বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঐক্যই উন্নয়নশীল বিশ্বের পথ

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২২, ০২:২২

উপনিবেশ যুগে সম্পদ কাড়িয়া লওয়ার বিষয়টি ছিল সরাসরি, যাহা খালি চোখেই দেখা যাইত। অপেক্ষাকৃত আধুনিক অস্ত্র হাতে হাজার মাইল দূরে আসিয়া লক্ষ মানুষের কৃষিসম্পদ, খনিজ সম্পদ এমনকি স্থানীয় মূল্যবান শিল্পকর্মও কাড়িয়া লইত। শাসনব্যবস্থা চালু করিয়া তাহারা নেটিভদের উন্নয়নের দিকে নজর না রাখিয়া জাহাজ ভরিয়া সম্পদ পাঠাইয়া দিত তাহাদের জন্মভূমি বা নিজ দেশে। 

ভৌগোলিক ঔপনিবেশিক শাসন এই আধুনিক যুগে আর নাই; কিন্তু সম্পদ আহরণের ধারা শেষ হইয়াছে কি? বিস্ময়ের ব্যাপার হইল—বাড়িয়াছে! মাত্র ২০১৬ সালে খোদ গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি বা জেএফআই এবং নরওয়েজিয়ান স্কুল অব ইকনোমির সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড রিসার্চ যৌথভাবে গবেষণা করিয়া এক বিস্ময়কর তথ্য দিয়াছে। তাহারা দেখাইয়াছে, ধনী দেশ হইতে উন্নয়নশীল দেশে এক বৎসরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার প্রবেশ করিয়া থাকে, যাহার মধ্যে নানা ধরনের সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে উন্নয়নশীল দেশ হইতে ধনী দেশগুলিতে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বাহির হইয়া যাইতেছে। আরো বড় হতাশাজনক হিসাব হইল, তাহারা দেখাইয়াছে, কেবল ২০১২ সালেই মিসইনভয়েসিং বা ভুল চালানের কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বকে ৭০০ বিলিয়ন ডলার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে। যে সম্পদ উন্নয়নশীল বিশ্ব হইতে শক্তিশালী দেশগুলিতে যাইতেছে তাহার মধ্যে জ্বালানি, কয়লা, সোনাসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ প্রধান। এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানদ্বয় মন্তব্য করিয়াছে: Rich countries are not developing poor countries; poor countries are developing rich ones.. অর্থাৎ ধনী দেশগুলি দরিদ্র দেশের উন্নয়ন করিতেছে না; দরিদ্র দেশই ধনী দেশের উন্নয়ন ঘটাইতেছে।

সুতরাং শক্তিধর দেশগুলির স্মরণে রাখা উচিত, তৃতীয় বিশ্বের কাঁচামাল দিয়াই তাহাদের এই উন্নয়ন। তাহারা উন্নয়নশীল বিশ্বের কাঁচামাল লইয়া তাহাদেরই আবার ক্লায়েন্ট বানাইয়া চলিয়াছে। যেহেতু উন্নয়নশীল দেশগুলির ক্রয়ক্ষমতা সীমিত, সেই সুযোগেই এই আধুনিককালের আধুনিক শোষণ চলিতেছে। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলি জানে না যে, তাহাদের কাঁচামাল তাহাদের শক্তি, তাহাদের অস্ত্র হইতে পারে। অথবা জানিয়াও তাহারা অসহায়ের মতো তাকাইয়া থাকে। কারণ তাহাদের মধ্যে ঐক্য নাই। যদি শক্ত ঐক্য গড়িয়া তোলা যাইত তাহা হইলে অবশ্যই এই শোষণের মুখে পড়িতে হইত না বরং যথাযথভাবে মূল্যায়িত হইত। 

আমরা লক্ষ করিতেছি, বিশেষ করিয়া নূতন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে (রাশিয়া, ইউক্রেন তথা ন্যাটো) শক্তিশালী দেশগুলির সকল প্রকারের কাঁচামালের ক্ষুধা আরো বাড়িয়াছে। শক্তিশালী দেশগুলি এখন জ্বালানি এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদের জন্য আরো মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। তাহারা আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলিতে জোরালো পদচারণা বৃদ্ধি করিয়াছে। উৎস খুঁজিয়া চলিয়াছে রিসোর্সের জন্য। বিশেষ করিয়া জ্বালানির জন্য। কারণ এখনো বিশ্ব জ্বালানির উপর প্রায় শতভাগ নির্ভরশীল। জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা বন্ধ হইয়া যাইবে। বিশ্বব্যাপী ইতিমধ্যে জ্বালানির জন্য হা-হুতাশ শুরু হইয়াছে। এই ত্রাহি অবস্থা শক্তিশালী দেশগুলির জন্য আরো তীব্র। তাহারা যে কোনো উপায়ে উন্নয়নশীল বিশ্ব হইতে জ্বালানিসহ কাঁচামাল আমদানিতে আরো মরিয়া হইয়া উঠিবে ইহা স্বাভাবিক জ্ঞানেই অনুমেয়। এই অবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রয়োজন ঐক্য। উন্নয়নশীল দেশগুলি একটা ঐক্যে পৌঁছাইতে পারিলে শত শত বছরের শোষণের অবসান হইতে পারে। আর তাহাদের মধ্যে ঐক্য তৈরি না হইলে পুরাতন পথেই হাঁটিতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন