বহু বৎসর পূর্বে বাংলাদেশে একটি কোম্পানির শাড়ির বিজ্ঞাপনের একটি সংলাপ অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছিল| তাহা হইল—‘ঘরের কথা পরে জানল ক্যামনে!’ বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির যুগে আক্ষরিক অর্থেই ঘরের কথা পরে জানিয়া যাইতেছে| এই ব্যাপারে আরো চমকপ্রদ একটি ঘটনা শোনা যায়—যুক্তরাষ্ট্রের এক নবদম্পতি বিয়ের কিছুদিন পর হঠাত্ সদ্যোজাত বাচ্চাদের প্রডাক্টের ব্যাপারে প্রচুর বিজ্ঞাপন পাইতে থাকে| সকল নবদম্পতি যে এমন বিজ্ঞাপন পায়, তাহা নহে| সেই দম্পতি ডাক্তারি পরীক্ষার পর জানিতে পারে, তাহাদের সংসারে নূতন অতিথি আসিতেছে! এখন প্রশ্ন হইল, ঐ দম্পতির ঘরের কথা গুগল জানিল কী করিয়া?
ইহাতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নাই| আমরা এখন স্মার্টফোনের কারণে সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকি| আমরা কোথায় যাই, কী পছন্দ করি, কী পছন্দ করি না, আমাদের মতাদর্শ কী—কোনো কিছুই নজরদারির বাহিরে নাই| আর আমাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের সূক্ষ্ম হিসাবনিকাশ করিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি অনেক কিছুই বলিয়া দিতে পারে| সেইগুলি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারও করে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেখাইয়াছে, যন্ত্রও অনুমান করিতে পারে| মানুষই তাহাকে অনুমান করিতে শিখাইয়াছে বিভিন্ন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে| এবং সেই উন্নততর প্রযুক্তিবিদ্যায় ভর করিয়াই বর্তমানে মানবসভ্যতা প্রবেশ করিয়াছে এক ডিজিটাল যুগে| সেখানে জীবনের নানা ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করিতেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা| সম্প্রতি গুগলের এক কর্মকর্তা জানাইয়াছেন, গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নাকি (এআই) অনুভূতি রহিয়াছে! গত মাসে ব্লেক যখন দাবি করেন, ল্যাম্বডার মধ্যে মানুষের মতো অনুভূতি ও সচেতনতা দেখা যাইতেছে, তখন তাহার এই মন্তব্য বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সহিত প্রকাশিত হয়| ইহার পূর্বে গুগলের আরেক কর্মকর্তাও ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টকে একই কথা বলিয়াছিলেন|
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানুষ কাজ হারাইবে—ইহা এখন প্রতিষ্ঠিত| কয়েক বৎসর পূর্বে ব্রিটেনের একটি সংবাদপত্র জিপিটি-থ্রি নামক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ল্যাঙ্গুয়েজ জেনারেটরকে দিয়া একই বিষয়ে আটটি নিবন্ধ রচনা করাইয়াছিল| সেইগুলির অংশবিশেষ লইয়া একটি নিবন্ধ তাহারা প্রকাশ করে| সেই নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘এই লেখাটি একটি রোবটের রচনা| হে মানব, তুমি কি এখনো আতঙ্কিত হও নাই?’ হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এমন হইবে যে, এই কলামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়ও খুব সহজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রযুক্তির সাহায্যে রচনা করিয়া লওয়া যাইবে| যেইভাবে যেই বিষয় লইয়া সম্পাদকীয় চাওয়া হইবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেইভাবেই চমৎকার সম্পাদকীয় রচনা করিয়া দিবে| এখনই তো অনেক পিএইচডি গবেষকের কয়েক বৎসর ধরিয়া তৈরি করা অসাধারণ অভিসন্দর্ভ নিমেষেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম দিয়া তৈরি করা যায়| বিদ্যমান ব্যবস্থায় অবশ্য সেই সকল প্লাগারিজম বিশেষ সফটওয়্যার দিয়া ধরাও সম্ভব হয়; কিন্তু প্রযুক্তি যেইভাবে আগাইতেছে, তাহাতে সামনে কী হইবে, তাহা অচিন্তনীয়|
এখন প্রশ্ন হইল, কৃত্রিম বুদ্ধির নিকট কি দূর ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কের পরাজয় ঘটিবে? এই ব্যাপারেও মতভেদ রহিয়াছে| কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যন্ত্রের বুদ্ধি কোনোভাবেই ছাপাইয়া যাইতে পারিবে না মানুষের মগজকে| যেমন বর্তমানে ‘আলফা-গো’ কৃত্রিম বুদ্ধির প্রোগ্রামের প্রয়োজন ৩০ হাজার ওয়াট শক্তি| আর মানুষের মগজের দরকার হয় মাত্র ২০ ওয়াট! তবে আশঙ্কার বিষয় হইল, কৃত্রিম বুদ্ধির একদম প্রাথমিক যুগে আমরা রহিয়াছি| সুতরাং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হইয়া উঠিবে কি না, তাহা স্পষ্ট নহে| তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লইয়া বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতিঃপদার্থবিদ স্টিফেন হকিং আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্ভবত একদিন মানুষের স্থলাভিষিক্ত হইবে| মানুষ যেমন কম্পিউটার ভাইরাস তৈরি করিয়াছে, কেহ হয়তো এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করিবে, যাহা নিজে নিজেই বৃদ্ধি পাইবে| হকিংয়ের মতো আমরাও জানি না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ নাকি সর্বনিকৃষ্ট আবিষ্কার হইবে|
