মে মাসের শেষের দিক থেকে পুরো জুন মাসটা ইউরোপের জীবনে খুব ব্যস্তসমস্ত গেছে| যেমন:জানুয়ারি মাসের বদলে মে মাসে বিশ্ব অর্থনীতি ফোরাম ওরফে ডাভস মিটিং হলো; এই মিটিংয়ে ৯৮ বছর বয়সি খ্যাতনামা টাউটোলজিস্ট হেনরি কিসিঞ্জার বুদ্ধি দিলেন যে, যত শিগগিরই সম্ভব দুই মাসের মধ্যে রুশদের সঙ্গে ইউক্রেন সংকটের মীমাংসা করে ফেল| একই মিটিংয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি উচ্চগ্রামে বললেন, ‘রাশিয়াকে সর্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে’ এবং ‘আমাদের আরো অস্ত্র দিতে হবে’| অর্থাৎ, রুশদের বিরুদ্ধে দ্রুত যুদ্ধবিজয় হচ্ছে না! ফলস্বরূপ, ডাভস-২০২০ সালের জুন মাস থেকে ‘গ্রেট-রিসেট’ নামক প্রজেক্টের নামে বিশ্ববাসীকে ‘কিছুরই অধিকারী হবে না, কিন্তু সুখী হবে তৃপ্ত থাকবে’ বলে আসছে—সেই গ্রেট রিসেটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ২০২১-এর আগস্ট মাসের আফগান নষ্ট ঘটনাকে অনুসরণ করবে কি—আশঙ্কায় ডাভস মিটিংয়ে ভয়মিশ্রিত অস্বস্তিকর দুশ্চিন্তা নেমে আসে|
তার পরে আসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিক্স এবং ব্রিক্সের সামিট মিটিং; ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও (দক্ষিণ) সাউথ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বকারী পৃথিবী| ব্রিক্স সামিটে ইন্দোনেশিয়া, সেনেগাল, আর্জেন্টিনা, ইরান ইত্যাদি ‘ননব্রিক্স’ অতিথি দেশ উপস্হিত ছিল; নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০-এর রোটেইটিং প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব ইন্দোনেশিয়ার| চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, জি-৭-এর সামিটে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা (দুই ব্রিক্স সদস্য)সহ ইন্দোনেশিয়া, সেনেগাল ও আর্জেন্টিনাও অতিথি দেশ হিসেবে উপস্হিত ছিল| এই দেশগুলোকে জি-৭-এর সহসা আমন্ত্রণের বড় কারণ ছিল—বিশ্বীয় অ্যান্টি-রুশ জোটে কোনোভাবে আনা যায় কি! ইইউর নিষেধাজ্ঞা তালিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার হলো : ‘যাহাই রুশ তাহাই বর্জনীয়’; ফলে, ‘বাতিল সংস্কৃতি বা ক্যান্সেল কালচার’-এর আওতায় দস্তোয়ভস্কি, পুশকিন, তলস্তয় এমনকি চাইকোভস্কি, রাখমানিনভরা বাতিল কালচারভুক্ত, ইউরি ‘পয়েখালি’ ‘গাগারিন’ও রয়েছেন|
যা হোক, চাইকোভস্কির ‘নাটক্রেকার’ ছাড়া বড়দিনের উত্সব প্রস্ত্ততি কেমন জমবে সেটি বোঝা যাবে ২০২২-এর বড়দিনের মৌসুমে| অর্কেক্ট্রার নামিদামি ডিরেক্টর, সোপ্রানো গায়িকা, খেলোয়াড় ইত্যাদি সংস্কৃতির অন্তর্গত কোনো শাখা-প্রশাখাও বাদ যাচ্ছে না| ‘বাতিল’ হওয়া নিয়ে আফসোস করবেন না| ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে জার্মান বাহিনী চেকোস্লোভাকিয়ায় ঢুকে প্রথম দফায় যা যা বাতিল করেছিল, সেই তালিকার ওপরের দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন!
মোদ্দা কথা হলো, জি-৭-এর এই চাল কাজ করেনি! বরং ইরান, আর্জেন্টিনা ব্রিক্সের সদস্যপদের আবেদন করেছে; সৌদি আরবও সিরিয়াস আলোচনা করছে; জি-৭-এর পরামর্শ না শুনে ইন্দোনেশিয়া জি-২০-এর সামিটে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভকে দাওয়াতও করেছে; দাওয়াত গৃহীতও হয়েছে| আমরা দেখেছি, জি-২০-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মিটিংয়ে ক্রুদ্ধ অ্যান্টনি ব্লিনকেন সযত্নে লাভরভের চেহারাদর্শন এড়িয়ে গেছেন| এই মিটিংয়ের চমকপ্রদ দিক ছিল যে, নন-জি-২০ হলেও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অনলাইনে আসেন| বিস্মিত ইইউ আবিষ্কার করে যে জি-২০-এর অনেক কূটনীতিকই রুশদের অর্থনৈতিক চাপে ফেলার পরিবর্তে যার যার তার তার জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে যত্নবান|
ব্লিনকেন জি-২০-এর মিটিংয়ে সফল হননি, তবে ইতিপূর্বেই সেটি পুষিয়ে নিয়েছিলেন তিনি, আটলান্টিকের এপার-ওপারে অগুনতি বার শাটল-ট্রিপ করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইইউকে কাতারবন্দি করেন এবং ইইউ-রুশদের মধ্যে যাতে অর্থপূর্ণ আলোচনা না হতে পারে সেই ব্যবস্হাও করেছেন| কুড়ালের কোপ কার পায়ে পড়ছে চিন্তাভাবনা না করে ইইউ পাইকারি হারে ‘স্যাংকশনস ফ্রম হেল’ জারি করে বসে; উদ্দেশ্য, মস্কোর অর্থনীতি, জ্বালানিশক্তির রপ্তানি এবং অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘রিজার্ভস’| সারা বিশ্ব জানে যে ‘সুইফট্ প্রক্রিয়া’য় রুশ প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় অবন্ধু ইইউকে রুশ জ্বালানি (ইইউ রুশ জ্বালানিনির্ভর) ‘রুবল’ দিয়ে কিনতে হচ্ছে, আর যারা মেজাজ দেখিয়ে সরাসরি রুশ জ্বালানি কিনছে না, তারা রুশ জ্বালানিই কিনছে, তবে ঘুরপথে| অর্থাত্ প্রেসিডেন্ট বাইডেন যে ‘রুবল’ ‘পাথরকুচি’তে বা ‘রাবল’-এ পরিণত হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটি পালিত হয়নি| বরং দল বেঁধে সম্মিলিত পশ্চিমের রুশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আত্মসাত্ দেখে বিশ্বের দেশগুলো নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার পরিণতি কী হতে পারে আশঙ্কায় উদ্বেগগ্রস্ত হয়েছে|
ইইউর ‘স্যাংকশনস ফ্রম হেল’ বিশ্ববাজারে উদ্বায়ী অবস্হা সৃষ্টি করেছে এবং জ্বালানিশক্তির ক্রয়-বিক্রয়ে ‘স্পট মার্কেট’ প্রাধান্য পায়, ২০২১ সাল থেকে ঊর্ধ্বমুখী মূল্য আরো ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে এবং এই পরিস্হিতি অদ্যাবধি বিদ্যমান| আদতে জ্বালানিশক্তির মূল্য সুলভ হওয়া উচিত| এমনকি এক প্যাকেট দুধের চেয়েও সুলভ হলে ভালো হয়! কারণ মূল্যের কারণে তেল, পেট্রল, ডিজেল, গ্যাসনির্ভর শিল্প কারখানা চালানো যদি অলাভজনক হয়, এমতাবস্হায় সেগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই! দেশকে তখন জীবন রক্ষাকারী পণ্য আমদানি করতে হয়| (রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি হলে ‘ডলার’ কর্জ করতে হয় এবং কর্জকৃত ডলারের জন্য সুদ দিতে হয়| ফলে শিগ্গির ঘাটতির সৃষ্টি হয়, কর্জকারী দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার হ্রাস পায়| বর্তমানে সব ধরনের জ্বালানিশক্তির মূল্য ঊর্ধ্বমুখী| প্রেসিডেন্ট বাইডেন সম্প্রতি বলেছেন যে, জ্বালানিশক্তির এই ঊর্ধ্বমুখিতা বেশ কিছুদিন অব্যাহত থাকবে| দীর্ঘদিন ধরেই বাইডেনের প্রধান চাঁদাদাতারা তেল কোম্পানিসমূহ| আবার যুক্তরাষ্ট্র খামারজাত কৃষিজ পণ্যের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ, এদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ন্যাটো রুশদের জ্বালানিশক্তি ও খাদ্য (রুশরা বৃহত্তম শস্য রপ্তানিকারক) রপ্তানিতে বাধা দিচ্ছে| ফলস্বরূপ, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো বড় ঘাটতি বা ডেফিসিটের শিকার হয়েছে)|
আবার ইউরোপের অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউজ জার্মানি! হাল আমলে নির্মিত ’নর্ড-স্ট্রিম২’-এর প্রত্যয়ন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় চালু হয়নি| আবার রক্ষণাবেক্ষণ বা সার্ভিসিংয়ের জন্য ‘নর্ড-স্ট্রিম ১’-এর একটি টারবাইন জার্মান কোম্পানি ‘সিমেন্সে’র মন্ট্রিয়লস্হ ওয়ার্কশপে কানাডার আরোপিত অ্যান্টি-রুশ নিষেধাজ্ঞার সাঁড়াশিতে আটকা পড়েছে| ফলে, মাত্র ৪০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে; অবশ্য ইত্যবসরে ১০দিন স্হায়ী বাত্সরিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ রয়েছে এবং এই সুবাদে ‘গ্যাজপ্রম’, ‘প্রকৃষ্ট শক্তি’-এর বরাত দিয়ে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন হবে সংক্রান্ত ঘোষণায় ইইউর প্রধান খরিদ্দারের উল্লেখ করেছে| টারবাইনটি যদি ফিরে না আসে অথবা রক্ষণাবেক্ষণ শেষে গ্যাস সরবরাহ চালু হবে কি? খুব সম্ভব হবে, অন্তত ৪০ শতাংশ|
জ্বালানিশক্তি তথা গ্যাস বাঁচানোর সরস পম্হা হিসেবে জার্মানির ‘ট্রাফিক লাইট’ সরকার নামে পরিচিত তিন পার্টির সরকার নানা ধরনের ফর্মুলা দিচ্ছে, যেমন :হট-ওয়াটার শাওয়ার সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটের মধ্যে করুন, শীত লাগছে? গায়ে একটা দুটো বেশি সোয়েটার পরুন ইত্যাদি| শীত আসছে ধেয়ে| কী করবেন? ‘ট্রাফিক লাইট’ সরকারের গ্রিন বা সবুজ অংশ বলছে যে, কয়লা পোড়াব, বনের গাছ কেটে লাকড়ি দিয়ে বাড়িঘর উষ্ণ রাখা হবে ইত্যাদি! বিশ্বীয় উষ্ণতায় যারপরনাই আতঙ্কিত সবুজ দল গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা ও লাকড়ি তথা বনের পর বন উজাড়ের সমঝদার; তাদের বিজ্ঞান বা পাটিগণিতের জ্ঞান বকলম হলেও হতে পারে, তবে মোদ্দাকথা হলো, তারা গুরুত্বপূর্ণ দূষণকারীদেরও সমঝদার|
লেখক: প্রবাসী লেখক
