গত আড়াই বৎসর ধরিয়া সমগ্র বিশ্ব দুইটি যুদ্ধ মোকাবিলা করিতেছে। একটি করোনা মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অন্যটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। সত্যিকার অর্থে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ একবিংশ শতাব্দীর নূতন বিশ্বযুদ্ধ। একটি বিশ্বযুদ্ধে যেই ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহার প্রভাব যেমন বিশ্বব্যাপী পড়ে, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতেও সমগ্র বিশ্ব টালমাটাল।
একদিকে খাদ্যপণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট—এই উভয় সংকট সমগ্র বিশ্বের জন্য শাঁখের করাত হইয়া গিয়াছে। খাদ্যপণ্য এবং এনার্জির জন্য জ্বালানি—এই দুইটি বিশ্ব অর্থনীতির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রসদ। সুতরাং অনেকের মতে, বিপদের শুরু মাত্র। বিশেষ করিয়া রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহা হইলে বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি কোন অন্ধকারে ডুবিবে—তাহা কেহই বলিতে পারে না। আমরা এমন এক সুড়ঙ্গে ঢুকিয়া পড়িয়াছি, যাহার শেষ মাথায় আলো থাকিলেও টানেলটি কতখানি লম্বা হইতে পারে—তাহার কূলকিনারা করা যাইতেছে না। সুতরাং লম্বা রেসে নামিতে লম্বা নিঃশ্বাস লইয়া প্রস্তুত থাকিবার সময় আসিয়াছে। কেন? তাহা আরো খানিকটা বিশদে বুঝিয়া দেখা যাউক।
আমরা দেখিতে পাইতেছি, বিশ্বের সবচাইতে বড় তিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের শীর্ষ নির্বাহীরা আসন্ন বিশ্ব মন্দা লইয়া আশঙ্কিত। তাহারা সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন, নিম্ন মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার কমাইয়া রাখিবার বিষয়টি ইতিহাস হইতে চলিতেছে। তাহারা বলিতেছেন, পণ্যের দাম যাহাতে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া না যায় সেই লক্ষ্যে দ্রুত পদক্ষেপ লইতে হইবে। স্মর্তব্য যে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও সুদের হার ১ শতাংশ হইতে বৃদ্ধি করিয়া সোয়া শতাংশ করিয়াছে। অর্থনীতিবিদরাও মনে করিতেছেন, বিভিন্ন দেশ যেইভাবে সুদের হার বৃদ্ধি করিতেছে, তাহা আরো কয়েক বৎসর অব্যাহত থাকিবে।
স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন অব্যাহত রহিয়াছে। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হইয়া তাহাদের বিনিয়োগ তুলিয়া লইতেছে। ইতিমধ্যে কোভিডের পর্যায়ক্রমিক লকডাউনের কারণে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহব্যবস্থা ভাঙিয়া পড়ায় উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হইয়া গিয়াছিল। দীর্ঘসময় ধরিয়া সরবরাহ বিঘ্নিত ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হওয়ায় সমগ্র বিশ্বেই মন্দার ঝুঁকি বাড়িয়াছিল। ইহার সহিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রলম্বিত হইলে মন্দাও প্রলম্বিত হইবে। জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা আংটাড জানাইয়াছে, পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের দেশসমূহ এবং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহে এই মন্দার অভিঘাত সকলের চাইতে অধিক হইবে। উপরন্তু খাদ্য এবং জ্বালানির মূল্য ক্রমাগত বাড়িতে থাকায় উন্নয়নশীল দেশসমূহে নানা সামাজিক অস্থিরতা দিনদিন বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে। খাবার এবং জ্বালানির উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় এই সকল উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হইবে।
আমরা ইতিমধ্যে দেখিয়াছি যে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ ছাড়াইয়া গিয়াছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী গত জুন শেষে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য বলিতেছেন, বিবিএস মূল্যস্ফীতির যেই হিসাব দিতেছে, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি তাহার চাইতে অধিক। আমাদের একসময় রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উঠিয়াছিল। তাহা এখন ক্রমশ কমিতেছে। একদিকে বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়া, দাবানল এবং ইহার সহিত আমাদের দেশে বিপর্যয়কর বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হইয়াছে। আমনের বীজতলা, সবজি নষ্ট হইয়াছে। এই বন্যাও মূল্যস্ফীতি বাড়াইয়া দিতে অনেকটা ভূমিকা রাখিতে পারে। তাহা হইলে এখন কি সঞ্চয়ের সময়? অর্থনীতিতে একটি কথা আছে, টাকায় টাকা আনে, কাজে কাজ আনে।
তবে মার্কিন বিশ্লেষকেরা বলিয়া থাকেন, মানুষ যত অধিক অর্থ ব্যয় করিতে অনীহা প্রকাশ করিবে, অর্থনীতিকে বেগবান করিতে তত অধিক সময় লাগিতে পারে। জটিলতা হইল—যেইখানে মানুষ মন্দার কারণে সঞ্চয় করিতেছে, সেইখানে সেই সঞ্চয়ই মন্দাকে দীর্ঘায়িত করিতে পারে। অর্থশাস্ত্রে ইহাকে বলে ‘প্যারাডক্স অব থ্রিফট’। অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস ১৯৩০ সালে প্রমাণ করিয়া দেখাইয়াছেন, মিতব্যয়ী হওয়ার এক কঠিন জটিলতা।
আধুনিক অর্থব্যবস্থায় সমগ্র বিশ্ব একটি বিশেষ চেইনে আবদ্ধ। সুতরাং এই সংকট সমগ্র বিশ্বের বটে। তবে আমাদের মতো ক্ষুদ্র আয়তনের অথচ বৃহৎ জনঘনত্বের দেশের বিপদটাও অনেক অধিক। সামনে বিপদের লম্বা টানেল। কোথায় আলো, আমরা জানি না।
