সাম্প্রতিক বজ্রপাত ও বাংলাদেশ

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২২, ০৪:১৮

সাম্প্রতিককালে সম্পদ ও জীবনহানিতে বন্যা, আকস্মিক বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও খরার ন্যায় বজ্রপাতের ভূমিকাও কম নয়। বজ্রপাত এ রকমই একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়। দক্ষিণ এশিয়ার বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা বেড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। আমাদের দেশে বজ্রপাতের শিকার মানুষের বড় অংশ কৃষক, যারা সবার মুখে অন্ন তুলে দিতে মাঠে যান। আর সেখানেই মরে পড়ে থাকেন। ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউ মিউলিনের গবেষণামতে, প্রতি বছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতের ফলে বছরে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলেই ধারণা করা হয়।

বজ্রপাত কী? উত্তপ্ত ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বায়ু দ্রুতগতিতে ঠান্ডা হলে বজ্রমেঘের সৃষ্টির মাধ্যমে তার ভেতরে অবস্থিত জলীয়বাষ্প বৃষ্টিকণা, শিশিরবিন্দু ও তুষারকণায় পরিণত হয়। বৃষ্টিকণা ও তুষারকণার পারস্পারিক সংঘর্ষের ফলে তুষারের ইলেকট্রন চার্জ ধাক্কা খায় এবং স্থির বৈদ্যুতিক চার্জের সৃষ্টি হয়। এই চার্জ সঞ্চিত হয়ে তীব্র শব্দের বজ্রপাত সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, বাতাসে ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ যতই দ্রুততর হয়, বজ্রপাত তত বেশি মাত্রায় হয়ে থাকে। পজিটিভ ও নেগেটিভ মেঘ থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনকালে বজ্রের সৃষ্টি হয়, তখন মেঘের ভেতরে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন গ্যাসের সম্প্রসারণ ঘটে। এর ফলে বায়ুর দ্রুত প্রসারণ হয় এবং তীব্র শব্দের সৃষ্টি হয়।

পৃথিবীর সম্মিলিত চার্জ শূন্য (০) হলেও পৃথিবীপৃষ্ঠে ও কেন্দ্রে ভিন্ন ভিন্ন চার্জ থাকে বলে ধারণা করা হয়। পৃথিবীর কেন্দ্রে তীব্র চাপ ও তাপ থাকে। ফলে পৃথিবীর কেন্দ্রে ধনাত্মক চার্জ এবং ভূপৃষ্ঠে বা তার সামান্য নিচে থাকা বস্তুর পরমাণু ঐ ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক চার্জে পরিণত হয়। এই ঋণাত্মক চার্জের সঙ্গে ডিসচার্জ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য মেঘের ওপরের পৃষ্ঠের ধনাত্মক চার্জ ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। সূর্যের তাপে জলাশয়ের জল বাষ্পীভূত হয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। উষ্ণ-আর্দ্র, হালকা বায়ু দ্রুতবেগে ওপরের দিকে উঠতে থাকলে ঠান্ডায় ঘনীভূত হয়ে কিউমুলোনিম্বাস মেঘের সৃষ্টি করে। এই মেঘ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে যেতে পারে। ওপরের দিকে ধাবমান জলীয়বাষ্পের তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তখন জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে জলকণা বা বরফে পরিণত হয়। এই শীতল জলকণাযুক্ত ভারী বাতাস নিচের দিকে নেমে যায় এবং উষ্ণ হয়ে আবার ওপরের দিকে উঠে যায়। বাতাসের এই পর্যায়ক্রমিক উত্থান-পতন একটি বর্তনী (CirCuit) তৈরি করে, যার নাম পরিবহন কোষ বা কনভেকশন সেল (Convection Cell)। এ ঘটনা যদি অল্প পরিমাণে হয়, তাহলে শুধু মেঘ তৈরি হয় আর যদি বেশি মাত্রায় হয়, তবেই ঐ মেঘ থেকে বজ্র তৈরি হয়। ভূমি থেকে তিন মাইল দূরত্বের বজ্রপাত ১ বিলিয়ন জুল শক্তি উত্পন্ন করে। বৈদ্যুতিক শক্তি পরিমাপক হিসেবে এই শক্তি ২৭ হাজার ৮৪০ কিলোওয়াট আওয়ার।

আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকায় বজ্রপাতের সংখ্যা ও প্রাণহানি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, তাপমাত্রা ১ (এক) ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। পৃথিবীর যে কয়েকটি অঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ, তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য। উন্নত দেশগুলোতে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টিকে এখন অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই বিবেচনা করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশে বজ পাতের মূল কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। একদিকে বঙ্গোপসাগর, এর পরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে আসছে গরম আর আর্দ্র বাতাস। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। কিছু দূরেই হিমালয় পর্বত।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে গত ৬০ দশকে ভারতবর্ষে শুরু হয় সবুজ বিপ্লব (ত্বেবহ জবাড়ষঁঃরড়হ)। বিভিন্ন গবেষণায় বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার অনিয়মিতকরণ ও উষ্ণায়নে সবুজ বিপ্লবের অবদান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তবে বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লবের কারণে স্থানীয় জলবায়ুতে কী প্রভাব আছে, তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই বা থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা সাময়িকীতে নেই। বিষয়টি সামনে এসেছে গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের কারণে বহুসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্হা (নাসা)-র (১৯৯৮-২০১৪) ১৭ বছরের তথ্য নিয়ে অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান ও তার টিম এবং পরবর্তী সময়ে ফিনিশ কোম্পানি ভাইসলার (২০১৫-২০২০) উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করেন। দুটো গবেষণাতেই দেখা গেছে বাংলাদেশে বজ পাত মৌসুমনির্ভর। প্রাক-মৌসুমে, অর্থাৎ মার্চ থেকে এপ্রিল-মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় হাওর অঞ্চলে :নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটে। তাছাড়া, মৌসুমি সময়ে বজ্রপাত বেশি হয় সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, বরিশাল এবং উত্তরবঙ্গের রংপুর, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামে। আবার, মৌসুমি-উত্তর (অক্টোবর-নভেম্বর মাসে) পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। সাতক্ষীরা, খুলনা, পটুয়াখালী অঞ্চলে বেশি হয় শীতকালে।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাত একটি কমিউনিটি স্বাস্হ্য সমস্যা। বজ্রপাতে শরীরে বৈদ্যুতিক শক হয়। এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় হার্ট ও ব্রেইন। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা শরীরের অনেক অংশ অবশ হয়ে যেতে পারে। এমনকি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে। বজ্রপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তাই আবহাওয়া পূর্বাভাসে যদি বজ্রঝড় হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে, তবে ভ্রমণ বা বাইরের কার্যকলাপ স্হগিত করা প্রয়োজন।

আমাদের গ্রামগুলোয় উঁচু গাছ কমে যাচ্ছে। মধ্যবয়স থেকে একটি গাছের মোটাসোটা ও লম্বা হতে সময় বেশি লাগে বলে ব্যাবসায়িক বনায়ন মডেলে দ্রুত বাড়ন্ত মাঝারি গাছ কেটে ফেলা হয়। নির্দিষ্ট দূরত্বে উঁচু গাছ রাখার মতো সচেতনতা ও পরিবেশবিষয়ক জ্ঞান লোপ পেয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবসস্থা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুরক্ষার প্রাকৃতিক জ্ঞান বিস্তার করা প্রয়োজন।

শহরে উঁচু গাছ খুবই কম। তবে শহরে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থাপনা খুবই সহজ। শহরে উঁচু ভবনের ওপরে বজ্রনিরোধক টাওয়ার রাখার সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা নেই। শহরের উঁচু দালানে বজ্রনিরোধক লাইটনিং সার্জ অ্যারেস্টার টাওয়ার বসানো বিশ্বের বড় বড় শহরে বেশ প্রচলিত। একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে উঁচু শহুরে দালানে বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্হাপন করে বজ্রপাতের ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়, এসব টাওয়ারে অনেক দীর্ঘ উল্লম্ব উচ্চতার লাইটনিং অ্যারেস্টার থাকবে, যা বজ্রপাত কিংবা বৈদ্যুতিক আধানকে নিরপেক্ষ বা নিউট্রালাইজ করবে। সাধারণত শহুরে ভবনে ইচ্ছামাফিক বৈদ্যুতিক আর্থিং ব্যবস্থা থাকে, টেকসই আর্থিং থাকে না বলে বজ্রপাতে ঐ সব ভবনে আগুন ধরতে পারে এবং না ধরলেও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বিকল হয়।

শহুরে আবাসিক এলাকাসহ দেশের বিতরণ লাইনের সিংহভাগ এখনো ওভারহেড, যা বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব বিতরণ লাইনের আর্থিং ব্যবস্থাপনা মান প্রশ্নাতীত নয়। কেননা, উচ্চ লোডের কারণে এমনিতেই সময়ে সময়ে ট্রান্সফরমার, এমনকি লাইনগুলোয় স্পার্কিং দেখা যায়। বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জাতীয় গ্রিড লাইনে উচ্চমান বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকার কথা, তথাপি সেগুলো ডিজাস্টার ক্যাপাবল কি না, তা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। কেননা, বজ্রপাতের হার সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। নতুবা অবকাঠামোগত বড় ক্ষতি হওয়ার সুযোগও থেকে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাত আরো ঘন ঘন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বজ্রপাত আরো ঘন ঘন হবে। এমনকি বায়ুদূষণেও বজ্রপাত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোর ভূমির উষ্ণতা পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে অন্তত ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, বাতাসের উষ্ণতাও তেমনি বেশি। নিরন্তর জ্যামে জ্বালানির দহন, অত্যধিক গরমের শহরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অতিব্যবহার, শক্তির যাবতীয় রূপান্তর, এনার্জি কনভারশন—এসব মিলে উষ্ণতা ও দূষণ দুটোই বাড়াচ্ছে।

বজ্রনিরোধক ব্যবস্থাপনার একটি বিকল্প সমাধান হতে পারে প্রতিটি মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে ৪৫ থেকে ৫০ মিটার উচ্চতায় থাকা বজ্রনিরোধক (লাইটনিং এরস্টার) বসানোর বাধ্যবাধকতা। দেশে টেলিকম টাওয়ার বসানোর পরিবেশবান্ধব টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। বাড়ির ছাদে কিংবা উঁচু দালানের সাইড ওয়ালে বড় বড় এনটেনা মাউন্টেড টাওয়ার করার কারণে এগুলো বজ্রপাত আকর্ষণ করে, ফলে বাড়িগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণত এসব টাওয়ারের নিজস্ব আর্থিং ব্যবস্থা থাকে (ছোট লাইটনিং অ্যারস্টার), যা পার্শ্ববর্তী এলাকার বজ্রনিরোধে কাজে আসে না।

দূষণ রোধে বিটিআরসিকে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব তড়িত্-চুম্বকীয় তরঙ্গ সঞ্চালন ও রেডিও এনটেনা স্থাপনের সমন্বিত পরিবেশবান্ধব নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বজ্রপাত সার্বিকভাবে উপকারী। এটি ভূমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। তাই, সচেতনতার মাধ্যমে বজ্রপাতে প্রাণক্ষয় এড়াতে হবে।

হ লেখক:পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, সিলেট

ইত্তেফাক/ইআ