ব্যস্ততম নগরের যান্ত্রিক জীবনে অনেক কিছুর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে খাদ্যসংস্কৃতিও। কমে আসছে হেঁশেল ঠেলে খাবারদাবার রান্নাবান্নার ঝক্কি-ঝঞ্ঝাট। বাসায় হঠাৎ অতিথির আগমন অথবা উৎসব-পার্বণ, বিয়ে, জন্মদিন, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের আপ্যায়নে রান্নার ঝামেলা আর কষ্ট এড়াতে ক্যাটারিং সার্ভিস বা অনলাইনের হোমমেড খাবার আধুনিক নাগরিক জীবনের বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। অফিস কিংবা ঘরে বসেই একটি ফোনকল বা নেটে একটি ক্লিকেই মিলছে একেবারে ঘরোয়া রান্না অথবা পছন্দের নামিদামি হোটেল-রেস্তোরাঁ বা মনপছন্দ বাবুর্চির রান্না করা মুখরোচক রসনাবিলাসী সব খাবার। ক্যাটারার বা অনলাইন খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি-বিদেশি পছন্দের খাবার সময়মতো পৌঁছে দিচ্ছে।
মূলত খাদ্য প্রস্তুত ও সরবরাহ ব্যবসার সূচনা বেশ আগে থেকে শুরু হলেও বিপুল প্রসার ঘটেছে করোনাকালে। রাজধানী ঢাকা শহরে বহুসংখ্যক নারী ক্যাটারিং সার্ভিসের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন। আছে বড় বড় প্রতিষ্ঠানও। বর্তমানে রাজধানীর বহু বাড়ির গৃহিণীরা এটাকে আয়ের একটি উৎস হিসাবে নিয়েছেন। কেউ কেউ শখের বসে করছেন। কেউ-বা এটাকে ব্যবসা হিসাবে নিয়ে আয় করে সংসার চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে ক্যাটারিং সার্ভিস ভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান হয়েছে। প্রতিদিন ডিমান্ড বাড়ছে। এই খাতে বড় বড় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে। ক্যাটারিং সার্ভিসকে পেশা হিসেবে নিতে তরুণ প্রজন্ম বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। বর্তমানে ক্যাটারিংয়ের সঙ্গে জড়িত লোকের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের বেশি। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন হয়েছে এবং ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। তাই একটু বেশি খরচ করে হলেও মানুষ ‘হাইজেনিক’ ফুড খেতে চায়। ফলে ক্যাটারিং সার্ভিসের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে।
ক্যাটারিং সার্ভিসের সঙ্গে গত চার বছর ধরে জড়িত মহাখালীর মিসেস সিমিন আফসানা রিতু। তিনি বললেন, দিনে দিনে অর্ডার বাড়ছে। যারা বিদেশ থেকে আসেন সেই প্রবাসীরা তো বলতে গেলে ঘরের রান্না খান না। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্যাটারিংয়ের খাবার খান। কারণ রান্না-বান্না করা, থালা-বাসন ধোয়াকে অনাহুত উপদ্রব মনে করেন। বাংলাদেশেও কিছুকিছু ক্ষেত্রে এ হ্যাবিটটা গ্রো করতে শুরু করেছে। মানুষ চাইলে একটি ফোন করে দিলেই চাহিদামতো যে কোনো খাবার বাসায় চলে আসছে। আবার অনলাইনেও খাবারের অর্ডার চলে আসছে সেটা সকালে হোক বা মধ্যরাতে। তাই মানুষ ধীরে ধীরে এই কালচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। যারা চাকরি-বাকরি করেন বা ব্যস্ত থাকেন তারা ঘরে রান্না-বান্নার ঝঞ্ঝাটমুক্ত থাকতে চাচ্ছেন। ফলে ক্যাটারিংয়ের চাহিদা আরো বেড়ে যাচ্ছে।
গুলশান এলাকায় খাবার সরবরাহকারী একটি ক্যাটারিং সার্ভিসের মালিক আবদুর রউফ সামদানি। তার প্রতিষ্ঠানটি ছয় বছরের পুরোনো এবং বেশ প্রসার লাভ করেছে। তিনি বললেন, প্রথম দিকে আমরা কেবল অফিসে অফিসে দুপুরের লাঞ্চ অর্ডার পেতাম। এখন বাসা-বাড়ি থেকে বেশি অর্ডার আসছে। অনেক বাড়িতে রান্না হয় না বললেই চলে। কাজের চাপে অনেকেই হয়তো সারা দিন একটা স্যান্ডউইচ বা বার্গার খেয়ে দিন কাটান। ব্যস্ত জীবনে বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করা বা খাবার তৈরির সুযোগ অনেক সময়ই হয় না। সব চিন্তার সমাধান এখন খাবার সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলো। আমাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজ আছে, ওয়েবসাইট আছে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাপস আছে। অনলাইনে অথবা সরাসরি ফোনে নক করলেই আমরা চাহিদামতো খাবার সরবরাহ করি। কেবল খাবারই নয়, চাইলে পছন্দমতো বাজার-সদাইও বাড়িতে চলে আসছে। তিনি বলেন, পেমেন্ট করাও অনেক সহজ। বেশিরভাগ ই-কমার্স সাইটে ব্যাংকের কার্ড, বিকাশ, রকেট, নগদ বা যে কোনো অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা যায়। সুযোগ রয়েছে পণ্য বা খাবার বাড়িতে পৌঁছার পর বিল পরিশোধ করার।
নিকেতনে ক্যাটারিং সার্ভিস চালাচ্ছেন নুসরাত ইয়াসমীন দীবা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা করছেন তিনি। দীবা বলেন, আমাদের খাবার মূলত অফিসের লোকজন খেয়ে থাকেন। আর অনেক বড় আয়োজন, যেমন—২ বা ৫ হাজার লোকের খাবারের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ করা হয়। বড় আয়োজনের জন্য অর্ডারটা কয়েক দিন আগে নিয়ে থাকি আমরা। তিনি বলেন, চাহিদামতো আমরা বেকারি, চাইনিজ, মোগলাই, ইউরোপিয়ান, ইতালিয়ানসহ দেশি-অনেক ধরনের খাবার তৈরি করি। যে খাবারটি কাস্টমাররা পছন্দ করে, সেই খাবারটি আমরা রান্না করে দেই।
ইনস্টিটিউট অব ট্যুরিজম অ্যান্ড হোটেল ম্যানেজমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইকবাল আহসান বলেন, এ ব্যবসা শুরু করতে ঝুঁকির বালাই নেই। ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হলে ব্যবসাটি শুরু করা সম্ভব। ব্যবসা শুরুর জন্য বেশি জিনিসপত্র কেনারও প্রয়োজন হয় না। ব্যবহার করতে পারেন বাসার রান্নার সামগ্রী, হাঁড়ি-কড়াই দিয়ে। তাই ক্রমাগতভাবে ক্যাটারিং ব্যবসার প্রসার ঘটছে। তবে ফাস্টফুড আইটেম তৈরি করতে চাইলে একটি ওভেন, ব্লেন্ডার, ডাইস ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে সার্বিক অর্থনীতির গতি যেভাবে বাড়ছে তাতে আগামীতে এ খাতের চাহিদা আরো বাড়বে। কর্মসংস্থানও বাড়বে। এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো একটি ভালো ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অল্প পরিসরে নিজের রান্নাঘর থেকেই এ ব্যবসা শুরু করা যেতে পারে।
ধানমন্ডিতে ক্যাটারিং সার্ভিস রয়েছে মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী কান্তা মিজানের। তারা বলেন, এখন বিয়ে বাড়ির বড় আকর্ষণ জম্পেশ খাওয়াদাওয়া। এই খাবার-দাবারের পুরো দায়িত্ব এখন ক্যাটারিং সার্ভিসকেই দিয়ে দেওয়া হয়। এই দম্পতি জানান, চাহিদা বেশি অফিসে। আমরা বিভিন্ন অফিসে চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিদিনের খাবার সরবরাহ করি। আবার বিয়েসহ বিভিন্ন বড় আয়োজনেও ক্যাটারিং সার্ভিস সেন্টারগুলো খাবার সরবরাহ করে। এ ব্যবসার মাধ্যমে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেশি। কারণ বাড়িতে বসে এই ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব। তবে শহরাঞ্চলে বিশেষ করে উপজেলা, জেলা বা বিভাগীয় শহরে এই ব্যবসার সম্ভাবনা বেশি। তারা বলেন, অনেকে বাসায় মেহমান আসার পর অর্ডার দেন। ফলে সেখানে দ্রুত ডেলিভারিকে আমরা প্রাধান্য দেই। অনলাইনভিত্তিক বলে এতে সাড়াও মিলছে প্রচুর। এই ফুড সার্ভিসের সবচেয়ে ভালো দিকটি হলো, খাবারটি তৈরি হচ্ছে ঘরোয়া পরিবেশে। সময়মতো মানসম্মত খাবার ডেলিভারি দিয়ে ক্রেতাদের সন্তুষ্টি অর্জন। আমাদের মতো সাধারণত এসব ফুড সার্ভিস যারা দেন তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পেজ খুলে নেন। সেখানে খাবারের ছবি, পরিমাণ আর দামসহ পোস্ট দেওয়া হয়। কীভাবে খাবার অর্ডার দেবেন তা-ও লেখা থাকে, দেওয়া থাকে ফোন নম্বরও। পেজে দেওয়া নম্বরে ফোন দিয়ে চাহিদামতো খাবারের অর্ডার দিতে পারেন যে কেউ। মূলত কর্মজীবী মানুষই ক্যাটারিং সার্ভিসের প্রধান ক্রেতা। আবার অনেকেই নিজেদের বাসার জন্য বা আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠাতে এসব খাবার অর্ডার করেন। মিজান বলেন, বিকালের নাস্তায় বাসাবাড়ি বা অফিসে কেক, পিঠা, নুডলস, সমুচা, পুরি, পেঁয়াজু, সিঙাড়া, মোগলাই পরোটাসহ বিভিন্ন হালকা খাবারের মেন্যুও পরিবেশন করা হয়।
রাজধানীর হোম মেড ফুড ব্যবসায় সফল গৃহিণী শাকিলা খান জানান, বাইরের খাবার খেলে হয়তো বিভিন্ন ধরনের স্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু ঘরের খাবারের মতো মান আশা করা যায় না। যারা বাইরের খাবারে ঘরের খাবারের মান খোঁজেন তাদের জন্যই হোম মেড ফুড ডেলিভারির ব্যবস্থা।
ফেসবুকভিত্তিক একটি ক্যাটারিং সার্ভিসের দোকান রসুইঘরের পেজে লেখা আছে, কুমড়োবড়ি, দেশি মাছ, নদীর কইমাছ, শুঁটকি, গরুর মাংস, সবজি নানা রকম দেশীয় আর ভিন্নরকম পদ ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় বিন্নি ধানের খই, পিঠা পুলি, মুড়ি-মুড়কি, ঢেকিভাঙা চালের ভাত ইত্যাদি। রসুইঘর এর প্রতিষ্ঠাতা লাখীয়া হাবিবা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নানারকম অনুষ্ঠান আয়োজনের খাবারের অর্ডার বেশি আসে। এছাড়াও যারা দেশের বাইরে থাকেন তারা দেশে থাকা পরিবারের জন্য অনলাইনে পেমেন্ট করে খাবার অর্ডার করেন। অন্তত আট জনের জন্য খাবারের অর্ডার নেওয়া হয়। খাবার সরবরাহ করতে নানারকম স্থানীয় ডেলিভারি সার্ভিসের সাহায্য নেওয়া হয়। হাতে সময় থাকলে নিজেও সরবরাহ করেন মাঝেমধ্যে।
২০১৫-এর ডিসেম্বরে ‘কাঁটা চামচ’ নামে অনলাইনভিত্তিক রেস্টুরেন্ট খোলেন বিদেশে বড় হওয়া নওশাবা তাবাসসুম। তিনি বলেন, মূলত ঘরোয়া খাবার সরবরাহ করি। তার ক্রেতার বড় অংশই কর্মজীবী নারী। রান্না ও খাবার সরবরাহ করার কাজে সাহায্য করার জন্য একজন নিয়মিত সহকারী ছাড়াও কয়েক জন অনিয়মিত লোক আছে বলে জানান নওশাবা। তিনি বলেন, আমরা ঘরোয়া খাবার ছাড়াও নানারকম আচার ও কাবাব সরবরাহ করি। নানারকম ভর্তাও পাওয়া যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ক্যাটারিং সার্ভিস ব্যবসার পরিধি বর্তমানে ব্যাপক বিস্তৃত। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিসপাড়া থেকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতেও পৌঁছে গেছে হোম মেড ক্যাটারিং সার্ভিস। অনেক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেই হোম মেড ফুড প্যাকেটে করে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব খাবার পণ্যের মধ্যে রয়েছে-কেক, কুকিজ, বিস্কুট, দেশজ পিঠা, পনির, লাড্ডু, মোয়া, মুড়ালি, সিঙাড়া, সমুচা, স্যান্ডউইচ ইত্যাদি। একটা সময় আমাদের বাঙালি মুখরোচক পিঠা, হালুয়া, লাড্ডু, সন্দেশ বিদেশি ফাস্টফুড খাবারের জোয়ারে হারিয়ে যেতে বসেছিল। এখন অবশ্য অবস্থা পরিবর্তন হয়েছে। এজন্য ক্যাটারিং ফুডের সঙ্গে যারা জড়িত আছেন, তাদের অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। ক্যাটারিং হাউজগুলো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে পুলি পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, নকশা পিঠা, তেলের পিঠা, নাড়ু, হালুয়া, মোয়া ইত্যাদি সরবরাহ শুরু করলে এসব খাবারের জনপ্রিয়তা ফিরে আসতে শুরু করে।
