সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষকদের অবমাননা জাতির রক্তক্ষরণ 

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২২, ০১:১৮

শিক্ষা দান ও গ্রহণের মধ্য দিয়েই ছাত্র-শিক্ষকের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের সম্পর্ক হবে গুরু-শিষ্যের মতো। শিক্ষকরা ছাত্রদের যেমন আদর করবেন, আবার প্রয়োজনে শাসনও করবেন। প্রকৃত শিক্ষা একজন মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখায়। শিক্ষা থেকে অর্জিত জ্ঞান মন ও জীবনকে আলোকিত করে। শিক্ষকদের বলা হয় সমাজ নির্মাণের স্থপতি। আল্লামা ইকবাল যথার্থ বলেছেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন একজন মিস্ত্রি, যিনি গঠন করেন মানবাত্মা। কিন্তু এখন আমরা কি দেখতে পাচ্ছি, ছাত্রদের হাতে অহরহ লাঞ্ছিত হচ্ছেন শিক্ষকরা, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা যাচ্ছে।

২০০৪ সালে অমর একুশে বইমেলায় মুক্তচিন্তার লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর একদল উগ্র মৌলবাদী হামলা করে। ২০১৮ সালে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তমঞ্চে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে বিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালানো হয়। শিক্ষকদের ওপর হামলা নতুন কিছু নয়, বেশ কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অবমাননা, শারীরিক নির্যাতন, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটছে। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, অধ্যাপক জাফর ইকবাল যেমন মুক্তচিন্তার মতামতের জন্য আক্রান্ত হয়েছেন। আবার নগ্ন বিষাক্ত ছোবলে লাঞ্ছিত হয়েছেন শ্যামল কান্তি ভক্ত, হৃদয় মণ্ডল, আমোদিনী পাল, স্বপন কুমার বিশ্বাসরা। নওগাঁর রানীনগর মহিলা কলেজের বাংলা অধ্যাপক আবদুর রউফ মিঞা ও রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক এ কে এম নুরুন্নবী লাইজুকে ভিন্নমত পোষণের জন্য তাদেরকেও আক্রান্ত হতে হয়েছে।

বাঙালির সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে তো কখনো এমন উগ্রতা ছিল না। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবার সম্মিলিত ঐক্যের মধ্য দিয়ে স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু পঁচাত্তরের পর জিয়াউর রহমান, এরশাদ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে যে সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতির সূচনা করেছিল, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেও সেই ধারা অব্যাহত রাখেন। মৌলবাদী সংগঠনগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার কারণে জাতীয় চরিত্রটাই পালটে গেছে। তার পর থেকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

একজন শিক্ষকের পরিচয় তো তিনি ছাত্রদের কাছে শিক্ষাগুরু। তার কোনো ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভিন্নমতের পরিচয় থাকতে পারে না। তিনি ক্লাসে কী শিক্ষা দিচ্ছেন সেটাই মুখ্য। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, ভিন্ন মতের হলেই তাদের প্রিয় ছাত্রদের হাতে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এ অবস্থার জন্য সমাজবিজ্ঞানীরা, পারিবারিক শিক্ষাকেই দায়ী করছেন। একটা শিশু পরিবার থেকে যে শিক্ষা পায়, সেটা তার মনোজগতে ঢুকে যায়। স্কুলে গিয়েও সে সেটির চর্চা করার চেষ্টা করে। সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে পেলাম সাভারের হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে। একজন বখাটে ছাত্রের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এমন ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে।

শিক্ষাগুরুকে সম্মান জানাতে রাষ্ট্রীয় কোনো পদ-পদবিই বাধা নয়, আন্তরিক ইচ্ছাটাই মুখ্য। সেটাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা দশরত্ন শেখ হাসিনা আমাদের দেখিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা জি টি স্কুলে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তখন বেজেন্দ্রনাথ সূত্রধর নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সেই শিক্ষককে ভোলেননি। একদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে শিক্ষক বেজেন্দ্রনাথ গণভবনে আসেন। বঙ্গবন্ধু সব প্রোটোকল উপেক্ষা করে তার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষককে আনতে গেটে ছুটে যান। স্যারের পা ধরে সালাম করে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধু অফিসকক্ষে নিয়ে নিজের চেয়ারে বসিয়ে উপস্থিত মন্ত্রী, এমপি ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গর্ব করে বলেন, ‘আমার শিক্ষক।’ একই শ্রদ্ধাবোধ দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মধ্যে। ২০১৯ সালে বইমেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামানকে লালগালিচা ছেড়ে দিয়ে তিনি পাশে হেঁটেছেন। এমন সময় প্রিয় শিক্ষকের কাঁধ থেকে অসতর্কতায় চাদর পড়ে যেতে দেখলে গভীর মমতায় চাদরটি কাঁধে গুছিয়ে দিয়েছেন। ২০২১ সালে আরেক শিক্ষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকে ভূষিত করা হয়। করোনা ভাইরাসের কারণে নিজের শিক্ষককে নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দিতে না পেরে মনোবেদনার কথা ফুটে উঠেছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কণ্ঠে। তিনি অনুষ্ঠানে ভাচু‌র্য়ালি সংযুক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। করোনা ভাইরাসের কারণে আসতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রী হয়েও সব স্বাধীনতা থাকে না। অনেকটা বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। সে রকমই আছি।’

দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা ভিন্নমতের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে, এই নির্মম বাস্তবতা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আজ সমাজের উগ্র গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে শিক্ষককেরা। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ তুলে জুতার মালা কিংবা কান ধরানোর মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। অথচ শিক্ষকরা জাতির মেরুদণ্ড, মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের প্রতি এমন অমানবিক ঘটনা, জাতি হিসেবে আমাদের কাছে অত্যন্ত লজ্জাকর। এসব অবমাননা শুধু শিক্ষকদের নয়, পুরো জাতির মেরুদণ্ডের রক্তক্ষরণ।

লেখক :সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন