বাংলাদেশ-ডেনমার্ক সম্পর্কের ৫০ বছর ও প্রিন্সেস মেরির সাম্প্রতিক সফর

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২২, ০২:৪৮

বাংলাদেশ-ডেনমার্ক সম্পর্কের ৫০ বছরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনন্য অধ্যায় রচিত হয়েছে। অর্ধশতাব্দীকালের সুসম্পর্ক দুই দেশের কূটনৈতিক সাফল্যে নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক মাইলফলক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রথমার্ধেই ডেনমার্ক স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। ১৯৭২ সালে ঢাকায় রয়্যাল ডেনিশ দূতাবাস স্থাপিত হয়। উভয় দেশই বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ও সহানুভূতির স্বাক্ষর হিসেবে উষ্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা অদ্যাবধি বহমান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সহযোগিতার দৃষ্টান্তগুলো চোখে পড়ার মতো। বৈশ্বিক নানা ইস্যুতেও সমভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেশ দুটিকে একাত্ম করেছে। 

আমরা জানি, বিশ্বব্যাপী গ্রিন এনভায়রনমেন্ট ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ডেনমার্ক একটি নেতৃস্থানীয় দেশ। নবায়নযোগ্য শক্তি-সামর্থ্য ও দক্ষতা, পানি ও বর্জ্য পরিশোধন, সবুজ নগরায়ণের পরিকল্পনা, টেকসই খাদ্যোত্পাদন ও খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রভৃতি গ্রিন ইস্যুগুলোতে অসাধারণ দক্ষতার বিস্তৃত পরিসর রয়েছে দেশটির। ডেনিশ নেতৃত্বাধীন ‘গ্লোবাল গ্রিন ইনিশিয়েটিভ’ ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে এতে। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে পিফোরজি (পার্টনারিং ফর গ্রিন গ্রোথ অ্যান্ড গ্লোবাল গোলস ২০৩০), যার লক্ষ্য উদ্ভাবনী পিপিপি বিকাশ এবং ত্বরান্বিত করা। পাঁচটি সুনির্ধারিত ক্ষেত্রে ক্রস-সেক্টর সহযোগিতা লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন লাভ করেছে এই উদ্যোগ। খাদ্য ও কৃষি (এসডিজি ২), জল (এসডিজি ৬), শক্তি (এসডিজি ৭), শহরাঞ্চল (এসডিজি ১১), এবং বৃত্তাকার অর্থনীতি (এসডিজি ১২)—এই পাঁচটি ক্ষেত্রে এর সুফল মিলবে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে বাংলাদেশ। পিফোরজি ফোরামে বাংলাদেশের যোগদান আগামী দিনে সবুজ সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রকে আরো প্রসারিত করবে বলে আমরা আশাবাদী। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের অক্টোবরে কোপেনহেগেনে প্রথম পিফোরজি সামিটে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যদিও বিশেষ কারণে তিনি ডেনমার্কের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী লার্স লোককে রাসমুসেনের আমন্ত্রণে সাড়া দিতে পারেনননি সে সময়।

দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক বর্তমানে জ্বালানি ও প্রযুক্তিসহ পারস্পরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সোনালি যুগে পদার্পণ করেছে। গত এপ্রিলের শেষ দিকে ক্রাউন প্রিন্সেস মেরি এলিজাবেথ ডোনাল্ডসন এবং ডেনমার্কের উন্নয়ন ও সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী ফ্লেমিং মোলার মর্টেনসেনের বাংলাদেশ সফরের সময়কে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। সফরকালে ডেনিশ মন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী দিনে জ্বালানি ও প্রযুক্তিসহ একাধিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরো বাড়ানো হবে। গণভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়। এমনকি ক্রাউন প্রিন্সেস কক্সবাজারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সে সময় তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি গাছ রোপণ করেন এবং ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণ এবং ডিআরসি এনভায়রনমেন্টাল রিহ্যাভিলিটেশন তদারকি করেন। ক্রাউন প্রিন্সেস বেশ কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গেও দেখা করেন, তাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কথা শোনেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। আমরা দেখেছি, প্রিন্সেস মেরি কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা যান, যেখানে তিনি কুলটি গ্রামে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেন, তাদের সমস্যার কথা শোনেন।

মূলত এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং ডেনিশ-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করা। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রিন্সেস মেরিকে বলতে শুনেছি—‘এই সফরে জনসংখ্যা, প্রকৃতি এবং জীববৈচিয্যেরর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করা হয়েছে—এর ওপর ফোকাস করা হয়েছে; কারণ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, যেখানে ২০৫০ সালের মধ্যে ২০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং ডেনমার্কের উন্নয়ন সহযোগিতা মন্ত্রী ফ্লেমিং মোলার মর্টেনসেন জলবায়ু এবং সবুজ পরিবর্তনের বিষয়ে দুই দেশের সম্পৃক্ততা-সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড গ্রিন ফ্রেমওয়ার্ক এনগেইজমেন্ট’ স্বাক্ষর করেন—যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাৎপর্যপূর্ণ এই অর্থে যে, এই নথিতে স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং ক্রাউন প্রিন্সেস মেরি। বলতেই হয়, কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে দুই দেশ সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকে আরো টেকসই ও সবুজে পরিণত করতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে চায় সামনের দিনগুলোতে—এই সংবাদ বহুল কাঙ্ক্ষিত।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, টেকসই উন্নয়নের জন্য এজেন্ডা-২০৩০ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে প্যারিস চুক্তির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয় রোধ এবং জীববৈচিত্রে্যর ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে আরো তুলে ধরা হয়, ডেনমার্ক একটি টেকসই এবং সবুজ ভবিষ্যৎ তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে জ্ঞান ও প্রযুক্তি শেয়ারকারী প্রথম দেশ। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর ডেনিশ মন্ত্রী এবং ড. মোমেন দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগিতাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। এই আলোচনা আগামী দিনে ফলপ্রসূ হয়ে আবির্ভূত হবে, বলাই বাহুল্য।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাংলাদেশের সঙ্গে ডেনমার্ক যে ‘ফ্রেমওয়ার্ক এনগেজমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে, তার আওতায় জ্ঞান ও প্রযুক্তি শেয়ারের মাধ্যমে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব লক্ষ্য অর্জনে বহুদূর এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সম্পর্ক ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে শুরু করে জলবায়ু তহবিল ও বিনিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বসহ বাণিজ্য ও বেসরকারি খাতের যোগাযোগের সমস্ত পর্যায়ে প্রকল্পটি সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে সময় বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্পটি আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের দুই দেশের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার স্মারক। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তন পরিকল্পনা এবং ডেনিশ উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় বিকাশে সহায়তা করবে।’

বাংলাদেশে প্রথম সফর করা ডেনমার্কের উন্নয়ন সহযোগিতা মন্ত্রীর আনন্দ প্রকাশেরও সাক্ষী আমরা। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, “ডেনমার্ক এবং বাংলাদেশ এমন দুটি দেশ, যারা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সমস্যায় সহায়ক এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করতে চায়। আজ গ্রিন ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরের অর্থ হচ্ছে, প্যারিস আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিতে প্রণীত বাধ্যবাধকতা নিয়ে আমরা ‘একসঙ্গে হাঁটতে’ প্রস্তুত।”

মোটাদাগে উল্লেখ করতে হয়, বাংলাদেশের ‘বিষ্ময়কর উন্নয়ন-সমৃদ্ধি’ প্রত্যক্ষ করে শেখ হাসিনার দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা করেন সফররতরা। আমরা লক্ষ করছি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেনমার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি চমত্কার ইতিবাচক বাণিজ্য ভারসাম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে অনুকূল। প্রায় ৪০টি ডেনিশ কোম্পানি কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত, যা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয়। এই প্রবণতা এটা স্পষ্ট করে যে, ডেনমার্কের জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় বাজার। আগামী বছরগুলোতে কৌশলগত ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। ডেনিশ কোম্পানি এবং ডেনমার্কের বিনিয়োগের প্রত্যাশা এক্ষেত্রে অলীক নয় কোনোভাবেই।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-সম্পর্কিত জাতিসংঘের কমট্রেড ডাটাবেস বলছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ডেনমার্কের আমদানির পরিমাণ ৯৯১.৭ মিলিয়ন। যার মধ্যে নিট সোয়েটার (১৮৮ মিলিয়ন), নিট টি-শার্ট (১৪০ মিলিয়ন), এবং নন-নিট মেনস সুট (১০৪ মিলিয়ন)। ডেনমার্কে রপ্তানি বেড়েছে—গত ২৫ বছরে ডেনমার্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বার্ষিক হারে ৯.৪৮ শতাংশ বেড়েছে, যা ১৯৯৫ সালের ৭৪.৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২১ সালে ৯৯১ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ডেনমার্ক ২০২০ সালে বাংলাদেশে ৫৯.২ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশে ডেনমার্কের রপ্তানি গত ২৫ বছরে বার্ষিক ১.০৯ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা ১৯৯৫ সালের ৪৫.১ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২০ সালে ৫৯.২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

মোটকথা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই ডেনমার্কের উন্নয়ন সহায়তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। বিশ্বে আজ বাংলাদেশের অবস্হান অত্যন্ত মজবুত। দেশের বৈশ্বিক অর্জন অকল্পনীয়। উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণকারীর তকমা ঘুচিয়ে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে উন্নীত হয়েছে আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যকার ৫০ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের যে গাঢ় দৃশ্য আমরা অবলোকন করছি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে তা সর্বোচ্চ প্রশংসার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের সফল পররাষ্ট্রনীতির কল্যাণে দুই বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যকার অংশীদারিত্ব উত্তরোত্তর জোরদার হবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক :আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/ ইআ