রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এম এ ওয়াদুদ সোনার বাংলা গড়ার একনিষ্ঠ সংগঠক 

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ০৬:২৮

এম এ ওয়াদুদ ছিলেন ক্ষমতা ও পদ-পদবির লোভহীন দেশপ্রেমিক সংগঠক। যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি। মো. জিল্লুর রহমান লিখেছেন, ‘১৯৫৪ সালের নির্বাচনে শেরেবাংলা-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট ওয়াদুদ সাহেবকে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিল। যুক্তফ্রন্টের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ওয়াদুদ সাহেবকে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন, আমরা ও তার সহকর্মীরাও তাকে অনুরোধ করেছিলাম; কিন্তু তিনি রাজি হননি।’ এমপি বা মন্ত্রী না হলেও তার সাংগঠনিক দক্ষতাকে শাসকগোষ্ঠী ভয় পেত। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে আন্দোলন স্তিমিত করার জন্য এম এ ওয়াদুদকেও রাজবন্দি করা হয়েছিল। ক্ষমতা ও পদ-পদবির মোহ এম এ ওয়াদুদকে কখনো গ্রাস করতে পারেনি। আদর্শের সঙ্গে আপস করে তিনি মন্ত্রিত্বের পদও নেননি। 

তোফায়েল আহমেদ লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও তিনি স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনোদিন আপস করেননি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসনামলে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। ’৭৮-এ স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের প্রস্তাব তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে তার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাকে তিন বার বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।’

এম এ ওয়াদুদ গ্রেফতার হয়েছেন ১৯৪৯ সালেও। ভুখা মিছিল আন্দোলনের কারণে। ভাষা আন্দোলনের কারণে তিনি গ্রেফতার হন ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আবদুল ওয়াদুদসহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।’ ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে অর্থাত্ ১৯৫২ সালে এম এ ওয়াদুদ প্রায় ছয় মাস জেল খেটেছেন। এম এ ওয়াদুদ ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনের অন্যতম সংগঠক এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ছাত্রলীগের প্রথম এবং নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। মুসলিম ছাত্রলীগকে পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত করার লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। সে কাউন্সিলেই এম এ ওয়াদুদকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ছাত্রলীগকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। নির্মল সেন লিখেছেন, ‘এম এ ওয়াদুদ ছাড়া তখনকার ছাত্রলীগকে ভাবা যেত না। ...এই অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে ছাত্রলীগকে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রেও ওয়াদুদ ভাইয়ের অবদান ছিল বিশাল মাপের।’

১৯৪৯ সালে রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে যেসব নবীন সদস্যের সমন্বয়ে ১৫০ মোগলটুলীতে ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ গঠিত হয়েছিল এম এ ওয়াদুদ তাদের অন্যতম। তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। ১৯৪৯ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এম এ ওয়াদুদকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি (১৯৫১) ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদেরও (১৯৫২) সদস্য ছিলেন।

এম এ ওয়াদুদ ছিলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক, ইত্তেফাকের ব্যবস্হাপক। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মতে, ‘...বঙ্গবন্ধুই মওলানা ভাসানীর কাছে থেকে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের দায়িত্ব মানিক ভাইয়ের ওপর ন্যস্ত করার কথা বলেন। মানিক ভাই হন সম্পাদক এবং ওয়াদুদ ভাই প্রধান ব্যবস্হাপক। ...ওয়াদুদ ভাই ইত্তেফাকের জন্য লিখতেন, পত্রিকার সাকু‌র্লেশন ও বিজ্ঞাপন বিভাগ চালাতেন। আবার পত্রিকা বিক্রি করার জন্য রাজপথে হকারিও করতেন।’ ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘যেয়ে দেখি মানিক ভাই বসে রয়েছেন। উনি ঠিক করেছেন যাবেন না, কারণ টাকার অভাব; বিশেষ করে ইত্তেফাকের লেখা কে লিখবে, টাকা জোগাড় কে করবে? ...ওয়াদুদের ওপর সমস্ত ভার দিলেন।’ এম এ ওয়াদুদ গুছিয়ে কথা বলতেন, সম্মোহনী বক্তৃতা দিতেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতেন। তার সান্নিধ্যে যারাই গিয়েছেন, তারাই তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের রাজনীতির প্রশংসা করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাকে অনেক পছন্দ করতেন, আন্দোলন-সংগ্রামে নির্ভর করতেন। 

১৯৪৮ সালে অসুস্থ অবস্হায় ওয়াদুদ গ্রেফতার হলে, বঙ্গবন্ধু উদ্বিগ্ন হয়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে চিঠি লিখেছিলেন। ওয়াদুদও স্নেহ-ভালোবাসার মূল্য দিতেন। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্য মোগলটুলীর বাসার নিজে থাকার খাটটি ছেড়ে দিয়ে তিনি মাটিতে ঘুমিয়েছেন অনেক দিন। ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা এম এ ওয়াদুদ (১৯২৫-১৯৮৩) সময়ের প্রয়োজনে খাকি শার্ট, খাকি প্যান্ট এবং মাথায় ফৌজি টুপি পড়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, আবার সাংবাদিক ও কলমযোদ্ধা হিসেবেও ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন। আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘আবদুল ওয়াদুদ ছিলেন সেইসব মানুষের একজন যারা অন্তরের প্রেরণায় ও বিবেকের তাড়নায় নিরন্তর কাজ করে যেতেন; কিন্তু কোনো প্রতিদানের আশা করতেন না, এমনকি তার কাজের উপযুক্ত স্বীকৃতি মিলল কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হতেন না।’ তার মতো আপসহীন, ত্যাগী, নিষ্ঠাবান, দেশপ্রেমিক সংগঠক বর্তমানে বড় আকাল, ইতিহাসেও বিরল। ২০১৩ সালে তিনি (মরণোত্তর) একুশে পদকে ভূষিত হন। তার এক পুত্র ডা. জে আর ওয়াদুদ টিপু এবং এক কন্যা ডা. দীপু মনি। আজ এম এ ওয়াদুদের জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শঠতার অভিযোগ বিশ্বকে জানানো হোক

আছে খরার আঘাতও

আইনের শাসন বজায় রাখতেই হবে

মুজিব দর্শন ভক্তি প্রজ্ঞা ও যুক্তির মেলবন্ধন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে কবে? 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বোঝা নয় 

পারিবারিক সংকটে বিপদে পড়ছে শিশুরা 

‘অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়’