রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভারত

দুর্নীতির লজ্জায় ডুবছে বাঙালি, কোন পথে রাজনীতির শুদ্ধিকরণ?

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২২, ২১:৩৯

দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দল ও সরকারের সব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। অভিযুক্তকে সরালেই রাজনীতির শুদ্ধিকরণ সম্ভব? এই সঙ্কট থেকে বাঙালির উত্তরণ হবে কোন পথে? 

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের মতো এত বড় মাপের দুর্নীতি বাংলার মানুষ দেখেননি। এসএসসি দুর্নীতি মামলায় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তার। তার ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে দফায় দফায় উদ্ধার ৪০ কোটির বেশি নগদ টাকা, গয়না। খোঁজ মিলেছে অন্যান্য সম্পত্তির। গ্রেপ্তারের ছয়দিন পর পার্থকে মন্ত্রিত্ব ও দলের সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এত টাকা উদ্ধার, তার আগে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ কি একজন ব্যক্তির অপসারণে মুছে ফেলা যায়? নাকি এভাবে শুদ্ধিকরণের প্রয়াস সফল হতে পারে?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেদুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। সাড়ে তিন দশকের বাম আমলে অনিয়মের অভিযোগ বারবার উঠেছে। তবে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি এমন অভিযোগ ও বিপুল টাকা উদ্ধার বাংলার মানুষের কাছে অভূতপূর্ব।প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রাক্তন অধ্যক্ষ, প্রবীণ শিক্ষাবিদ অমল মুখোপাধ্যায় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুধু একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে কিছু হবে না। ওই বিপুল পরিমাণ টাকা দলের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এজন্য সারা দেশের সামনে লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে।''

অথচ সারা দেশের সামনে বাংলা ছিল রোল মডেল। আঠারো, উনিশ শতকে রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দের জীবন ও কর্মের কেন্দ্রে ছিল পরার্থপরতার ভাবনা। কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করতে রাজি নন বিদ্বজ্জনেরা। সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা সামনে অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। আমাদের মূল্যবোধ ভোঁতা হয়ে গিয়েছে।আমাদের রাজনৈতিক নেতারাই এটা করেছেন।আমাদের বেড়ে উঠতে দেয়নি, ভিক্ষুক বানিয়েছে।হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলছে ভোট দাও।''

যদিও বাম আমলে এমন ধারণা জনমানসে গড়ে উঠেছিল, মহাকরণ থেকে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য টাকা দিতেই হবে।সেই বাম শাসনের অবসানে বিদ্বজ্জনেরা পথে নেমেছিলেন। তাঁদের অন্যতম চিত্রশিল্পী সমীর আইচ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ছোট-বড় সব নেতা এমনই দুর্নীতিগ্রস্ত। কয়েকটা প্রজন্ম এ জন্য শেষ হয়ে যাবে। আমরা আর সন্তানদের এটা বলতে পারব না চুরি বা অন্যায় করা মহাপাপ।'' 

বামফ্রন্টের জমানায় একাধিকবার বড় শরিক সিপিএম শুদ্ধিকরণের ডাক দিয়েছে।কিন্তু সংশোধনের চেষ্টা পার্টি দলিল ও চিঠিতে সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।বামেদের ক্ষেত্রে নিচুতলায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠত, শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আঙুল উঠত কম।তৃণমূলের শাসনে শীর্ষ নেতৃত্বই অভিযুক্ত।অভিনেতা বাদশা মৈত্র ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুদ্ধিকরণ তখনই সম্ভব, যখন উপরতলার নেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে। তারা স্বচ্ছ না হলে নিচুতলার কর্মীরা কী করে দুর্নীতিমুক্ত হবেন। এই বড় সংখ্যক কর্মীরা নেতাকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করবেন।''

গত ১১ বছরের তৃণমূল শাসনে বার বার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বিদ্ধ হয়েছেন শীর্ষ নেতারা। সারদা, রোজ ভ্যালি-সহ একাধিক চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি, নারদ স্টিং অপারেশন মামলায় শাসক দলের নেতারা মূল অভিযুক্ত। সব অতীতকে ছাপিয়ে গিয়েছে চলতি নিয়োগ দুর্নীতি মামলা। প্রবীণ শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শাসক দলে দুর্নীতি আছে, আমরা জানি। কিন্তু সেটা যে এত বড় আকারে, তা আমাদের ভাবনায় ছিল না। বাংলার শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতির একটা সম্মান ছিল সারা দেশে, সেটা ধুলোয় মিশে গেল।'' 

আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রসঙ্গও।  বিরোধীদের মুছে দিয়ে একাধিপত্য কায়েম করায় অভিযুক্ত ছিল সিপিএম। বাম আমলে মেদিনীপুরের তপন ঘোষ, শুকুর আলি থেকে উত্তর ২৪ পরগনার মজিদ মাস্টাররা বছরের পর বছর এলাকায় দাপট দেখিয়েছেন। এখন সেই অভিযোগ উঠছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।  মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ক্ষমতা হাতে থাকলেই তার সঙ্গে দুর্নীতির যোগ গড়ে ওঠে। প্রোমোটার থেকে শুরু করে নানা গোষ্ঠী ওই ক্ষমতাকে ঘিরে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করে। ফলে ক্ষমতা ক্রমে দুর্নীতির পাঁকে ডুবে যায়।''

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ভারতের স্বাধীনতার আগে বলেছিলেন, যাঁরা জনপ্রতিনিধি হবেন, তাঁদের যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি না থাকে।আজকের পৃথিবীতে এ কথা অলীক বলে মনে হতে পারে। দুর্নীতির প্রতি জনমানসের দৃষ্টিভঙ্গিও কি বদলে যায়নি? অভিযুক্ত হলেও তৃণমূলের নেতারা বিপুল জনসমর্থন পেয়েছেন।  তাই শেষ বিচারে শুদ্ধিকরণের দায় জনতাকেই নিতে হবে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। পবিত্র সরকারের মন্তব্য,  ‘‘মানুষকে বিচার করতে হবে আমরা কাদের সমর্থন করছি। তৃণমূলের মধ্যেও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ থাকতে পারেন, তাদেরও ভেবে দেখতে হবে। সমীর আইচের মতে, ‘‘জনতাকে পথে নামতে হবে। একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। নইলে আরো অন্ধকার দিন আসছে। তার কোনো ইঙ্গিত কি পাওয়া যাচ্ছে? স্বপ্নময় চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘উত্তরণের পথ আমার জানা নেই। আমি শুধু দেখছি, একটা প্রজন্ম পঙ্গু হয়ে গেল, আমরা খারাপ আছি। ক্রমশ আরো খারাপের দিকে যাব।'' 

 

ইত্তেফাক/এসআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পাকিস্তানে সেনা চৌকিতে হামলা, নিহত ২ 

ভরা আদালতে স্ত্রীকে গলা কেটে খুন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই: ইমরান খান 

আদিত্যনাথকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ভারতের আপত্তির পরও চীনা ‘গোয়েন্দা’ জাহাজ নোঙরের অনুমতি দিলো শ্রীলঙ্কা

দেশভাগে ঘরছাড়া, ৭৫ বছর পর পাকিস্তানে ফিরলেন বৃদ্ধা 

ভারতে হুমকি-চাঁদাবাজি করে পাকিস্তানে ৩ কোটি রুপি পাচার  

অনুব্রত মন্ডলের উত্থানের চমকপ্রদ কাহিনি