বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ২ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘চোরের মায়ের বড় গলা’

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২২, ০১:৫৪

‘চোরের মায়ের বড় গলা/ নিত্য দেখায় ছলাকলা,/ চোরকে নিয়ে বড়াই করে/ চোরের জন্য লড়াই করে।’ আমাদের দেশে চোরের মায়ের গলাটা একটু বড়ই হয়। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে একটা কৌতুক বলে নেওয়া যাক। ছেলেকে নিয়ে চিড়িয়াখানা দেখতে গেলেন বাবা। ঘুরতে ঘুরতে একটি প্রাণীর সামনে দাঁড়িয়ে ছেলে বলল :আব্বু, দেখ দেখ, ঐ যে একটা চোরের মা।

বাবা : ধুর বোকা! চোরের মা কোথায়?

ছেলে : ঐ যে লম্বা গলার যেটা।

বাবা : ওটা তো একটা জিরাফ।

ছেলে : কেন? কালই তো তুমি পড়ালে :‘চোরের মায়ের বড় গলা।’

এর যুক্তিসংগত কারণও আছে। আমাদের দেশে আমলা-মন্ত্রী-এমপি-ব্যবসায়ী ছাড়া আর কেউই চুরি করাকে ভালো কাজ মনে করে না। এমনকি চোর নিজেও তা মনে করে না। তার পরও অভাবের তাড়নায় কিংবা স্বভাবের কারণে অথবা সঙ্গদোষে কেউ কেউ চোর হয়। চুরি করে। কিন্তু আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ চোরের বা চুরির বিপক্ষে। নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, মূল্যবোধ, যুক্তি, আইন কোনো কিছুই চোর বা চুরির পক্ষে কথা বলে না। সে ক্ষেত্রে গলা বা গলাবাজিই হয় চোর বা চোরের আত্মীয়স্বজনের একমাত্র ভরসা। নিজেদের অপরাধ ঢাকতে তাদের উচ্চ স্বরে চেঁচাতে হয়। নিজে যে ভালো, তা চেঁচিয়ে জানাতে হয়। গলা ছাড়া চোর বা চোরের মায়ের আসলে অন্য কোনো অবলম্বন বা সম্পদ নেই। কাজেই যারা চড়া গলায় কথা বলে, তাদের সাধুতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। আমাদের দেশে অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের ভালোমানুষি জাহির করতে বেশি বেশি তৎপর হয়। এ পরিস্থিতিতে যখন কেউ বড় গলায় ভালো ভালো কথা, নিজেদের সাধুতা ও অন্যের দোষের কথা বলে, তখন সন্দেহ জাগে, এই বড় গলাধারী চোর নয়তো?

আসলে প্রবাদ-প্রবচনে ফুটে ওঠে কোনো জাতির স্বভাব-চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। আমাদেরটাও খুঁজে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রবাদ-প্রবচনে। চোর নিয়ে আমাদের দেশে অনেক রকম প্রবাদ-প্রবচন আছে। ‘চোরের মায়ের বড় গলা’, ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’, ‘চোরের সাক্ষী মাতাল’, ‘যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর’, ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’, ‘চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা’, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’ ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা’ এই প্রবাদটি অন্য কোনো ভাষায় আছে বলে মনে হয় না। আর এ কথাও কবুল করা ভালো যে, এই বিদ্যায় কোনো কোনো বাঙালির ব্যুৎপত্তি প্রশ্নাতীত। বাবার পকেটের টাকা, প্রতিবেশীর গাছের আম-জাম-পেয়ারা-লিচু দিয়ে শুরু হলেও বাঙালি পুকুরচুরিতেও পাকা। চুরির বস্তু হিসেবে পুকুরও এখন বড় কিছু নয়। খালবিল, হাওর-বাঁওড়, বনভূমি, নদী ও পাহাড় পর্যন্ত চুরি হচ্ছে। সোনাদানা তো অতি ছোট বস্তু। তবে আমাদের দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি যা চুরি হয় তা হলো টাকা। অবশ্য চুরি না বলে একে ‘হাতিয়ে নেওয়া’ বলাই ভালো। এর কারণ কী? এর সহজ উত্তর হচ্ছে, চোরের টাকা নেই বলেই চুরি করে! তবে সব চোর যে টাকা নেই বলেই চুরি করে তা কিন্তু নয়। অনেকেই আছে, চুরি করা যাদের স্বভাব। চুরি ছাড়া যারা থাকতে পারে না। ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে চুরি, শেয়ারবাজারে কারসাজি করে চুরি, আমদানি-রপ্তানির নামে চুরি—এমন নানাবিধ চুরি আছে।

চুরি অবশ্য আমাদের দেশে এক অতিপ্রাচীন ব্যাধি। তবে ছিঁচকে চুরি থেকে পুকুর-সমুদ্র চুরি বা যে চুরিই হোক, নিরাপদে সারতে পারাটাও একটা বড় কৃতিত্ব। পুকুরচুরি, অর্থাৎ বড় ধরনের চুরি—এই যেমন রাষ্ট্রীয় কোটি টাকা পাচার কিংবা লাখ টাকা ঘুষ বাবদ গ্রহণ করলে তিনি গণমাধ্যমে আলোচিত বা ‘হিরো’ হয়ে যান। দিনের পর দিন তাকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। আলোচনা হয়। সে তুলনায় ছোটখাটো চোরেরা অনালোচিত থেকে যায়। তাদের খোঁজ নেয় না কেউ। সাধারণ জনগণ দুই-একটি চড়-থাপ্পড়-লাথি দিয়ে বিদায় করে দেয়। ভাগ্য খারাপ হলে হয়তো কিছুটা বেশি শাস্তিও পেতে হয়!

চুরি আসলে এক ‘চমৎকার’ আর্ট। অনেকেই এই ‘আর্ট’ চর্চা করে। কিন্তু ধরা পড়ে খুব কম জনই। আর এর সুবিধা হলো, ধরা না পড়া পর্যন্ত কাউকে চোর বলাও যায় না! চুরিটা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এমনভাবে মিশে গেছে, এ নিয়ে কেউ তেমন আর মাথা ঘামায় না। তবে মাঝেমধ্যে দুই-একটি বড় চুরির ঘটনা ধরা পড়ে বা উদ্ঘাটিত হয়। তখন আমরা খানিকটা হইচই করি। ধর্মের বাণী স্মরণ করি। ব্যস। তারপর যেই লাউ সেই কদু। আমরা আবার চুরির মওকা খুঁজি। চুরিবিদ্যার চর্চা অব্যাহত রাখি। আমাদের দেশে চুরি-চামারি করে মিলিওনিয়ার হয়েছে এমন মানুষ একেবারে কম নয়। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ নানা দিক থেকেই অনন্য, অসাধারণ। চুরি করে বড়লোক হওয়ার মতো এমন সুন্দর অনুকূল পরিবেশ পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে বলে মনে হয় না। তাই তো এখানে কমবেশি সবাই বড়োলোক হওয়ার বাসনায় চুরি করেন। ঘুষ খান, দুর্নীতি করেন।

অবৈধ পন্থায় ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে আমাদের দেশে টাকা উপার্জন অনেকেই করেন। শত শত হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তাদের মধ্যে ধরা পড়ে কজন? আসলে টাকা কামাই করাটা যেমন একটা আর্ট, সেই টাকা সবার অগোচরে ‘সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ করতে পারাটাও একটা আর্ট। এই আর্ট সবাই রপ্ত করতে পারে না। এর জন্য সাধনা লাগে। দক্ষতা অর্জন করতে হয়। ম্যানেজ করতে জানতে হয়। পুকুরচুরি করে সেই পুকুর আড়াল করে রাখা বা গায়েব করে দেওয়াটা সহজ বিদ্যা নয় মোটেই। অনেকেই সেটা পারেন এবং করেন। কিন্তু আমাদের সমাজে কিছু কিছু আনাড়ি চোরও আছে। যেমন ভিজিডি-ভিজিএফের চাল ও গম চোরগণ। ‘আড়াল করার বিদ্যা’ অর্জন ছাড়াই তাদের অনেকে ধরাও পড়েন। করোনা মহামারির প্রথম দিকে অনেক চাল ও গম চোর ধরা পড়েছিলেন। এসব আনাড়ি চোরের কারণে দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়!

যারা কঠিন-কঠোর মানি লন্ডারিং আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং সরকার-প্রশাসন-গোয়েন্দা-গণমাধ্যমকে ভেড়া বানিয়ে অত্যন্ত কৌশলে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছেন, বিভিন্ন দেশে দোকান-বাড়ি-জায়গাজমি কিনছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লেখাপড়ার নামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, তারা কিন্তু চিহ্নিত হচ্ছেন না। এতে দেশের ভাবমূর্তিরও কোনো রকমফের হচ্ছে না!

কীসের রবীন্দ্রনাথ, কীসের পিকাসো, আমাদের দেশে অধরা অনির্ণীত বড় বড় চোরই প্রকৃত ‘আর্টিস্ট’। প্রকৃত শিল্পীসত্তা। অসম্ভব শিল্পিত কায়দায় যারা ব্যাংক থেকে, শেয়ারবাজার থেকে, বিদ্যুৎ থেকে, আমদানি-রপ্তানির নামে সবার অজান্েত শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের চেয়েও যারা বেশি ক্ষমতাবান, তারাই আসলে চুরিবিদ্যার মহান সাধক।

তবে চোরকে চোর না বলাটাই ভদ্রসম্মত। কারণ চোরেরও একটা মানসম্মান আছে। চোরকে চোর না বলে ‘নিশিকুটুম্ব’ বলা যেতে পারে। যেভাবে শালাকে শ্যালক, মেথরকে নগরসুন্দর, নাপিতকে নরসুন্দর, ঝাঁটাকে সম্মার্জনী বলা হয়। তাছাড়া, চুরি করার ধরন, চোরের শ্রেণিচরিত্র, সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী তাদের গ্রেডিং করা উচিত। ছিঁচকে চোর আর বড় চোর তো এক কথা নয়!

পুনশ্চ : দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শুধু তথাকথিত ভদ্রলোকই নয়, চোরদেরও অনেক অভিযোগ আছে। গ্রামের এক কুখ্যাত চোরকে হঠাৎ করে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করতে দেখে এক মুরব্বি তাকে সুপথে ফিরে আসার জন্য আল্লাহর শোকরগুজার করতে বললেন। উত্তরে সেই প্রাক্তন চোর বলল, ‘আল্লাহর ডরে চুরি ছাড়ি নাই চাচা, গৃহস্থের ইমান নষ্ট হইয়া গেছে দেইখা চুরি ছাড়ছি।’ মুরব্বি জানতে চাইলেন, ‘এটা আবার কেমন কথা?’ চোর বলল, ‘আগে গৃহস্থের বাড়িতে চুরি করলে পুলিশের কাছে তারা চুরির সঠিক হিসাব দিত, সেই অনুযায়ী পুলিশের বখরা দিয়ে মোটামুটি চলতে পারতাম। এখন ২০ হাজার টাকার মালামাল চুরি করলে গৃহস্থ জিডি করে ১ লাখ টাকার! সেই হিসাব কইরা পুলিশ আমার কাছে টাকা চায়, না দিতে পারলে লকআপে ভইরা পিডায়! এই দুঃখে চুরি ছাড়ছি। দেশ থেকে দিনে দিনে ইমান-আমল উইঠা যাইতেছে, চাচা!’

লেখক : রম্য লেখক

ইত্তেফাক/ইআ