রাজধানী ঢাকা শহরে চলা বেশির ভাগ বাস-মিনিবাস বাইরে থেকে দেখতে রংচটা ও লক্কড়ঝক্কড়। পেছনের লাইট-ইন্ডিকেটর নেই। জানালায় কাচ নেই। পেছনের একটা অংশ খুলে পড়েছে। ভেতরে সিট ভাঙা। এতটাই নোংড়া যে, ওই সিটে বসতে গেলে যে কারো গা গুলিয়ে আসবে। দাঁড়িয়ে যেতে হয় গাদাগাদি করে। গরমে ঘামে ভিজতে হয়। বর্ষায় বৃষ্টি ও শীতে ঠান্ডার বিড়ম্বনা। এসব বাস ঢাকার রাস্তায় চলছে কীভাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, বর্তমানে ঢাকা ও এর আশপাশে সাড়ে ৮ হাজার বাস-মিনিবাস চলার অনুমতি আছে। তবে পরিবহন সূত্রগুলো বলছে, এই সংখ্যা ওঠানামা করে। অনেক কোম্পানি অনুমোদনের চেয়ে বেশি বাস চালায়। ফলে বিআরটিএর হিসাবের বাইরেও এই গাড়ির সংখ্যা বেশি।
বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘এসব বাস ঢাকার রাস্তায় কীভাবে চলছে, এটা আমারও প্রশ্ন। এখানে নিয়ন্ত্রণকারী আর বাসমালিকদের একটি শক্ত গ্রুপ তৈরি হয়েছে। ফলে বাসের চেহারা না দেখেই চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। সারা বিশ্বে পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী কতৃর্পক্ষে দায়িত্ব দেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। আর আমাদের এখানে এসব পদে যাওয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে হয়। অর্থাত্, ঐ টাকা এখান থেকে তোলার সুযোগ আছে। যেখানে টাকা দিয়ে কাগজ পাওয়া যায়, সেখানে এর চেয়ে ভালো বাস সার্ভিসের আশা তো আমরা করতে পারি না।’
বাংলাদেশের রাস্তায় ২০ বছরের অধিক পুরোনো বাস ও মিনিবাসজাতীয় যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। একইভাবে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ সমজাতীয় পণ্যবাহী যানবাহনের সর্বোচ্চ বয়স হবে ২৫ বছর। দুর্ঘটনা কমাতে এবং পরিবেশদূষণ রোধে যানবাহনের এই আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করে দেয় সরকার, যা ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে সরকারনির্ধারিত এই আয়ুষ্কাল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সাধারণত বড় বাসের ক্ষেত্রে গড় আয়ু ধরা হয় সর্বোচ্চ ১২ বছর। ছোট বাসের ক্ষেত্রে তা ৭ থেকে ১০ বছর। নির্মাতা কোম্পানিগুলোও বাসের গড় আয়ু সর্বোচ্চ ১২ বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুইডিশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভলভোর একটি বড় বাসের গড় আয়ু ১২ বছর, যা সর্বোচ্চ ৫ লাখ মাইল পর্যন্ত চলতে পারে।নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করা ইলিয়াস কাঞ্চন ইত্তেফাককে বলেন, ‘কার কাছে জানতে চাইব, এই বাস কীভাবে খোদ রাজধানীর বুকে চলছে? কে অনুমোদন দিচ্ছে? যারা দেখভাল করার দায়িত্বে, কেন তারা সেটা করছে না? এখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছেছি। আস্তে আস্তে উন্নত দেশের দিকে যাব। কিন্তু আমরা পরিবহন ব্যবস্থাটাকে ঠিক করতে পারলাম না। এ নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতে ক্লান্ত।’
সোমবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চলাচলরত বাস-মিনিবাসগুলোর বেশির ভাগেরই পেছনের লাইট-ইন্ডিকেটর নেই। এসব বাস কখন থামে, কোন দিকে মোড় নেয়, তা পেছনের চালকের বোঝার উপায় নেই। ডানে-বাঁয়ে বা পেছনে দেখার আয়না নেই। পেছনের ভাঙা অংশে লেগে পাশের গাড়ির রং উঠে যাচ্ছে। পথচারীরা আহত হচ্ছে। ঢাকায় চলা অধিকাংশ বাস চলে সিএনজিতে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, অনেক বাসের পেছনের ভাঙা অংশ দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে, বাসে আসন থাকবে ৫২টি, মিনিবাসে ৩০টি। দুটি আসনের হেলান দেওয়া স্থানের দূরত্ব হবে ২৬ ইঞ্চি। কিন্তু ঢাকার পরিবহন মালিকেরা ইচ্ছেমতো আসন বসিয়েছেন। ফলে যাত্রীরা পা সোজা করে বসতে পারেন না।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘যানজটের কারণে ঢাকার পরিবহন ব্যবসা লাভজনক নয়। এই খাতে শৃঙ্খলার ঘাটতি আছে। সব মিলিয়ে মালিকেরা বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চান না।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমরা বিআরটিএর সঙ্গে বৈঠকে ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলাম যে, একটি দেশের রাজধানীতে এমন ভাঙাচোরা বাস চলে কীভাবে? জবাবে বিআরটিএ কতৃর্পক্ষ আমাদের জানিয়েছিল, তারা বছরে এক বার পরীক্ষা করে, তখন চেহারা হয়তো ঠিক থাকে। তিন মাস পরেই বডির অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। তাদের এই বক্তব্য আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আমরা সব সময় বলে আসছি, একটা দেশের রাজধানীতে এসব চলতে পারে না। আমরা ধারণা করি, রাজধানীতে চলাচল করা বাসের মধ্যে ৮০ শতাংশের বয়স ২০ বছরের বেশি।’
রাজধানীতে এই লক্কড়ঝক্কড় বাস কীভাবে চলছে? আসলে দেখার দায়িত্ব কার? জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আইনে আমাদের শুধু কাগজপত্র দেখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বাসের চেহারা কেমন, সিট ভালো আছে কি না—এর কোনো কিছুই আমরা দেখতে পারি না। যদি কোনো বাসের কাগজপত্র ঠিক থাকে, তাহলে সেই বাস আমরা আটকাতে পারি না। যারা এই বাসগুলোকে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেন, তারাই এগুলো দেখার কতৃর্পক্ষ।’
বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘লক্কড়ঝক্কড় বাস চলাচল বন্ধে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। গত রবিবার থেকে আমরা পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছি। সেখানে কোনো গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বডি খারাপ হলে সেটাকে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হচ্ছে। আমরা ধারণা করছি, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব গাড়ির ফিটনেস আমরা দেইনি, সেই গাড়িও রাস্তায় নেমেছে। এসব গাড়ির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযানটা এবার জোরালোভাবেই হবে।’
লক্কড়ঝক্কড় বাস চলার অনুমতি পাচ্ছে কীভাবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা যে গাড়ির ফিটনেস দেই, সেই গাড়ির একটা ছবি তুলে রাখি। একই সঙ্গে যে ইন্সপেক্টর এই গাড়ির সার্টিফিকেট দিলেন, তার ছবি গাড়িতে থাকার কথা। আমরা যদি ধরতে পারি কোনো কর্মকর্তা গাড়ি না দেখেই অনুমোদন দিয়েছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করি। ফলে বিশ্রী চেহারার কোনো বাস দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আসতে হবে।’
প্রসঙ্গত, ১৯৮৩ সালের মোটরযান আইন অনুযায়ী চাকা, ইঞ্জিনক্ষমতা ও ধরন বিবেচনায় নিয়ে ৪০ ধরনের যানের নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। সংস্থাটির হিসাব বলছে, সারা দেশে নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা ৭৪ হাজার। এর ৫৩ হাজারের বয়স ১৪ বছর বা তার চেয়ে বেশি। দেশে ২০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের বাসের সংখ্যা কত, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি বিআরটিএর কর্মকর্তারা। তবে তারা ধারণা দিয়েছেন, সংখ্যাটি ২৫-৩০ হাজার হতে পারে, যেগুলোর বেশির ভাগই এখনো চলাচল করছে।

সড়কে ভূমিষ্ট হওয়া শিশুর খরচ বহনের নির্দেশনা চেয়ে রিট
দক্ষিণখান-চেয়ারম্যান বাড়ির সড়কের কাজ শুরু