আমরা কিছুই করিতেছি না, তাহা সঠিক নহে

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২২, ১০:২৩

বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হইল হালদা নদী। ইহার উজানে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার বিশাল অংশ জুড়িয়া গত কয়েক বৎসর ধরিয়া চাষ করা হইত তামাক। এখন সেইখানে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ও পরামর্শে তামাকের বিকল্প হিসাবে চাষ করা হইতেছে বিভিন্ন জাতের সবজি ও ফলমূল। বিশেষ করিয়া সেইখানে মালচিং পদ্ধতিতে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে ব্যাপক সাফল্য আসিয়াছে। বাংলাদেশ যে একটি সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা দেশ এবং ইহাই যে এই দেশটির অফুরন্ত প্রাণশক্তি, তাহা এই রকম সাফল্যময় ছোট্ট ছোট্ট ঘটনার মধ্য দিয়া বারংবার প্রমাণিত হইতেছে।

গত পাঁচ দশকে কৃষি উৎপাদনে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করিয়াছে বাংলাদেশ। বলা যায়, এই ক্ষেত্রে ঘটিয়া গিয়াছে এক নীরব ও সবুজ বিপ্লব। কৃষিজমি কমিতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাংবাত্সরিক বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতির মধ্যেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে এক উদাহরণ সৃষ্টি করিয়াছে। কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী সবজি উৎপাদনে তৃতীয় এবং চাল ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে। আলু উৎপাদনে অষ্টম এবং ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে রহিয়াছে বাংলাদেশের নাম। সুলভে ও ভতু‌র্কিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি এবং বিনা মূল্যে সার ও বীজ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রণোদনা অব্যাহত থাকায় এই সকল সাফল্য ধরা দিতেছে। ইহাতে স্বাধীনতার পর হইতে বাংলাদেশের ধানের উত্পাদন তিন গুণেরও অধিক, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বাড়িয়াছে ১০ গুণ। অন্যদিকে ফলফলাদি উৎপাদনেও আমাদের সাফল্য ঈষণীয়। এই মুহূর্তে বিশ্বে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হারের রেকর্ড বাংলাদেশের। বত্সরে সাড়ে ১১ শতাংশ হারে ফল উৎপাদন বাড়িতেছে এখানে। ইহার ফলে কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারায় অষ্টম এবং পেঁপেতে ১৪তম স্থানে রহিয়াছে বাংলাদেশ। এমনকি বিদেশি ফল, যেমন—ড্রাগন, বারোমাসি থাই আম, স্ট্রবেরি, মাল্টা, কমলা, কুল, মেলন, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, পার্সিমন, খেজুর, থাই শরিফা ইত্যাদির উৎপাদনও বাড়িতেছে।

এই সাফল্যের আসল রহস্য কোথায়? মনে রাখিতে হইবে, আমাদের কৃষকরা পূর্বের মতো আর হাড্ডিসার নহেন। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি অনুসরণের কারণে আমাদের কৃষি ও কৃষকের ব্যাপক উন্নয়ন হইয়াছে। আজকাল শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আধুনিক চাষাবাদে নিজেদের নাম লেখাইতেছেন। একসময় যেই সকল ফল বিদেশ হইতে আমদানি করা হইত, এখন তাহার অনেকটা এই দেশেই উৎপাদিত হইতেছে। ইহাতে আমাদের বৈদেশিক অর্থের সাশ্রয় হইতেছে। আম একসময় মাত্র কয়েকটি জেলায় উৎপাদিত হইত, এখন ইহা সাতক্ষীরা ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় উৎপাদিত হইতে দেখা যায়। এমনকি ফল-ফলাদি আমরা বিদেশেও রপ্তানি করিতেছি। কারণ প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে আজ কৃষি অফিস স্থাপন করা হইয়াছে। কৃষি কর্মকর্তারা যতই ঢিলাঢালাভাবে কাজ করুন না কেন, তাহারা যতটুকু সাহায্য-সহযোগিতা করিতেছেন এবং পরামর্শ দিতেছেন, তাহা কোনো অংশে নগণ্য নহে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষিবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনী শক্তি সহায়ক ভূমিকা পালন করিতেছে। একসময় বিদেশি অর্কিডের চাষ বাংলাদেশের কেবল একটি পরিবারেই দেখা যাইত। এখন সেইখানে বাগানে বাগানে অর্কিড চাষ করা হইতেছে। বিদেশি ফুল বা ফল যাহাই বলি না কেন, বিদেশ হইতে আনিবার পর তাহার মাটি ও অন্যান্য গুণাগুণ পরীক্ষা করিয়া চাষাবাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিলে তাহা যে কোনো দেশেই ফলদায়ক হইতে পারে।

অতএব, আমরা কিছুই করিতেছি না, আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত—এই সকল কথার কোনো মূল্য নাই। যদি জাতি হিসাবে আমরা কিছুই না করিয়া থাকি, তাহা হইলে টিকিয়া আছি কী করিয়া? ১৯৭১ সালে আমাদের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি। এখন আমরা ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ। কৃষি মন্ত্রণালয়, তাহার অধীনস্থ ধান গবেষণা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আমরা কৃষিতে অগ্রগতি লাভে সক্ষম হইয়াছি। একটি দেশ একটি খামার কর্মসূচির কথাও আমাদের অজানা নহে। স্বয়ং সরকারপ্রধান সেই সকল কর্মসূচিতে সিম্বলিক বা প্রতীকী অর্থে অংশগ্রহণ করিয়া কৃষকদের উত্সাহিত করিয়াছেন। সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষা করিয়া চাষাবাদের প্রবণতাও বাড়িয়াছে আমাদের দেশে। ফলে সার্বিকভাবে কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে আরো বহুদূর অগ্রসর হইবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন