‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’—পুরাতন এই কথাটি বাংলাদেশে যেন কখনো পুরাতন হইবার নহে। সরকারি অর্থের অপচয়, যথেচ্ছাচার আমরা প্রায়শই দেখিতে পাই। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কোনো কোনো হাসপাতালে এক্সরে, প্যাথলজি পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, আলট্রাসনোগ্রাফি, ল্যাপারোস্কপি, স্টেরিলাইজার, অটোক্লেভ, ডায়াথামিসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরিয়া বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি চক্র যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করিয়া আসিতেছে।
আমরা দেখিতে পাই, একটি অসাধুচক্র যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যস্ত থাকে এবং যাহারা কেনাকাটায় দুর্নীতি করিতেছে, তাহারাই জনবল নিয়োগে জটিলতা সৃষ্টি করিতেছে। অনুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, সমগ্র দেশের জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালে সকল ধরনের অবকাঠামো রহিয়াছে; কিন্তু হেলথ টেকনোলজিস্ট সংকটের কারণে হাসপাতালের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি বৎসরের পর বৎসর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়িয়া থাকে। ইহাতে নষ্ট হইয়া যাইতেছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।
আসলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হইলেও অসাধু চক্রের লাভ, যন্ত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইলেও লাভ। তাহাতে পুনরায় ক্রয়াদেশ পাইবার পথ তৈরি হইবে এবং পুনরায় লাভের গুড় তাহারা খাইবে। বিগত বহু বৎসর ধরিয়াই দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিবিধ দুর্নীতি ও নানাবিধ অপচয়ের অসংখ্য খবর প্রকাশিত হইয়াছে। অবকাঠামো সংকট, ঔষধসংকট, চিকিৎসক ও অন্য জনবলসংকট, চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজন এমন যন্ত্রপাতির সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা প্রায়শই পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়।
আমরা অতীতেও দেখিয়াছি, বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নানান সময় কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেডিক্যাল যন্ত্রাংশ অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট হইয়া গিয়াছে; কিন্তু ঐ সকল যন্ত্রপাতির জন্য কোনো অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির প্যাকেটও খোলা হয় নাই। অর্থাৎ বহু মূল্য দিয়া তেজি ঘোড়া ক্রয় করা হইয়াছে; কিন্তু ঘোড়া পরিচালনার জন্য নগণ্য মূল্যের সামান্য ‘চাবুক’ ক্রয় করা হয় নাই। অথচ তৃণমূল স্তরে চিকিত্সাসেবা পৌঁছাইয়া দিতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নাই। তাহা হইলে সমস্যাটি কোথায়?
স্বাস্থ্যসেবায় হেলথ টেকনোলজিস্টদের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন রোগীর রোগ নির্ণয় করিতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করেন টেকনোলজিস্টরা। অথচ, ২০০৮ সালের পর হেলথ টেকনোলজিস্ট পদে আর কোনো নিয়োগ হয় নাই। এই ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় বাধা ছিল কোর্টের স্থগিতাদেশ। সেই স্থবিরতা কাটিয়া যায় করোনার সময় এবং ৩ হাজার টেকনোলজিস্ট নিয়োগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। সেই অনুযায়ী ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়। অথচ নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেই নিয়োগ বাতিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্পষ্টতই, স্বাস্থ্যে একশ্রেণির নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন, যাহারা মুখে বলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করিতে হইবে; কিন্তু তাহাদের অন্তরে শুধুই দুর্নীতির বিষবাষ্প! জনবল নিয়োগে উদ্যোগ শুরু হইলে সেইখানেও দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ হাতাইয়া লইবার অভিযোগ পাওয়া যায়। সৃষ্টি করেন প্রতিবন্ধকতা। মুখে সততার কথা বলিলেও কাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম করিয়া পকেট ভারী করেন তাহারা। সরকারি হাসপাতাল অকার্যকর রাখিয়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক হইতে তাহাদের কেহ কেহ কমিশন পাইয়া থাকেন। তাই এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
ইহা যেন পরিকল্পিত দুর্নীতি! কেহ কি নাই—যিনি শক্ত হাতে রাশ টানিয়া ধরিবেন এই সকল দুর্নীতির, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং পুকুরচুরি? মনে রাখিতে হইবে, যতই পরিকল্পিতভাবে ও বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করিয়া দুর্নীতি করা হউক না কেন—শত শত দিন নির্ঝঞ্ঝাটে পার করিতে পারিলেও যেই দিন তাহারা ধরা পড়িবে, সেই দিন হইতে তাহাদের সকল অপরাধের মাশুল সুদে-আসলে দিতে হইবে। নিরন্তর অপরাধ করিয়া কেহ কি পার পাইয়াছে কখনো? বিলম্বে হইলেও কেহই তাহার অপরাধ হইতে নিষ্কৃতি পায় না—ইহা যেন দুর্নীতিবাজ অসাধুচক্র ভুলিয়া না যায়।
