বিদেশ হইতে বাংলাদেশে আসিতেই অনেকে বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইতেছেন। মনে হইতেছে এই দেশকে যে করিয়াই হউক শ্রীলঙ্কা বানাইতে অনেকে এখন উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন। ইহা কতটা ইনফ্লিকটিভ বা নিজেকে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত করিবার শামিল তাহা ভাবিতেই আমাদের বিস্মিত হইতে হয়। এমন আত্মঘাতী কাজ বাংলার লোক ছাড়া আর কোনো দেশে কেহ করেন কি না, তাহা আমাদের জানা নাই।
আমরা যদি পৃথিবীর দিকে তাকাই তাহা হইলে সর্বত্র কমবেশি সংকট দেখিতে পাই। এমনকি বিভিন্ন উন্নত দেশেও আজ ভয়াবহ সংকট চলিতেছে। চাকুরি নাই, খাবার নাই, জ্বালানি নাই কত কী সমস্যা! সিঙ্গাপুরের মতো দেশে বর্তমানে মাংসের কনজামশন বা চাহিদা কমিয়া গিয়াছে। মানুষ আরো খারাপ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া কৃচ্ছ্র সাধন করিতেছে। ফ্রান্সে এসি চালু রাখিলে ৭৫০ ডলার জরিমানার বিধান করা হইয়াছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ইনফ্ল্যাশন বা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়া গিয়াছে। বিদেশে কেনাকাটা করিলেই পরিস্থিতি টের পাওয়া যায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অবস্থা তথৈবচ। সম্প্রতি আইএমএফ জানাইয়াছে যে, বিশ্বের আরো এক ডজনের অধিক দেশ শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি বরণ করিতে পারে। দেশগুলি হইল—লেবানন, রাশিয়া, সুরিনেম, জাম্বিয়া, বেলারুশ, আর্জেন্টিনা, ইউক্রেন, তিউনিশিয়া, ঘানা, মিশর, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, এল সালভাদর, পাকিস্তান, ইকুয়েডর ও নাইজেরিয়া। এখানে বাংলাদেশের নাম নাই; কিন্তু কেহ কেহ বাংলাদেশের নাম দেখিতে যেন-বা ব্যাকুল হইয়া পড়িয়াছেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা ও সৎপরামর্শ দেওয়া দরকার; কিন্তু তাহা না করিয়া প্রিয় দেশকে ব্যর্থ প্রমাণিত করিবার জন্য আমাদের অনেকের ঘুম হারাম হইয়া গিয়াছে!
ক্রান্তি বা সংকটকাল থাকিবেই। তাহার পরও আমাদের অপটিমিস্ট বা আশাবাদী হইতে হইবে। বাঁচিয়া থাকিতে হইলে আমাদের যে কোনো পরিস্হিতিতে খাপ খাওয়াইয়া চলিতে হইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য নাই, বিদ্যুৎ-গ্যাস নাই। কলকারখানায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হইতেছে না। তাহার পরও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করিতে হইবে না, এমন কথা আমরা বলি না। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়াইয়া দিলেই চলে। ইতিমধ্যে সময় বাড়ানো হইয়াছে; কিন্তু কিছু সিনিক্যাল বা নৈরাশ্যবাদী লোক আছেন যাহারা কোনো কিছুর মধ্যে শুভ বা ভালো কিছু দেখিতে পান না। লোডশেডিং হইলেও এখনো আমরা বিদ্যুৎ পাইতেছি। আমরা যতটুকু বুঝি তাহা হইল, পৃথিবী এখনো যুদ্ধের মধ্যেই রহিয়াছে। পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজ বলিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সমগ্র বিশ্বেই পড়িয়াছে। করোনা মহামারিও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়াছে সমগ্র বিশ্বকে। ইহা বিদায় নিয়াছে এমনটি ভাবিবার কোনো অবকাশ নাই। গতকালের শেষ খবর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় করোনা পরিস্থিতি আবার উদ্বেগজনক অবস্থায় উপনীত হইয়াছে।
করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ কলকারখানা বন্ধ করিয়া, শ্রমিকদের ছুটিছাটা দিয়া মানুষকে বসাইয়া বসাইয়া খাওয়ানোর ব্যবস্থা করিয়াছে। তাহারা উন্নত দেশ বলিয়া এইরূপ করিতে সক্ষম হইয়াছে; কিন্তু ইহারও একটি নেতিবাচক দিক রহিয়াছে। এই সময় টাকার প্রবাহ বাড়ানো হইয়াছে, অথচ উৎপাদন বাড়ে নাই। ফলে বাজারে অধিক অর্থ কিন্তু কম দ্রব্য সরবরাহের কারণে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়াছে এই সকল ধনী দেশেও। এই নির্মম বাস্তবতাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
এমন পরিস্হিতিতে আমাদের ঠান্ডা মাথায় কাজ করিতে হইবে; কিন্তু ইহারই মধ্যে কাহারও কাহারও কাজ হইল জনগণকে যে করিয়াই হউক রাস্তায় নামাইতে হইবে। যাহারা ইহাতে ইন্ধন দিবার চেষ্টা করিতেছেন, তাহাদের উচিত আয়নায় নিজেদের চেহারা আগে দেখা। বিশ্ব একটি নৈরাজ্যকর অবস্থার দিকে যাইতেছে। বিশ্ব অর্থনীতিবিদগণ যেই সকল ভবিষ্যদ্বাণী করিতেছেন, তাহার সকলই হয়তো আমাদের দেখিয়া যাওয়া সম্ভব হইবে না। যাহারা তখন বাঁচিয়া থাকিবেন, তাহারা তখন মৃত ব্যক্তিদের ঈর্ষা করিতে পারেন। অর্থাৎ পৃথিবীর এই দুর্দশা দেখিবার পূর্বেই তাহারা মরিয়া গিয়া যেন বাঁচিয়া গিয়াছেন। অতএব, নিজের দেশকে যাহারা শ্রীলঙ্কা হিসাবে দেখিতে বা বানাইতে চাহেন, তাহাদের উল্লসিত হইবার কোনো কারণ নাই।
