‘সুবিধা’ ও ‘অসুবিধা’ দুটি শব্দ। এর বিশালত্ব অনেক। আকাঙ্ক্ষা-অনাকাঙ্ক্ষার অনুষঙ্গ। সুবিধা জীবনের সুখ-শান্তি। অসুবিধা জীবনের তিক্ততা। কেউই তা চায় না। সুবিধা যেমন, অসুবিধাও তেমন। কখন আসে, কখন যায়—কেউ বলতে পারে না। জীবনে চলার পথে সুবিধা-অসুবিধা নিত্যসঙ্গী। অসুখ-বিসুখ, ঘটনা-দুর্ঘটনা তো আছেই। সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার অজস্র ঘটনা মানুষের জীবনে আসে। অনেকের জীবনের কানায় কানায় দুঃখের ভরা নদী সতত প্রবহমান। সুবিধা-অসুবিধার সম্মুখীন তো হতেই হয়। বুদ্ধি-নির্বুদ্ধিতার কারণেও কেউ পান সুখের সিঁড়ি, কেউ পান দুঃখের। এসবকে অনেকে ভাগ্য মনে করেন।
তবে এখানে একটি কথা, তা হলো সুবিধা শব্দটি অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে সুবিধা থাকে না। এই অধিকার তার মানবিক অধিকার। সমাজজীবনের বঞ্চনাই মানুষকে অধিকারহারা করে। এর শিকার অনেকেই। মানুষই মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়। অন্তরের কুপ্রবৃত্তিই এর জন্য দায়ী। অন্তরের বিদ্বেষ বিষ সভ্যতাকে কলুষিত করে, ধ্বংস করে। পৃথিবীকে বিবাদ-বিসংবাদে জড়ায়। প্রকৃতিপ্রদত্ত সুবিধা-অসুবিধা সবার জন্যই সমান। এটাকেই অনুকরণীয় ভাবা বাঞ্ছনীয়। অসুবিধাটা কারো একার ভাবা ঠিক নয়। এটা তো আমারও হতে পারত। এখানেই সহানুভূতি দরকার। সহানুভূতি শব্দটি গুণবাচক। এটা বিমূর্ত চিন্তার একটি সুন্দর উপলব্ধি। এটা প্রকৃতিপ্রদত্ত। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ হওয়াই সহানুভূতির কল্যাণের মূর্তিমান রূপ।
অনেক মানুষের চিন্তার মধ্যে সহানুভূতি যেন একদমই দেখা যায় না, যা হতাশাব্যঞ্জক। তারা মানুষের সুবিধা বা কল্যাণ চায় না। অপরের অসুবিধা বা অকল্যাণই এদের রক্তে সতত বহমান। একদমই ‘নাই’ ভাবাটাও ঠিক নয়। সংখ্যার দিক দিয়ে অত্যল্প হলেও সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ পৃথিবীতে আছে। তারা পৃথিবীর কল্যাণকামী। অসুবিধায় নিমজ্জিত মানুষকে সুবিধামণ্ডিত করার ব্রত তারা পালন করে। সুবিধা ও অধিকারবঞ্চিত মানুষ ভাগ্যকে দায়ী করে থাকে। অপকৌশলীদের সুবিধা আকাশচুম্বী। কেউ কেউ অসুবিধা নিয়েই বেঁচে থাকে। থাকতে বাধ্য হয়। বঞ্চনার শিকার ব্যক্তির অসুবিধা ও অকল্যাণ কখনোই তার পিছু ছাড়ে না।
কল্যাণকামী আবেগানুভূতিপ্রবণ মানুষই পৃথিবীকে সুন্দর রাখে, প্রকৃতিকে সুন্দর রাখে। ভিন্ন ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ এক রকম নয়। এদের মধ্যে মন্দের ভাগটা বেশি। এরা শুধু আকাশচুম্বী সুবিধা পেতে চায়। সহানুভূতির লেশমাত্র এদের মনে নেই। ভালোমন্দের প্রকাশমানতায়ই এর পরিচয়। সহানুভূতিটা ভালো মনের পরিচয়। সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের অভাবটা বেশি পরিলক্ষিত হয়। কিছু মানুষ তাদের সুবিধাটা আকাশছোঁয়া করে নেয়। আধিপত্য বিস্তারে থাকে নেশাগ্রস্ত। শোষণের শিকড় উপ্ত করে চলে নিরন্তর। স্বীয় সুখ-সুবিধা লাভে থাকে বিভোর। এটাই চরম অমানবিকতা। সভ্যতার বিমূর্ত অবয়ব সহানুভূতিটা অসম চিন্তার কালো চাদরে ঢাকা পড়ে যায়।
সুখ-দুঃখ সমভাগ করে নেওয়াই সভ্যতা। সহানুভূতির মধ্যে কোনো রকম বৈষম্য নেই। সামষ্টিক সুবিধাই সব মানুষের জন্য কল্যাণকর। সহানুভূতি ও সুবিধাদানকারী ব্যক্তি মানবিকতায় উজ্জ্বল। মহত্ত্বের অনুষঙ্গ। উন্নত মনোজগতের অধিকারী। এরা কেউই কারো অধিকার ক্ষুণ² করে না। অন্যের কষ্ট লাঘবে এদের সুন্দর মনের অভিব্যক্তি সত্যিই প্রশংসার। প্রাতঃস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে ওরা বেঁচে থাকে চিরকাল। যেমন—গান্ধীজি তখন দক্ষিণ আফ্রিকায়। একজন মানুষের সুবিধার জন্য গান্ধীজি প্রতিদিন চার মাইল হাঁটতেন। একজন খানসামাকে ইংরেজি শেখাতে তিনি এই পরিশ্রম করতেন। যতদিন না সে ভালো ইংরেজি শিখল, ততদিন গান্ধীজি সেখানে যেতেন। এই খানসামা গান্ধীজিকে অনুরোধ করেছিল ইংরেজি শেখাতে। তার চাকরির মান ভালো করার জন্য। সুবিধাটা গান্ধীজি তাকে দিয়েছিলেন। মনুষ্যত্বের কী চরম পরাকাষ্ঠা!
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দয়ার সাগর বলে খ্যাতিমান ছিলেন। তার আবেগানুভূতি ছিল কল্যাণপ্রসূ অভিধায় সিক্ত। রাস্তায় পড়ে থাকা এক কুষ্ঠরোগীকে জাপটে ধরে তিনি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাস্তার লোকেরা কী বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতেই না তা অবলোকন করেছিল।
ভেনেজুয়েলার এক বিশ্ববিদ্যালয়। পাহাড়ের কাছে অবস্থান। এই বিশ্ববিদ্যালয় সেই পাহাড়ের আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে এই মহত্ কাজটি করেছেন। শত কষ্টের মধ্যেও কাজটি করেছেন তারা। সেখানে স্কুল করে আদিবাসীদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন স্থাপন করেছেন।
এ পি জে আবদুল কালাম তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি। তার গাড়িচালক আর তার মধ্যে সম্পর্কটা অন্তরঙ্গ। একদিন তিনি গাড়িচালককে বললেন, ‘তুমি কী লেখাপড়া করতে চাও?’ গাড়িচালক বললেন, ‘স্যার, সময় তো কম।’ রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘নৈশকালীন সময়টা কাজে লাগাতে পারো। আমি সমস্ত খরচপাতি চালাব।’ সুবিধাদানের সহানুভূতি তার জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে। তিনি এখন এক কলেজে প্রভাষক হিসেবে চাকরিরত।
অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্দু দুর্গম অরণ্যবাসী পাহাড়িদের এক অন্যরকম ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন। জড়িয়ে নিয়েছেন। ঘটনাটি বিস্ময়কর। দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা ধরে হাজার হাজার ফুট উঁচুনিচুতে পায়ে হেঁটে তিনি সেখানে পৌঁছান। আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের সরকারি সুবিধা প্রদানের আশ্বাস দেন। সত্যিই ‘মানুষ মানুষের জন্য’ কথাটি পেমা খান্দুর বেলায় শতভাগ সত্য।
মাও সে তুং। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান। তার জীবনে সহানুভূতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের অভিভূত করে। ঘটনাটা লংমার্চের সময়ের। চেনচেংফেং নামের এক বালক লংমার্চের সঙ্গে ছিল। প্রচণ্ড এক শীতের রাত। লংমার্চের পাহাড় অতিক্রমের সময়। সৈন্যদের সঙ্গেও শীতবস্ত্র ছিল না বললেই চলে। চেনচেংফেং এখানে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। চেয়ারম্যান মাওয়ের শীত নিবারণের জন্য একটিমাত্র কম্বল ছিল। সেই রাতে চেয়ারম্যান মাও কম্বল দিয়ে চেনচেংফেংকে রক্ষা করেছিলেন। নিজের কষ্টের কথা একটুও চিন্তা না করে। সহানুভূতির কী উজ্জ্বল দৃষ্টান্তই না ছিল সেটা।
লেখক : সাংবাদিক
