শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় যা করা প্রয়োজন

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২২, ০৪:০২

পৃথিবীতে একমাত্র মহান পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। অন্য কোনো পেশাতে ‘মহান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। ভৌগোলিক অঞ্চল এবং দেশ জাতি ভেদে শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মান আলাদা এবং উচ্চ পর্যায়ের। পৃথিবীর অনেক দেশ রয়েছে যেখানে শিক্ষকের মর্যাদা যেমন ওপরে, তেমনি তাদের বেতন স্কেলও আলাদা। যাঁরা শিক্ষকতা পেশায় আসেন তাঁরা পেশাটিকে মহান পেশা ভেবে সুশিক্ষিত জাতি গঠনে দায়িত্ব পালন করার মানসিকতা নিয়েই আসেন।

আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্হান এবং প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে শিক্ষকের বেতন কম এবং সামজিক মর্যাদা যেহেতু আর্থিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়, সেহেতু শিক্ষকরা খুব বেশি সামাজিক মর্যাদা পান না। শুধু এ কারণেই মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না। যাঁরা আসেন তাঁরা একরকম বাধ্য হয়ে আসেন। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। শিক্ষকতার মতো মহান পেশাটির ব্রতই হচ্ছে নীতি ও নৈতিকতার মধ্যে থেকে জাতিকে সুশিক্ষিত করা এবং দেশ গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখা। একটা সময় শিক্ষকরা দায়িত্ব নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা করাতেন এবং প্রয়োজনে শাসনও করতেন নিজের সন্তানের মতো। এ কারণে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কও ছিল গুরু-শিষ্যের মতো। ছাত্রছাত্রীদের ভালোমন্দ বিষয়গুলো বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন এবং দায়িত্বও পালন করেছেন এবং এখনো অনেকে করে থাকেন। ছেলেমেয়েরাও শিক্ষকদের কথা শুনে শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি নীতি ও নৈতিকতাবোধের মাধ্যমে নিজেদের তৈরি করে। অভিভাবকরাও শিক্ষকদের সম্মান করেছেন শ্রদ্ধার সঙ্গে। 

কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক দ্বারা ছাত্রছাত্রীদের শাসন করা যাবে না—সরকার কতৃ‌র্ক এই নীতিমালা গৃহীত হওয়ার পর বদলে যেতে থাকে অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের আচরণ। এখন এমন হয়েছে—ছাত্রছাত্রী অন্যায় করলে বা পড়ালেখা না করলেও কিছুই বলা যায় না। দুই-চার জন শিক্ষক এখনো বিবেকের তাড়নার শাসন করেন বা করে থাকেন। ঢাকার আশুলিয়ার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উত্পল কুমার সরকার বিবেকের তাড়নায়ই হয়তো ছাত্রটিকে শাসন করেছিলেন। কিন্তু কী নির্মম পরিণতি হলো! তাঁরই ছাত্রের হাতে তাঁকে জীবন দিতে হলো। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি শিক্ষকও তাকে প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারেনি। এর জন্য দায়ী কে? শিক্ষকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, শিক্ষকের শরীরে আঘাত করে কেউ কখনো ভালো করেছে এমন নজির একটিও নাই।

শিক্ষকের শাসন করা উঠিয়ে দেওয়া, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অতি আদর, সন্তানকে সামনে রেখে শিক্ষকের প্রতি অভিভাবকের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আচরণ এবং সোশাল মিডিয়ার আগ্রাসী নেতিবাচক প্রভাব ছাত্রছাত্রীদের তাদের আদর্শিক জায়গা থেকে বিচু্যত করছে। ফলে ঘটছে শিক্ষকের প্রতি অসম্মান এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা। এসবের পরিত্রাণ হওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মনিটরিং সেল থাকা জরুরি। ছাত্রছাত্রীদের ভালো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার জন্য এবং উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করে গড়ে তোলার জন্য ইতিবাচক মোটিভেশন প্রয়োজন। অপরাধে জড়িত ছাত্রছাত্রীদের শাসন ও বিচার করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে কমিটি থাকা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষিত ও সমাজ সচেতন মানুষদের নিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাববলয় মুক্ত হওয়া দরকার। তবেই হয়তো শিক্ষকরা নির্বিঘ্নে কাজ করে যেতে পারবেন। দেশ ও জাতি গঠনে যেহেতু শিক্ষকরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন সেহেতু দেশের প্রয়োজনে সুশিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষকের মর্যাদা ধরে রাখা প্রয়োজন। অন্যথায় জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন