মাত্র কয়েক দিন আগে মতিয়ার রহমান নামে এক কোটিপতি ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষুক’ আলোচিত হয়ে ওঠেন। গাংনী উপজেলার সিন্দুরকোটা গ্রামের ভাটপাড়ার বাসিন্দা মতিয়ার ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ভিক্ষা করে কোটিপতি হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। সম্প্রতি তিনি হজের নামে সৌদি আরবে গিয়ে ভিক্ষা করার সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।
মতিউর রহমান একসময় ‘মন্টু ডাকাত’ নামে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। বোমা বানাতে গিয়ে দুই হাত হারান তিনি। পরে পেশা বদলে বনে যান ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষুক’। এই ভিক্ষাবৃত্তি করেই মেহেরপুরে গাংনীতে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ।
মতিয়ার রহমানের পর এবার এক কোটিপতি ‘পাগল’ বা ভবঘুরে ভিক্ষুকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি কখনো স্থানীয় বাজারের প্রবেশপথে বসতেন। আবার কখনো ঘুরতেন মাজারে মাজারে। পথচারী বা মাজারে আসা ভক্তরা টাকা দিতেন; আবার কখনো নিজেও চেয়ে নিতেন। কুমিল্লার আমির হোসেন মুন্সি ওরফে ‘বিষু পাগলা’ সম্প্রতি মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তার বাড়িতে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ৩ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়।
উল্লিখিত ঘটনা দুটি প্রমাণ দেয় যে, বাংলাদেশ অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এখন পরিণত হয়েছে টাকা বানানোর সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ ভূখণ্ডে। মানুষ দেদার টাকা বানাচ্ছে। অনেকে শুধু টাকা বানাচ্ছেই না, দেদার উড়াচ্ছেও । এ দেশের যে পরিমাণ মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন দামি রেস্টুরেন্টে খায়, চিকিৎসা, ভ্রমণ, বিনোদন, কেনাকাটার জন্য বিদেশ যায়, সেটা কেবল উন্নত কোনো দেশের সঙ্গেই তুলনীয়।
বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশেই কিন্তু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হওয়া সহজ কাজ নয়। অন্য সব দেশে এজন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। একটু একটু করে, অনেক সাধ্যসাধনার পর টাকার মালিক হওয়া যায়। ধনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও পুঁজি গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। আমেরিকার বিল গেটস, ফোর্ড, কার্নেগি, রকফেলার, জার্মানির ক্রুপস, জাপানের মিত্সুবিশি, মিত্সুই থেকে শুরু করে ভারতের টাটা-বিড়লা পর্যন্ত কেউই ভিক্ষা করে, চেয়ে-চিন্েত, পারমিটবাজি বা নিছক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দু-দশ বছরের মধ্যে নিঃসম্বল অবস্থা থেকে কোটিপতিতে পরিণত হননি।
কিন্তু বাংলাদেশে কোটিপতি হওয়ার জন্য তেমন কোনো সাধনা বা পরিশ্রম করতে হয় না; এখানে ‘অলৌকিক’ উপায়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায়। রাষ্ট্র এবং সরকার স্বয়ং এ ব্যাপারে যথাযথ সহায়তা প্রদান করে। কিছুসংখ্যক মতলববাজ, কপর্দকহীন, অর্বাচীনকে রাতারাতি কোটিপতিতে রূপান্তরিত করতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির কোনো জুড়ি নেই।
পাকিস্তান আমলে মাত্র ২২টি পরিবারের কোটিপতি হিসেবে খ্যাতি ছিল। ঐ ২২ পরিবারের কোটিপতি হওয়ার পেছনেও অবশ্য রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও ভোজবাজি কাজ করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোটিপতি হওয়ার এই ধারা আরো অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে। এখন আমাদের দেশে কোটিপতির মোট সংখ্যা কেউ জানে না; তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা বাংলাদেশে এখন কোটিপতির সংখ্যা কোটিতে পৌঁছেছে। এটা অবশ্য আমাদের জাতীয় অগ্রগতিরই পরিচায়ক।
ধনী হওয়ার বা কোটিপতি হওয়ার ইচ্ছে সব মানুষেরই থাকে। কিন্তু সবাই ধনী হতে পারে না। কেউ চেষ্টা করে সফল হয়, কেউ-বা বৃথা চেষ্টা করে যায়। সঠিক উপায় জানা না থাকায় ধনী হওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে না তারা। ধনী হওয়ার জন্য কায়দাকানুন জানতে হয়, কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়। সঠিক পদ্ধতি বা কায়দাকানুনের প্রয়োগ করতে পারলে আপনি সহজে ধনী হতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে ফেসবুকের কথাই বলা যায়। ফেসবুকের পেছনে লেগে থেকে আমরা বেশির ভাগ মানুষই আমাদের মূল্যবান সময় অপচয় করি। এর থেকে কোনো আয়-উপার্জন তো হয়ই না, উলটো সময়, মেধা, শ্রম যায়। অথচ ফেসবুকের পেছনে লেগে থেকে মার্ক জাকারবার্গ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। ফেসবুকের পেছনে মার্ক জাকারবার্গের ‘লেগে থাকা’ আর আমাদের ‘লেগে থাকা’র মধ্যে যোজন যোজন পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যই আমাদের ফেসবুকে ব্যস্ত রেখে জাকারবার্গকে ধনী বানিয়েছে।
নানা ফিকিরে ধনী হওয়া ব্যক্তিদের অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। এই তালিকায় স্বাস্থ্য বিভাগের ড্রাইভার, আওয়ামী লীগ অফিসের কম্পিউটার অপারেটর, পুলিশের কনস্টেবল, সোনালী ব্যাংকের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, শিক্ষা ভবনের কেরানি, বিমানবন্দরের সুইপার, কাস্টম অফিসের পিয়ন, নির্বাচন কমিশন অফিসের ভেন্ডরও আছেন। পির, ফকির, পাগলও রয়েছেন। যদিও তারা সংখ্যায় অল্প।
আমাদের সমাজে অনিয়ম-দুর্নীতি আর ঘুষের মাধ্যমে একশ্রেণির মানুষ খুব দ্রুতই ফুলেফেঁপে উঠছে। এর মধ্যে শীর্ষে আছে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা। আমাদের দেশে ঘুষ খাওয়া তো এখন পানি পান করার মতো সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। অবশ্য ঘুষ নিয়ে তেমন কিছু বলারও নেই। এটা একেবারেই আমাদের মজ্জায় মিশে গেছে এবং অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যে জিনিসটার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দরকার, সেই গণতন্ত্র এখনো কেবল বুলিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ঘুষ-দুর্নীতির পুরোপুরি ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ ঘটে গেছে। এর অবশ্য কারণও আছে। এখানকার মানুষের খাই-খাই স্বভাবটা একটু বেশি। সুযোগও অবারিত। এ দেশে কমবেশি সবাই ঘুষ ও গ্যাস খায়—নেতা টু অভিনেতা, সাদা টু কালো, লম্বু টু বাঁটুল, গদি টু ফুটপাত, হিজ এক্সেলেন্সি টু হার ম্যাজেস্ট্রি।
আমাদের দেশে ভিক্ষাবৃত্তি করে বড়লোক হওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ভিক্ষুক মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা। ভিক্ষুক হওয়া, ভিক্ষুক সাজা, ভিক্ষুকের মতো আচরণ করার অনেক কারণ আছে। এর মধ্য দিয়ে স্বার্থসিদ্ধি হয়। বড়লোকও হওয়া যায়। আর জগদ্বিখ্যাত বড়লোক বিল গেটস বলেছেন, যখন তোমার পকেট ভর্তি টাকা থাকবে তখন শুধু তুমি ভুলে যাবে যে ‘তুমি কে’; কিন্তু যখন তোমার পকেট ফাঁকা থাকবে তখন সমগ্র দুনিয়া ভুলে যাবে ‘তুমি কে’! জগতে টাকার চেয়ে বড় বাহাদুর কেউ নেই, টাকার চেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু নেই। টাকা হলে মহাশূন্য পরিভ্রমণ করা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে নামি তারকার সঙ্গে চা খাওয়া যায়। অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। তাই তো সবাই জীবনভর কেবল টাকার পেছনে ছোটেন। টাকার পিছে ছুটতে গিয়ে অনেকেই হন বোকা, টাকার নেশায় চলতে গিয়ে কেউ-বা খান ধোঁকা। তবু সবাই চান টাকা, টাকা শুধুই টাকা। চালাক মানুষেরা টাকার পেছনে শিকারি কুকুরের মতো ছুটেই চলেন, ছুটেই চলেন। অনেকে ছুটতে ছুটতে সেই টাকার ভান্ডারের সন্ধান পেয়েও যান। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলে এই সুযোগগুলো খুব সহজেই হাতে আসে।
আসলে মানুষ কেবল অভাবের কারণেই ভিক্ষা করেন না। বড়লোক হওয়ার জন্যও অনেকে ভিক্ষা করেন। অনেকে আবার নিছক কাজের প্রতি আলসেমি থেকেও এ পথে নামেন। বাংলাদেশে যে পরিমাণ মানুষ তাদের অসহায়ত্বের জন্য ভিক্ষা করেন তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষ ভিক্ষা করেন নিজেকে কষ্টকর জীবিকা নির্বাহের ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য। ভিক্ষা অনেকের কাছে ব্যবসায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিক্ষা করতে যেমন পুঁজি লাগে না, তেমনি অনিশ্চয়তাও নেই। ভিক্ষা একটি লাভজনক পেশা, যে পেশায় ন্যূনতম বিনিয়োগ নেই, পরিশ্রম নেই। শুধু নাটক বা ড্রামাটা ঠিকঠাক করতে পারলেই মিশন সাকসেসফুল (করোনাকালে সরকারি প্রণোদনা পেতে আমাদের দেশের ‘বড় বড় ভিক্ষুকরা কী কাণ্ডটাই না করেছেন)! আয়করবিহীন উপার্জনের এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চান কে? বাংলাদেশেই অনেক ভিক্ষুক আছেন, যারা স্বাবলম্বী হয়েও ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়েননি। নিয়মিত ভিক্ষার টাকায় বাড়ি বানাচ্ছেন, জমি কিনছেন। সন্তানদের জন্য বানিয়ে যাচ্ছেন অর্থসম্পত্তি!
পুনশ্চ : ভিক্ষা করা কিন্তু সহজ কাজ নয়। এর জন্য অনেক ঘ্যানঘ্যান করতে হয়। অনেক মানুষ আছে, যারা কিছুতেই ভিক্ষা দিতে চায় না। ভিক্ষা না দেওয়ার জন্য নানা টালবাহানা করে। এ কারণে অনেক সময় তাদের অপমানও সইতে হয়। কারণ একালের ভিক্ষুকরা ভিক্ষা না পেলে কটু কথা বলতে ছাড়ে না। এ ব্যাপারে একটি বহুল প্রচলিত কৌতুক আছে।
ভিক্ষুক : স্যার, দয়া কইরা আমারে দশটা টাকা দেন।
পথচারী : নেই।
ভিক্ষুক : তাইলে পাঁচ টাকার একটা কয়েন দেন।
পথচারী : নেই।
ভিক্ষুক : দুই টাকার একটা নোট অন্তত দেন।
পথচারী : বললাম তো নেই।
ভিক্ষুক : তাইলে স্যার, আমার সাথে বইসা পড়েন। কাইল থিকা আর ভিক্ষা দেওনের মতো টাকার অভাব হইব না!
লেখক : রম্যরচয়িতা

