মহাবিশ্বের কয়েক শ কোটি বছর আগের ছবি প্রকাশ করে সম্প্রতি হইচই ফেলে দিয়েছে মার্কিন গবেষণা সংস্থা—নাসা। বিজ্ঞানীদের হিসাবে মহাবিশ্বের জন্ম হয় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে। আর পৃথিবীর জন্ম হয় আনুমানিক ৪৫৪ কোটি বছর (কমবেশি ৫ কোটি বছর) আগে। নাসার জেমস ওয়েব মহাকাশ টেলিস্কোপ দেখাল পৃথিবী জন্মেরও আগের গহিন মহাশূন্যের হাজারও ছায়াপথের ছবি। এখন পর্যন্ত কোনো মহাকাশ টেলিস্কোপের তোলা মহাশূন্যের সবচেয়ে গহিন এবং সবচেয়ে ভালো মানের ইনফ্রারেড ছবি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে একে। কয়েক হাজার ছায়াপথ উঠে এসেছে ছবিটিতে।
অনেকের প্রশ্ন, পৃথিবী জন্মেরও আগের ছবি পাওয়া সম্ভব হলো কীভাবে? বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা মতে, সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় আট মিনিট ১৯ সেকেন্ড। সেই হিসাবে, সূর্যের যে আলো আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, তা আসলে সূর্যের আট মিনিট ১৯ সেকেন্ড আগের আলো। অর্থাৎ সূর্য যদি অদৃশ্য হয়ে যায় সেটা টের পেতে আমাদের সময় লাগবে আট মিনিট ১৯ সেকেন্ড। এভাবে, যত দূরের বস্তু আমরা দেখি, সেগুলোর আসলে তত আগের চেহারা আমরা দেখতে পাই।
নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের যে অংশের ছবি তুলেছে, সে অংশ থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে লাগে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। ফলে, যে ছবিটি টেলিস্কোপ তুলেছে, সেটি আসলে ৪৬০ কোটি বছর আগের চেহারা দেখাচ্ছে। আজ তাহলে ঐ অংশের চেহারা কেমন? সেটি জানা যাবে ঐ একই নিয়মে ৪৬০ কোটি বছর পরে!
বাংলাদেশের মানুষ বিজ্ঞানের এই চমকপ্রদ আবিষ্কার নিয়ে যে যার মতো মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেছে। কেউ করেনি। কেউ বলেছে এটা ভাঁওতা। কেউ বলেছে এটা ‘কিতাবপরিপন্থি।’ বিজ্ঞানের সব আবিষ্কারের কথাই ‘কিতাবে’ লেখা আছে। অনেকে আবার রাতারাতি বিজ্ঞানী সেজে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে এই ঘটনার ভুলভাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞান পড়ুয়া বেশ কয়েক জন শিক্ষার্থীকে জিগ্যেস করে দেখেছি, তারা আসলে ব্যাপারটি ভালোভাবে বোঝেনি। অনেকে বিশ্বাসও করেনি। বোঝার কথাও নয়। আমাদের দেশে বিজ্ঞান বোঝা ছেলেমেয়ের সংখ্যা খুবই কম। সম্প্রতি শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও বলেছেন, ‘বিজ্ঞান পড়েও অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞানমনস্ক হচ্ছে না; এটি উদ্ভাবনের পথে অন্যতম অন্তরায়।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘প্রকৌশল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টি হচ্ছে না। কারণ শিক্ষার্থীরা সংকীর্ণ মানসিকতা লালন করছে। তারা শুধু সায়েন্টিফিক সূত্র মুখস্থ করে ভালো নম্বর পাচ্ছে।’ মন্ত্রীমহোদয় ঠিক কথাই বলেছেন। বিজ্ঞান নয়, জাতিগতভাবেই আমরা ধর্মে আগ্রহী হয়ে উঠছি। জাতিগতভাবে কুসংস্কার অন্ধবিশ্বাস, গুজবকে যতটা গুরুত্ব দিই, বিজ্ঞানকে আমরা সেভাবে দিই না। বিজ্ঞানকে জানার, বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার তাগিদ আমাদের নেই বললেই চলে। ধর্ম, ধর্মের অবমাননা নিয়ে আমাদের যে পরিমাণ মাথাব্যথা, বিজ্ঞানের প্রতি তার ছিটেফোঁটাও নেই। অথচ আমরা সবাই, যারা ভোরে ঘুম থেকে ওঠা থেকে রাতে শুতে যাওয়ার সময় পর্যন্ত, এমনকি নিশ্চিন্ত ঘুমের সময়েও বিজ্ঞানের আশীর্বাদ মাথা পেতে নিই; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সেবায় স্বাচ্ছন্দ্য জীবন উপভোগ করি, তারা বিজ্ঞানের ব্যাপারে কতটাই না উদাসীন! বিজ্ঞানের ব্যাপারে ভাবার আমাদের সময় কোথায়? বিজ্ঞানের সেবা তো দূরস্থ, বিজ্ঞানকে আমরা আপন করার কথা মাথায় এনেছি, বা তাকে জানতে চেষ্টা করেছি কখনো?
আসলে, আমরা বিজ্ঞানকে ঠিকমতো জানতেই চেষ্টা করিনি একবারও। দূর থেকে ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধায় তার দিকে চেয়ে দেখেছি মাত্র। তার স্বরূপ দর্শনে প্রয়াসী হইনি। এর মূল কারণ বিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের ভাবনায় ভুল রয়েছে। আমাদের অধিকাংশের কাছেই বিজ্ঞান মানে নীরস কিছু তত্ত্ব ও তথ্য এবং কিছু জটিল ফর্মুলা। অথচ আদতে বিজ্ঞানের স্বরূপ তা নয়। বিজ্ঞান হলো পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সোপানমাত্র। আক্ষরিক অর্থে ‘বিশেষ জ্ঞান’ বা সম্যক জ্ঞান হলেও বিজ্ঞান প্রকৃত অর্থে পূর্ণ জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে সত্যাশ্রয়ী নিরন্তর যাত্রা। বিজ্ঞান যেহেতু যথার্থ সত্যনির্ভর, তাই আবেগরহিত সত্যানুসন্ধানে, পরীক্ষানিরীক্ষায় সে বেশি উত্সাহী এবং প্রাপ্ত তথ্য ও সূত্রের পরিমার্জন ও পরিবর্ধনে অভ্যস্ত। সেহেতু আদতে বিজ্ঞান স্থবিরতা ও ভাবাবেগের অনীহায় সহজাত।
বিজ্ঞানের স্বরূপকে সঠিকভাবে জানা ও তাকে নিজের মননে স্থায়ীভাবে জায়গা করে দেওয়াই হলো বিজ্ঞানমনস্কতা। এ যেন নিজের জীবনযাত্রাকে সত্যের সঙ্গে বিলীন করে পরমসত্যের দিকে যাত্রা করার প্রয়াস। বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তাই যুক্তিনির্ভর। নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা দিয়ে সবকিছু যাচাই করার মধ্যেই তার শান্তি। এখন প্রশ্ন, আমরা কজন এরকম জীবনদর্শনে অভ্যস্ত বা আগ্রহী? পক্ষান্তরে, আমরা বেশির ভাগই ভাবাবেগে আস্হাশীল; ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্ত্ত, তর্কে বহুদূর’ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ বা প্রভাবিত। এ কথা ভাববার অবকাশ নেই যে, বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষমাত্রেই আবেগহীন, নীরস, কাঠখোট্টা বা মূর্তিমান শয়তান। বরং উলটোটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, তারা তো পরমসত্যের পূজারি। বাস্তবধর্মী ও মানবতাবাদী। আবার এই ধারণাও ভুল যে, বিজ্ঞানের ছাত্রমাত্রই বিজ্ঞানপ্রেমী তথা বিজ্ঞানমনস্ক। আর কলা, বাণিজ্য, ক্রীড়া, শিল্পসংস্কৃতি জগতের মানুষ বিজ্ঞানবিরোধী বা বিজ্ঞানমনস্ক নন। এক্ষেত্রেও উলটোটা হতে পারে। বহু তথাকথিত বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানের অধ্যাপক ও চিকিত্সকের হাতে গ্রহরত্নখচিত আংটি, মাদুলি, তাবিজ শোভা পায়। তারা নানারকম কুসংস্কার ও অপবিজ্ঞানের ধারক বা পৃষ্ঠপোষক। আবার বহু মানুষ সরাসরি বিজ্ঞানের ছাত্র না হয়েও মুক্তমনা ও প্রগতিশীল তথা বিজ্ঞানমনস্ক।
বাংলাদেশের মানুষকে বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করতে তেমন কোনো উদ্যোগ কখনোই দেখা যায়নি। স্বাধীনতার পর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জনগণকে বিজ্ঞানমুখী করার প্রয়াসে বহু সত্ উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে দেশের তরুণ শিক্ষিতরাও এদেশে বিজ্ঞানবিমুখ। কুসংস্কার, অপবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবিরোধী ভাবনা আজও আমাদের সমাজের আনাচকানাচ উপস্হিত। সার্বিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞান সচেতনতার হাল অত্যন্ত শোচনীয়। আমাদের দেশের মানুষ এখনো, তাবিজ, মাদুলি, পানি পড়া, ঝাড়ফুঁক, আংটি, পাথর, দোয়া, মোনাজাতে বেশি আস্হা রাখে।
অথচ জাতীয় স্বার্থেই এখন বৃহত্তর পরিসরে বিজ্ঞানভাবনার প্রসার প্রয়োজন। বিজ্ঞানের দর্শনকে সঠিকভাবে প্রচার ও প্রসারের কাজে গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মানুষের সেবায় ব্রতী বিজ্ঞান আজ মানুষের বিবেকের দুয়ারে কড়া নাড়ছে; কিন্তু আমরা তা শুনতে পাচ্ছি না।
তবে বিজ্ঞানে না হোক, ধর্মীয় বয়ান, বুলি ও আধাত্মিক বাণী রচনা ও প্রকাশে আমরা অনন্য হয়ে উঠছি। আমাদের এই ‘বাচাল’ জাতিকে আরো বেশি ‘কথাবাগিশ’ বানাতে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিরাট ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশে টাকাওয়ালারা এখন আর ১০টা দুই নম্বরি কারবারের সঙ্গে একটা করে টেলিভিশন চ্যানেল ‘পোষেণ’। এই টেলিভিশনগুলো সারা দিন-সারা রাত শুধু বকবকানির অনুষ্ঠান চালায়। আগে টেলিভিশন চ্যানেলে রাত বাড়লে পরে বিভিন্ন রাগপ্রধান গানের অনুষ্ঠান হতো। এসব রাগ-রাগিণীর তালে মানুষ এক সময় ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যেত। এখন যুগ পালটেছে। শারীরিক শ্রম থেকে দেশের মধ্যবিত্তরা প্রায় অবসর নিয়েছে। এখন আর মানুষ আগের মতো ক্লান্ত হয় না। তাছাড়া নানা রকম স্বার্থচিন্তা, ধান্দা-ফিকির, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি মধ্যবিত্তদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এই সব মানুষের রুচিও অনেকটাই পালটে যাচ্ছে। এখন মধ্যবিত্তরা রাত জেগে টেলিভিশনে বকবকানি শুনতে পছন্দ করে। সারা রাত যা শোনে যা বোঝে, পরদিন সেগুলোর সঙ্গে নিজের মত মিশিয়ে উগড়ে দেয়। এভাবেই চলছে বকবকানির চক্র।
গত এক দশকে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তারা একদল সবজান্তা বাক্যবাগিশ লোককে খুঁজে বের করেছে। অধ্যবসায় এবং চর্চায় এরা খুব ভালো ‘বলোয়াড়’ হয়ে উঠেছেন (খেলতে খেলতে খেলোয়াড়, আর বলতে বলতে বলোয়াড়!), যে কোনো বিষয়ে (এমনকি বিষয় ছাড়াও) ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারেন। যদিও তাতে ভাবনার উপকরণ, যুক্তি-বুদ্ধি-বিজ্ঞানের ছোঁয়া বড় বেশি মেলে না।
পুনশ্চ : নাসার জেমস ওয়েব মহাকাশ টেলিস্কোপের ২ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে তোলা ছবি দেখে একটি গল্প মনে পড়ল।
ফিজিক্স শিক্ষক : ‘বিজ্ঞানীরা কয়—আমাগো মহাবিশ্বের জনম নাকি ১৩৭ দশমিক ৩ কোটি বচ্ছর আগের এক ‘বিগ ব্যাং’ থাইক্যা। এই ‘ব্যাং’-থাইকা ছিস্টি হওয়া দুইখান কণা উলটামুখে আলোর ‘ব্যাগে’ দৌড় দিছিল। এই হিসেবে আমাগো মহাবিশ্বের ব্যাস হইল ২৭২ দশমিক ৬ কোটি আলোকবর্ষ। ‘আলোকবর্ষ’ জানস তো? এক বচ্ছরে আলো যদ্দূর যায়।...যাউক গিয়া, এই দিকে ‘হাবলের টেলিস্কোপ’ (ঐঁননষব ঝঢ়ধপব ঞবষবংপড়ঢ়ব) দিয়া নাকি ৪৬৫ কোটি আলোকবর্ষ অবধি দেখন যায়। তা হইলে, টেলিস্কোপে অহন যা দেখি,—সে কি ছিস্টির আগের মাল?—আর তাই যদি হয়, সে আছে ক্যামনে? আর না থাকে যদি, তারে দেখি ক্যামনে? আর দেখি যদি, তবে সেই ‘ব্যাং’ গেল কই? ক্যাঁচাল-খান এইখানেই, বুঝলি কি না?’
ছাত্র : ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, ‘কিচ্ছু বুঝি নাই স্যার!’
ফিজিক্স শিক্ষক স্বগতোক্তি করে : ‘তরে আল্লায় বাঁচাইছে বাপ! এই জিনিস বুঝতে গিয়া আমার মাথাডাই গেল! তোর মাথাডা অন্তত ভালো থাউক!’
বিজ্ঞান বুঝলে যে মাথা যায় না, বরং না বুঝলে মগজে পচন ধরে, এ কথা কে, কাকে বোঝাবে?
হ লেখক :রম্যরচয়িতা
