অবক্ষয় রোধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক প্রতিরোধ

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২, ০৬:১৫

বর্তমানে যে সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা তাতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, অশান্তি বাড়ছে। বাড়ছে হতাশা। আর এ হতাশা থেকে এক ধরনের আগ্রাসী মনোভাবের সৃষ্টি হয়। ব্যক্তির মধ্যে নেতিবাচক দিকগুলো ফুটে ওঠে। সে আত্মবিশ্বাসী হয় না। তার মধ্যে ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি কাজ করে। নৃশংস হয়ে ওঠে। এর ফলে ব্যক্তি নিজে যেমন অন্যকে ধ্বংস করতে চায়, অন্যদিকে সে নিজেও এর শিকার হয়। এক্ষেত্রে নানা পেশার মানুষ এমনকি শিক্ষক, নারী, শিশু, বয়স্ক ও পরিবারের লোকজনসহ বাদ পড়ছে না কেউই।

আমরা যেসব হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি তা আসলে সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এসব আমাদের অবক্ষয় আর সামাজিক সংকটের চিত্র। আসলে লোভ, ন্যায়বিচার, বৈষম্য, নৈতিক শিক্ষার অভাব ইত্যাদি অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে; ফলে আত্মহত্যা ও হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। পারিবারিক কলহ, শ্লীলতাহানি, ইভটিজিং, নির্যাতন, মা-বাবা, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রী, স্বজন, বন্ধুবান্ধব সামাজিক সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল জায়গাগুলোয় ফাটল ধরছে, ঢুকে পড়ছে অবিশ্বাস। ছাত্র শিক্ষককে হত্যা ও লাঞ্ছিত করছে। এসব সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে তরুণ ও যুব সমাজ। অথচ তারা এই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।

বিশিষ্টজনদের মতে, সামাজিক অস্হিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা ও প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ঘটছে এ ধরনের ঘটনা। সাধারণত দেখা যায় উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক সন্তানের মধ্যে মাদকাসক্ত বেড়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে, তেমনি পারিবারিক সচেতনতাও হবে বাড়াতে। একইসঙ্গে সামাজিক অনুশাসনের প্রতিও জোর দিতে হবে। যদি সন্তানদের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া যায় এবং তারা কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখা হলে সামাজিক অপরাধের মাত্রা অনেকটাই কমে যাবে।

সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি ও খেলাধুলার চর্চা না থাকায় বর্তমানে শিশুকিশোররা স্মার্ট ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহার বৃৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক। তবে ইন্টারনেট ব্যবহার সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার ফলে মানুষ সহজে এর অপব্যবহার করছে। যার ফলে সাইবার ক্রাইম, অনলাইন হ্যারাসমেন্ট, সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফিসহ অনলাইনভিত্তিক অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমান সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘ভিশন ২০৪১’ পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাতারে উত্তরণ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, কর্নফুলী টার্নেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প, পুরো দেশকে বিদু্যতের আওতায় নিয়ে আশা, ইন্টারনেট সুবিধা ফোর জি থেকে ফাইভ জির আওতায় আনা ইত্যাদি বহু উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু আমাদের সমাজের মানুষের মধ্যে যেভাবে নৈতিকতার অবক্ষয় ও সুবিধাভোগের মানসিকতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং তার ফলাফল হিসেবে অপরাধ ও নৃশংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে নিকট ভবিষ্যতে এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে প্রতিটি পরিবারকে হতে হবে সোচ্চার। পারিবারিক বন্ধন জোরদারের বিকল্প নেই। যার শুরুটা হতে হবে ঘর থেকেই। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। সর্বগ্রাসী সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। সেইসঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুশীলন, পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করা আজ আমাদের সবার দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক প্রতিরোধ।

—শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন