মানুষের যেমন চিরটা কাল এক রকম যায় না, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এই ভাঙাগড়া আমরা নিত্য দেখিয়া থাকি। সম্প্রতি দেখিতেছি মহামারি কোভিড-পরবর্তী অস্থিরতা এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের যৌথ জাঁতাকলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দমবন্ধ অবস্থা। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই প্রসঙ্গে চমৎকার করিয়া বলিয়াছেন—‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে/ এই তো নদীর খেলা রে ভাই/ এই তো বিধির খেলা/ সকাল বেলার আমির রে ভাই/ ফকির সন্ধ্যাবেলা।’ আমরা অবশ্য স্বাধীনতার সময় অর্থাৎ সকালবেলায় ফকির ছিলাম; কিন্তু সেই ফকিরিদশা আমরা ক্রমশ কাটাইয়া উঠিতেছিলাম। কোভিডের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দেশকেই টপকাইয়া গিয়াছিল।; কিন্তু ঈশানকোণে নূতন করিয়া মেঘ জমিয়া উঠিতেছে। ইহা নূতন ধরনের মেঘ। ইহাকে সামলাইবার শক্তি পৃথিবীর অনেক দেশেরই নাই। অর্থনৈতিক বিপদের সময় সর্বাগ্রে যাহা করিতে হয়, তাহা ইংরেজরা প্রবাদের মাধ্যমে বহু পূর্বে বলিয়া গিয়াছেন। তাহা হইল—কাট ইওর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইওর ক্লথ। সহজ বাংলায়—আয় বুঝিয়া ব্যয় করো। সময়টা এখন কৃচ্ছ্রসাধনের, সংযমের, পরিমিতিবোধের।
সাধারণ মানুষ ভালো নাই, তাহারা নিদারুণ কষ্টের মধ্যে রহিয়াছেন; কিন্তু সমস্যাটি বৈশ্বিক। কোভিডের প্রবল অভিঘাত যাইতে না যাইতেই ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ সমগ্র বিশ্বকে টালমাটাল করিয়া দিতেছে। এই যৌথ অভিঘাতের প্রবল ধাক্কা আমাদের উপরও আসিয়া পড়িয়াছে। জনগণ এইটুকু বুঝে; কিন্তু ইহার সহিত জনগণ ইহাও বুঝে যে, তাহাদের কষ্টের জন্য কেবল কোভিড কিংবা যুদ্ধ দায়ী নহে। শুধু এই দুইটি কারণে তাহারা কষ্টে থাকিলে সাধারণ জনগণ ইহা মানিয়া লইত, তাহারা কষ্ট স্বীকার করিয়া লইত; কিন্তু জনগণ দেখিতেছে, এক শ্রেণির লোক দুর্নীতি আর অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বানাইয়াছে। এই নব্য ধনিক শ্রেণি করোনার সময়ও ধান্ধা করিয়াছে, যুদ্ধের খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও আলুপোড়া খাইয়াছে। এই বাস্তবতায় জনগণ তাহার কষ্ট মানিয়া লইতে পারে না।
গত ৫১ বৎসরে হাজার হাজার নব্য লুটেরা তৈরি হইয়াছে। পরাধীনকালে এই জনপদে কয়েক জন মাত্র বিদেশি লুণ্ঠনকারী ছিলেন; কিন্তু এখন শত শত স্বদেশি লুণ্ঠনকারী সৃষ্টি হইয়াছে। দেখা যাইতেছে, প্রায় প্রতিটি খাতে এক বা দুই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রিত হইতেছে। ফলে বাজারব্যবস্হায় কোনো প্রতিযোগিতা থাকিতেছে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্সের তৈরি প্রতিবেদনটির নাম ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮’ হইতে জানা গিয়াছিল, ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হিসাবে সকল দেশের উপরে অবস্থান করিতেছে বাংলাদেশ। ইহাদের সংখ্যা বাড়িয়াছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে।
কিন্তু দিন কখনো একরকম থাকে না। ইহা বিশ্ব ইতিহাসে বারংবার দেখা গিয়াছে। আঠারো শতকে ফরাসি বিপ্লব ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তদানীন্তন ফ্রান্সের শত শত বৎসর ধরিয়া নির্যাতিত ও বঞ্চিত ‘থার্ড স্টেট’ বা সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই বিপ্লবের পূর্বে সমগ্র ফ্রান্সের ৯৫ শতাংশ সম্পত্তির মালিক ছিল মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ। অথচ যাহারা আয়কর দিত তাহারা তেমন কোনো সুযোগ ভোগ করিতে পারিত না। এই ব্যবস্হার বিরুদ্ধে যাহারা প্রতিবাদ করিত—তাহাদের বাস্তিল দুর্গে বন্দি করিয়া নির্যাতন করা হইত। অতঃপর ঘটিয়াছিল ফরাসি বিপ্লব—যাহার অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতেও দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্রীয় অপচয় ও দুর্নীতির লাগামও যতটা আশা করা হইয়াছিল, ততখানি টানিয়া ধরা সম্ভব হয় নাই। আমাদের বৃহত্তর অর্জনের দিকে অগ্রসর হইতে হইলে এই সকল ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হইবে। না হইলে বর্তমান সময়ের ‘সকালবেলার অর্জন’ পরবর্তী সন্ধ্যাবেলায় ভিন্ন রূপ ধারণ করিতে পারে। নজরুলের কবিতার মতো ‘সকালবেলার আমির রে ভাই/ ফকির সন্ধ্যাবেলা’র মতো অবস্হা যেন আমাদের না হয়।
