আবেগে কেঁদে ফেলি। আবেগাপ্লুত নেতাকর্মীরা পুলিশ-র্যাবের ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেও স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ঢাকা মহানগর
দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ও সাবেক সহ-সভাপতি
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন