প্রখর তপনতাপে আকাশ তৃষায় কাঁপে—প্রায় শতবর্ষ পূর্বে বলিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমরা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার মধ্যে বাড়িয়া উঠিয়াছি। সূর্যের প্রখর কিরণ কাহাকে বলে, তাহা আমরা হাড়েমজ্জায় জানি। আরো অধিক জানি লোডশেডিং বৃদ্ধি পাইলে; কিন্তু যাহাদের বসবাস শীতপ্রধান অঞ্চলে, তাহাদের দেশ যদি মধ্যপ্রাচ্যের মরুসম উত্তাপে দগ্ধ হইতে থাকে, তাহা হইলে বয়স্ক ও অসুস্থদের প্রাণবায়ু তৃষায় কাঁপিতে বাধ্য।
কী এক পাথরসময় আসিয়াছে—যখন একদিকে মহামারি, অন্যদিকে যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি, ইহার পাশাপাশিই জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাত নামিয়া আসিয়াছে অর্ধেক পৃথিবী জুড়িয়া। ভয়াবহ খরা দেখা দিয়াছে উত্তর ইতালির পাঁচ অঞ্চলে। কয়েক দিন পূর্বে দেশটির আবহাওয়া দপ্তর জানাইয়াছে, গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এই সময়ে ইতালির উত্তরাঞ্চলে খরার যেই তেজ দেখা যাইতেছে, তাহা গত ৭০ বৎসরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পানির এতটাই সংকট দেখা দিয়াছে যে, পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করিয়াছে বেশ কিছু শহর ও জেলা। দেশটির দীর্ঘতম নদী পো বিধৌত অঞ্চলে গত ৭০ বৎসরের মধ্যে এমন ভয়াবহ খরা আর কখনো দেখা যায় নাই। চলমান খরার কারণে দেশটির ৩০ শতাংশ কৃষি উত্পাদন হুমকির মুখে পড়িয়াছে।
এই দিকে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশ অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে বন্যা দেখা দিয়াছে। গত ১৮ মাসের মধ্যে চতুর্থ বারের মতো বন্যার কবলে পড়িল রাজ্যটি। মাত্র চার দিনে আট মাসের সমান বৃষ্টিতে সিডনির সড়কগুলি নদীতে পরিণত হইয়াছে। আমেরিকায় দাবানল নিয়মিতই হইয়া থাকে; কিন্তু এইবার আমেরিকায় আগাম দাবানল দেখা গিয়াছে। জুলাইয়ের শুরুতেই উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু অঞ্চলে আগুন লাগে। রাতারাতি তাহা দ্বিগুণ অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের খরা পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাবে ক্যালিফোর্নিয়ার ৮৬ শতাংশ খরায় ভুগিতেছে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকারী দেশ চীনে দাবদাহ গত কয়েক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাইয়াছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলে হেনান প্রদেশ পুড়িতেছে, অন্যদিকে উলটো ঘটনা ঘটিতেছে সেইখানকার দক্ষিণাঞ্চলে। সেইখানে মানুষ প্রচণ্ড বৃষ্টি আর বন্যায় আক্রান্ত হইতেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে ভারী বৃষ্টিতে বন্যা আর ভূমিধস দেখা দিয়াছে। ইহাতে চার শতাধিক মানুষ প্রাণ হারাইয়াছে, ধ্বংস হইয়াছে ১২ হাজার বাড়িঘর। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের হিসাবে, দক্ষিণ আফ্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চাইতে বৃদ্ধি পাইয়াছে দ্বিগুণ আর ঘনত্ব ৮ শতাংশ। আমরা দেখিতেছি, পূর্ব আফ্রিকা দীর্ঘায়িত খরায় আক্রান্ত। চার মৌসুম পরেও সেইখানে বৃষ্টির দেখা নাই। খরার কারণে এই অঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ চরম অনাহারে রহিয়াছে।
বিজ্ঞানীরা পূর্বেই বলিয়াছেন, পৃথিবীতে শিল্পযুগ শুরু হইবার সময় যেই গড় তাপমাত্রা ছিল—এখন তাহা সোয়া ডিগ্রির মতো বাড়িয়া গিয়াছে। ইহার কারণ কয়লা ও গ্যাস হইতে সৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাস। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলিয়াছেন গত ১ লক্ষ ২৫ হাজার বৎসরের মধ্যে সবচাইতে উষ্ণতম সময়ের মধ্যে আমরা বাস করিতেছি। ব্রিটেনের প্রধান আবহাওয়াবিদ জানাইয়াছেন, ইউরোপ মহাদেশ জুড়িয়া যেই তাপপ্রবাহ চলিতেছে, ইহাতে স্পষ্ট করিয়া বলা যায় যে, পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের যেই প্রতিক্রিয়া হইবার কথা, তাহার সহিত এই তাপপ্রবাহের ঘটনা মিলিয়া যাইতেছে। তাহার মতে, বর্তমান শতাব্দী শেষ হইতে হইতে পৃথিবীর আবহাওয়ায় এ ধরনের অস্বাভাবিক এবং চরমভাবাপন্ন ঘটনা একটা নিয়মিত ব্যাপার হইয়া যাইবে। আশঙ্কার কথা হইল, এই শতকের শেষে ইউরোপ জুড়িয়া প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে প্রতি বত্সর মারা যাইবে দেড় লক্ষেরও অধিক মানুষ। এই ধরনের দুর্যোগে এখন যেই পরিমাণ মানুষ মারা যায়, এই সংখ্যা তাহার চাইতে ৫০ গুণ অধিক। বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাইবার জন্য যদি সত্যিকারের উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয়, তাহা হইলে এই বিশ্বে নূতন বিশৃঙ্খলা দেখা দিবেই। উপায় আমাদের জানা আছে; কিন্তু তাহা পৃথিবীর উন্নয়নকে থমকাইয়া দিবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার সমাধান পৃথিবীর জন্য সম্পূর্ণই শাঁখের করাত হইয়া দেখা দিয়াছে।
