বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ২ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রেল ও সড়ক দুর্ঘটনার কি কোনো প্রতিকার নেই? 

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২, ০৭:০২

গত ২৯ জুলাই শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া রেল স্টেশন এলাকায় পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে নিয়ে যায় চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী ট্রেন। এতে মাইক্রোবাসে থাকা ১১ জন নিহত হন। আহত হন অনেকেই। 

জানা যায়, চলতি ২০২২ সালে এ পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় ১১৭ জনের মতো প্রাণ হারিয়েছেন। রেলক্রসিংগুলোতেই বেশি দুর্ঘটনায় প্র্রাণহানি ঘটছে। ক্রসিংগুলোতে কোনো কোনো জায়গায় পাহারাদার নেই। আবার পাহারাদার থাকলেও তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না।

রেলওয়ের সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে রেলক্রসিংকে নিরাপদ করতে ১৯৬ কোটি টাকা খরচ করেছে রেলওয়ে। দুটি প্রকল্পের আওতায় রেলের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ৭০২টি রেলক্রসিংয়ের উন্নয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৩২ জন। রেলক্রসিং উন্নয়নের মধ্যে প্রতিবন্ধক বসানো ও পাহারাদারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর পরও রেলক্রসিং নিরাপদ হয়নি। সড়কে প্রাণহানির দায়ে শাস্তির সুনির্দিষ্ট আইন আছে। কিন্তু রেলক্রসিংয়ে প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান নেই। উলটো যানবাহনের চালককে দায়ী করে রেল কর্তৃপক্ষ। বড়জোর পাহারাদারের ভুল পেলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে গতানুগতিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় সব প্রতিবেদনেরই ভাষা, সুপারিশ ও দায়ী করার পদ্ধতি একই। পাহারাদারের চাকরি স্থায়ী নয়।

যত্রতত্র রেলক্রসিং নির্মাণ বিপজ্জনক হলেও এই প্রবণতা এখনো রয়েছে। অনেক সময় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই স্থানীয় কোনো সংস্থা রেললাইন বরাবর রাস্তা নির্মাণ করে এবং কোনো প্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা না রেখেই মানুষকে যাতায়াতের সুযোগ করে দেয়। এমন অবৈধ রেলক্রসিং নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখা হয়েছে। কবে এর সুরাহা হবে এবং সমগ্র রেলক্রসিং ব্যবস্হাপনায় নিয়মশৃঙ্খলা ফিরে আসবে, আমরা কেউ তা জানি না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উচিত, অবৈধ রেলক্রসিংগুলি বন্ধ করে দেওয়া। রেলক্রসিংয়ের পাহারাদারের চাকরি স্থায়ী বা অস্থায়ী কি না, তা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। বরং বেতনভাতা পেলে দায়িত্ব কেন সুচারুভাবে পালন করবে না, সেটাই প্রশ্ন। যারা দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী, তাদের কেন দায়িত্বে রাখা হবে? এই তো গেল রেলওয়ের কথা। এবার দেখা যাক, সড়ক দুঘটনার চিত্র।

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজার ছোটবড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বিআরটিএর হিসাবে, প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০ জন প্রাণ হারায়। সে হিসাবেও বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০ জন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বছরে ১২ হাজার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০ হাজার মানুষ প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ডেলিভারিং রোড সেফটি ইন বাংলাদেশ : লিডারশিপ প্রায়োরিটিস অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভস টু ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেকাংশেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশে দুর্ঘটনাকবলিত প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে মারা যায় ১০২ জন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ভুটান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় এ সংখ্যা যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৭০, ১৩, ৪০ ও সাত জন। যদিও বাংলাদেশে প্রতি হাজারে যানবাহন আছে মাত্র ১৮ জনের। ভারতে এ সংখ্যা ১৫৯, নেপালে ৮১, ভুটানে ১০৯ ও শ্রীলঙ্কায় ৩২৭। 

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের দুর্ঘটনায় গড়ে দুই জন সাইকেলচালকের মৃত্যু হয়। দুই বা তিন চাকার মোটরযানের ক্ষেত্রে এর সংখ্যা ১১ দশমিক ২০, গাড়ি ও হালকা যানের ক্ষেত্রে ১৩ দশমিক ৩০ জন গাড়িচালক ও ২৮ দশমিক ৬০ জন যাত্রী। আবার ট্রাকচালকদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৬ দশমিক ১০, বাসচালকদের ক্ষেত্রে ৮ দশমিক ২০ বাস যাত্রীর সংখ্যা ২৮৬ দশমিক ৬০ জন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ র‍্যাংকিং অনুসারে, সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। ৬১ দশমিক ৯০ শতাংশ মৃত্যুহার নিয়ে সবচেয়ে অনিরাপদ রাস্তার তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে জিম্বাবুয়ে। অন্য দিকে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার ২ দশমিক ৩১ শতাংশ হার নিয়ে সর্বাপেক্ষা নিরাপদ সড়কের তালিকায় শীর্ষে আছে সুইডেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় বেশির ভাগ দেশের জিডিপির ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে বিশ্বের মোট সড়ক যানের ৬০ শতাংশ থাকা স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বিভিন্ন সংস্থা-মহল কর্তৃক চিহ্নিত কারণগুলো হচ্ছে—চালকের অসাবধানতা-অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, রাস্তার স্বল্পতা-অপ্রশস্ততা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল, প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা, রাস্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা, ওভারব্রিজের স্বল্পতা, সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতা, ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার ও স্থাপনা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, অতিরিক্ত মাল ও যাত্রী বোঝাই, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পথ অবরোধ-সভা ও হরতালসহ প্রভৃতি কারণে সৃষ্ট যানজটে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হওয়া, সড়ক পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থা-প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা ইত্যাদি। ২০২১ সালে সংঘটিত দুর্ঘটনার ৬২ শতাংশের কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি বলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের উপরিউল্লিখিত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়েছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সংস্থার জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২২ অক্টোবর ২০১৯ ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করেছে। সব ধরনের সাজা বাড়িয়ে নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আইনে ট্রাফিক সংকেত ভঙ্গের জরিমানা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার, হেলমেট না পরলে জরিমানা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার নির্ধারণ করেছে, সিটবেল্ট না বাঁধলে, মোবাইল ফোনে কথা বললে চালককে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও তিন বছরের জেল হবে। চালকদের লাইসেন্স পেতে অষ্টম শ্রেণি ও সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাশসহ ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। আইনভঙ্গে জেল-জরিমানা ছাড়াও লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা এবং ১২ পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালনাসংক্রান্ত ধারা ১৬-এর বিধান লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। তবে এ প্রসঙ্গে সেই প্রবাদ বাক্যটির কথা মনে পড়ে যায়—কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। আইন আছে, আইনের কার্যকারিতা নেই। যারা দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন, তাদের পরিবারের কান্না শোনে কে? এর কি কোনো প্রতিকার নেই? আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না? কেন দেওয়া হচ্ছে না ক্ষতিপূরণ?

 লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

ইত্তেফাক/ইআ