আজ ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস-২০২২। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আর অপেক্ষা নয়, হেপাটাইটিস প্রতিরোধের এখনই সময়’। দিবসটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, এই দিনটি হলো নোবেলবিজয়ী জেনেটিক বিজ্ঞানী প্রফেসর বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গের জন্মদিন। ১৯৬৭ সালে বারুচ এইচবিভি (HBV) আবিষ্কার করেন এবং ১৯৬৯ সালে অণুজীব বিজ্ঞানী মিলম্যানসহ আবিষ্কার করেন এর টিকা। এ, বি, সি, ডি, ই হলো হেপাটাইটিস ভাইরাস। এইচবিভি এবং এইচসিভি যকৃতে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ করে, এমনকি যকৃত ক্যানসারেরও মূল কারণ। বাংলাদেশে ৮৫ লাখ মানুষ এইচবিভি এবং ১৫ লাখ মানুষ এইচসিভি দ্বারা আক্রান্ত হলেও শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ জানেন না যে, তারা এতে সংক্রমিত। তাদের মধ্যে ২৮ লাখ নারী (১৮ লাখ প্রজননক্ষম) এবং ৪ লাখ শিশু। মৃত্যুর দিক থেকে পৃথিবীতে ক্যানসারের পর হেপাটাইটিসই মূল কারণ।
জার্নাল ল্যানসেট (২০১৯)-এর তথ্য অনুসারে, যকৃত ক্যানসারের শতকরা ৪২ ভাগ রোগী এইচবিভি এবং শতকরা ৩১ ভাগ রোগী এইচসিভি দ্বারা দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমিত ছিল। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) নামক এক দুষ্ট জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত। বর্তমানে প্রায় শতকরা ছয় জন মানুষ এই ভাইরাসটি দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে বহন করছেন। দীর্ঘমেয়াদি যকৃতের রোগ ও যকৃতের ক্যানসারের প্রধানতম কারণ হলো এই ডিএনএ ভাইরাসটি। মন্দের ভালো হলো, এটার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে এবং সম্প্রসারিত ইপিআই টিকা কার্যক্রমের আওতায় বাংলাদেশের সব শিশু এই টিকা পাচ্ছে। আমরা আশা করতে পারি—নিকট-দূর ভবিষ্যতে এই ভয়ংকর ভাইরাসটিকে জাদুঘরে পাঠাতে পারব হয়তো!
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সেক্টর স্ট্র্যাটেজির ২০২০ সালে কিছুটা লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, যা শিশুদের টিকা এবং রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম দ্বারা সম্ভব হয়েছে। এখন চার বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের বি ভাইরাসের হার শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ। প্রতি বছর বি ভাইরাস দ্বারা নতুনভাবে সংক্রমিত হচ্ছে লাখে ২০ জন এবং বি ভাইরাসের কারণে বছরে মারা যায় লাখে ১০ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বি ভাইরাস নির্মূলে কিছু লক্ষ্য স্থির করেছে। চারের কম বয়সি শিশুদের বি ভাইরাস সংক্রমণ কমিয়ে ২০২৫-এ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০৩০-এ শূন্য দশমিক ১ শতাংশ আনার পরিকল্পনা করেন। নতুনভাবে সংক্রমণের সংখ্যাও প্রতি লাখে ২০২৫-এ ১১ জন এবং ২০৩০-এ দুই জনে কমিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করেন। বি ভাইরাসজনিত মৃত্যুহার ও ২০২৫-এ প্রতি লাখে সাত এবং ২০৩০-এ প্রতি লাখে চারে কমিয়ে আনতে চান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সেক্টর স্ট্র্যাটেজি ২০২২। সেজন্য বি ভাইরাস সংক্রমণ রোধে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সেক্টর স্ট্র্যাটেজি ২০২২-এর মূল লক্ষ্য হলো—জন্মের পরপর সব শিশুকে প্রথম ডোজ টিকা এবং অন্য সব শিশুকে শিডিউলের সব টিকা কাভারেজ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রমান্বয়ে কমপক্ষে ৯০ শতকের ওপরে রাখা। বর্তমানে বি ভাইরাস সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে শতকরা মাত্র ৩০ ভাগ রোগীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য হলো—শতকরা ৯০ ভাগ রোগীর রোগ নির্ণয় করা এবং কমপক্ষে শতকরা ৮০ ভাগ রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে শিশু বয়সে এবং মাতৃগর্ভে—সেটা নিজের মায়ের মাধ্যমে সংক্রমণ।
খারাপ ব্যপারটা হলো—শিশুবয়সের সংক্রমণের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ শিশু এই জীবাণুটি সারা জীবন বহন করে, অজান্তে অন্যদের সংক্রমিত করে এবং শতকরা ৫ ভাগ শিশু দূর ভবিষ্যতে যকৃতের ক্যানসারসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল যকৃতের রোগে ভোগে। শিশুদের এত বেশি দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কারণ হলো—জরায়ুতে থাকা অবস্থায় অনবরত ভাইরাসের মুখোমুখি হওয়া এবং দুর্বল, ক্লান্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়া। মায়ের শরীরে যত বেশি ভাইরাল লোড, বাচ্চার সংক্রমণের হার তত বেশি। প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে প্রবল ইমিউন প্রতিক্রিয়া হয়, যকৃত স্বল্পকালীন সময় অল্প থেকে মাঝারি আকারের আঘাত পেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এপোপটসিস ও সাইটোকাইনের মাধ্যমে শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্হা সংক্রমিত কোষগুলো ধ্বংস করে ফেলে এবং উলটো শরীরের মধ্যে এইচবিভি প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। তবে দুর্বল ক্লান্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে এদের মধ্যেও শতকরা মাত্র ৫ ভাগ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি এই ভাইরাসটি বহন করে এবং কেউ কেউ যকৃতের জটিলতার সম্মুখীন হন। ক্লান্ত সিডি ৮ ও টি রেগুলেটরি কোষের প্রকটতাই হলো ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধে শরীরের প্রতিরক্ষায় হেরে যাওয়ার কারণ। বাচ্চার জন্মের পূর্বে মায়েরা চিকিৎসকের কাছে অ্যান্টিনেটাল চেকআপের জন্য আসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান হলো—শতকরা মাত্র শূন্য দশমিক ৪ ভাগ (বাংলাদেশে শতকরা ৩ দশমিক ৫ ভাগ) গর্ভবতী মা এই ভাইরাসটি বহন করছে। এই পরিসংখ্যানটিকে শূন্য করতে পারলেই HBV-এর পরিণতি হবে স্মলপক্সের মতো।
উপসংহারে বলব, গর্ভবতী মা-সহ সবার এইচবিএসএজি (HBsAg) টেস্ট করানো উচিত। পজিটিভ হলে নির্দিষ্ট পরীক্ষানিরীক্ষা ও চিকিৎসা দরকার। নেগেটিভ থাকলে প্রয়োজনে অ্যান্টি এইচবিসি টোটাল (anti HBC total) এবং প্রয়োজনে অ্যান্টি এইচবিএস (anti HBs) টেস্ট করা দরকার। উপরিউক্ত পরীক্ষানিরীক্ষায় নেগেটিভ থাকলে অবশ্যই এইচবিভি টিকা প্রদান প্রয়োজন। এইচবিভি সংক্রমণ জটিলতা শুরু করে দিলেও সুনির্দিষ্ট চিকিত্সায় কার্যকরী নিরাময় হয়।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা
