বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২২, ০৪:৩৪

ঢাকা নামের এ শহর সিংহভাগ মানুষের শুধুই প্রয়োজনের ঠিকানা। প্রিয়জনের স্নিগ্ধ উষ্ণতার হাতছানিকে পাশ কাটিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে বসবাসের কারণে অনেকের কাছে কখনো এ শহর সেভাবে নিজের হয়ে ওঠে না। নানা কারণে বেশির ভাগের পক্ষে সম্ভবও হয় না নিজের আপন ঠিকানা করে নেওয়ার। ঠিকানা হয় জীবিকার পাশাপাশি নিজের কিংবা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সোনালি দিনের প্রত্যাশায়। ফলে মাথার নিচে ছাদের সংস্হান বাধ্যতামূলকভাবেই হয় ভাড়াবাড়িতে। সেখানেও থাকে নানা বিপত্তি। পছন্দের এলাকা, আর পছন্দের বাসা মেলাটা কমবেশি সবার জন্যই কঠিন কাজ। কারণ এর সঙ্গে থাকে সামর্থে্যর বিষয়টাও। অসংখ্য মানুষ এভাবে পারা না পারার আক্ষেপ নিয়েই বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছেন রাজধানীতে। এভাবে নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে বসবাস করা এলে কতটা সুখের সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েক বছর আগের জরিপের হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশের শতকরা ২৮ ভাগ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে কম। মাত্র তিন ভাগ। তবে শহরাঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকায় এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রাজধানীর মোট জনসংখ্যার হিসাবে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ লোক ভাড়াবাসায় থাকেন। কোনো বিকল্প না থাকায় এটাই একমাত্র উপায় তাদের জন্য। অন্য এক জরিপ বলছে, গত ২৫ বছরে রাজধানীতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অর্থাত্ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। অথচ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি বারবার সামনে আসলেও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির খবর সেভাবে সামনে আসে না। বরং আড়ালে থেকে যায় বারবার। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটা সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিই অস্বস্তির। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ সেভাবে কথা বলতেও আগ্রহী নয়। অথচ যারা ভাড়া বাসায় থাকেন প্রত্যেকে এর ভুক্তভোগী। এর জন্য বিভিন্ন সময়ে তাদের পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনার। অথচ এমন নানা বিড়ম্বনাকে সঙ্গী করে তারা চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনযাত্রা।

সহজ কথায় ভাড়াবাড়িতে থাকা মানেই নানা দিকের বিড়ম্বনা। কিন্তু বাস্তবতার প্রয়োজনে নানা বিড়ম্বনাকে সঙ্গী করে থাকছে নগরবাসী। এসব বিড়ম্বনার মধ্যে রয়েছে বছর না ঘুরতেই বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া, বাড়ির মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী ভাড়াটিয়াকে বিনা নোটিশে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা, ভাড়া নেওয়ার সময় করা চুক্তির শর্ত না মানাসহ আছে নানা হয়রানি। অথচ ভাড়াটিয়াদের অজ্ঞতাকে এক্ষেত্রে খানিক দায়ী করা যেতে পারে। কারণ তারা অবগত নন, ‘বাড়ি ভাড়া দেওয়া এবং নেওয়া সংক্রান্ত একটি আইন আছে দেশে। এমনকি বাড়িওয়ালারা হয় ওয়াকিবহাল নয়, না হয় থোড়াই কেয়ার করেন। ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ নামের এই আইন সম্পর্কে অজ্ঞতায় স্পষ্ট হয় উভয় পক্ষের সচেতনতার অভাব। ইচ্ছে করে অমান্যের দলটাও কম ভারী নয়। আর এই না জানার সুযোগটাই নিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা।

‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’-এর আলোচনার পূর্বে এখানে একটু জেনে রাখা দরকার বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রথম জারি করা হয় ১৯৬৩ সালে। এরপর বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন করা হয় ১৯৯১ সালে । ১৯৯১ সালের এই আইনে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু বিষয় রয়েছে বাড়িভাড়া দেওয়া এবং নেওয়ার ক্ষেত্রে। যেমন—আইন অনুযায়ী বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে একটি লিখিত চুক্তিনামা থাকতে হবে। যেখানে উভয় পক্ষের স্বাক্ষর থাকবে। আর সেই লিখিত চুক্তিতে উল্লেখ থাকবে—চুক্তিনামায় ভাড়ার মেয়াদ, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার নাম, ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বর, ভাড়ার পরিমাণ, বিদু্যত্ বিল, পানির বিল, গ্যাস বিলসহ অন্যান্য আরো নানা প্রয়োজনীয় বিষয়। এবং এখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে বিদু্যত্ বিল, পানির বিল ও গ্যাস বিল কে পরিশোধ করবে। এছাড়া বাড়ির অবস্হান ও সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে কত জামানত হবে সেটাও এই লিখিত চুক্তিনামায় উল্লেখ থাকতে হবে। আর এই চুক্তিনামা অবশ্যই দলিল হিসেবে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করতে হবে। কিন্তু এমন আইন মেনে কত জন বাড়িভাড়া দেন বা নেন সেটা বলা মুশকিল। তবে সংখ্যাটা যে হাতে গোনা যাবে, তা অন্তত বলা যায়।

এখানে আরো কিছু নিয়ম বা আইন রয়েছে, যা হয়তো আমরা জানি না। বিষয়টি ভাড়া পরিশোধসংক্রান্ত। আমরা সাধারণত সরাসরি বাড়িওয়ালার হাতে ভাড়া দিয়ে দিই। এর বিনিময়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। কখনো আবার রশিদ দেওয়া হলেও সেখানে ভাড়ার পরিমাণ উল্লেখ থাকে না। অথচ, ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী এক্ষেত্রে রশিদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে আমরা এটা করি না। এছাড়া প্রতিনিয়ত আরো একটি সমস্যার সম্মুখীন আমরা হয়ে থাকি; আর হলো ভাড়া বৃদ্ধি। বাড়ির মালিক নানা অজুহাতে তার ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি করেন। যার শিকার ঢাকা শহরের প্রায় প্রত্যেক ভাড়াটিয়া। বিশেষ করে নতুন বছরের শুরুতে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আইনে স্পষ্ট রয়েছে বাড়িওয়ালা চাইলেই ভাড়া বাড়াতে পারেন না। সাধারণত দুই বছরের কম সময়ে বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। এই সময়ের পর বাড়াতে হলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে আপসে নির্ধারিত হবে। এ ভাড়া নিয়ন্ত্রকও নির্ধারণ করে দিতে পারেন। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অগ্রিম নেওয়া। ১৯৯১-এর ১০ ও ২৩ ধারা মোতাবেক বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই বাড়ির মালিক তার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম বাবদ এক মাসের বাড়িভাড়ার অধিক কোনো প্রকার ভাড়া, জামানত গ্রহণ করতে পারবেন না।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছু কিছু মেরামতের কাজ বাড়িওয়ালা করতে চান না। বাড়িওয়ালা চাইলেই ভাড়াটিয়াকে অন্যায়ভাবে বাসা থেকে বের করে দিতে পারেন না। এটাও চুক্তিনামার মধ্যে উল্লেখ থাকতে হবে। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয়কে বাসা ছাড়ার কমপক্ষে দুই মাস আগে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ; সেটা হলো, চুক্তিনামা নবায়ন। মেয়াদ শেষে সেটা করা বাধ্যতামূলক। ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী ২৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া হলে তা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের জন্য ২০০৮ সালে সিটি করপোরেশন ঢাকা মহানগরকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ সম্ভাব্য বাড়িভাড়ার তালিকা করে।

লেখক: সাংবাদিক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন