রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জনসংখ্যার চাপে বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে রাজধানী

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২২, ০৮:০২

রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা কত? কিংবা রাজধানীর আয়তন কত? এ নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, ঢাকা শহর জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট। প্রতিনিয়ত বাড়ছে এই শহরের জনসংখ্যা। এটি নিয়ন্ত্রণে নানা সময় বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফল মিলেছে কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সব ধরনের সেবা রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় সবাই ভিড় জমাচ্ছে এখানে। সরকারি অফিস আদালত, ব্যাংকের হেড অফিসসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় মানুষের সামনে বিকল্পও নেই। এছাড়া শিল্প-কলকারখানার অধিকাংশই রাজধানী এবং এর আশপাশে হওয়ার কারণে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস এখানে। শিল্প-কারখানা সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ তেমন হয়নি। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার বিভিন্ন সেবার বিকেন্দ্রীকরণ না করলে অচিরেই বসবাসযোগ্যতা হারাবে ঢাকা।

  • অফিসের পাশাপাশি কারখানা : সবার চোখ ঢাকায়

মফস্বলের কোনো ব্যক্তি যদি তার সন্তানকে ভালো একটি স্কুলে পড়াতে চায় তাহলে প্রথমেই তার চোখ পড়ে ঢাকাতে। শুধু স্কুলই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই ঢাকাতে। এদের সবার ধারণা, মফস্বলে ভালো সেবা মিলছে না। বিভিন্ন-অফিস আদালতের অবস্থাও তাই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, করপোরেশন সবগুলোর অবস্থান ঢাকাতেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সবকিছু ঢাকামুখী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সারা দেশ থেকে রোগী আসে এখানে। অথচ বিভিন্ন জেলা শহরে যদি ভালো মানের হাসপাতাল থাকে তাহলে এখানে এত ভিড় হতো না। 

তিনি বলেন, অনেকে ভালো কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসছে। তাদের ধারণা, এখানে আসলে ভালো কাজ পাওয়া যাবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা যদি মফস্বলে করা যায় তাহলে রাজধানীতে মানুষের চাপ কমবে। তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় সবই ছিল একসময় রাজধানীকেন্দ্রিক। কিন্তু সরকার এসব কারখানা বিশেষ করে গার্মেন্টস কারখানা রাজধানী থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অনেকে তাদের কারখানা সরিয়ে নিলেও এখনো বেশকিছু কারখানা রাজধানীর বুকে রয়েছে। এ বিষয়ে পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি এ বি এম সামছুদ্দিন বলেন, এখন যে কারখানাগুলো রয়েছে সেগুলো সাধারণত সাব-কন্ট্রাক্ট করে। এসব কারখানা কমপ্লায়েন্স না। বড় বড় কারখানাগুলো অন্যত্র সরানো হয়েছে। তবে তাদের অফিস এবং স্যাম্পলিং সেকশন এখানে রাখা হয়েছে। ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে কারখানা থাকার কারণে মানুষের চাপ বাড়ছে। এসব কারখানা শ্রমঘন শিল্প।

  • পরিসংখ্যান ভয়াবহ

রাজধানী ঢাকাতে প্রতি একরে ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষ বাস করে। কিন্তু এই শহরের চারটি এলাকা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ। এ চারটি হচ্ছে—লালবাগ, বংশাল, গেন্ডারিয়া এবং সবুজবাগ। এসব এলাকায় প্রতি একর আয়তনে বাস করে প্রায় ৮০০ মানুষ। তবে মহানগর বা মেগাসিটির মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি একর আয়তনে জনসংখ্যা থাকার কথা ১২০ জন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি) এর তথ্যমতে, রাজধানীর ৬৩ শতাংশ এলাকাতে প্রতি একরে ৩০০ লোক বসবাস করে। ৪০ শতাংশ এলাকায় বাস করে ৪০০ লোকের বেশি। ঢাকার বাইরে জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে দুবাইয়ের আয়াল নাসির এলাকা। সেখানে প্রতি একরে ৬০০ লোকের বাস। তৃতীয় অবস্থানে কেনিয়ার নাইরোবি। সেখানে প্রতি একরে বাস করে ৪৬০ জন। চতুর্থ অবস্থানে মুম্বাইয়ের জাভেরি এলাকা। বিআইপি বলেছে, ঢাকাকে বসবাস অযোগ্যতার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। এজন্য ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ করতে হবে। এজন্য ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো জরুরি। ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম বলেন, জনঘনত্ব বাড়লে নাগরিক সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরিকল্পনামাফিক এগুলে রাজধানীর জনসংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সুবিধাও বাড়বে।

  • বাসযোগ্য শহরের তলানিতে ঢাকা

বাসযোগ্য শহরের একটি তালিকা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ। ২০২১ সালে তারা বাসযোগ্য শহরের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান দেখানো হয় ১৩৭ নম্বরে। বাংলাদেশের নিচের অবস্থানে রয়েছে পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরসবি, নাইজেরিয়ার লেগোস সিরিয়ার দামেস্ক। কিন্তু ঢাকার অবস্থান এত নীচে কেন? ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স বছরখানেক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠি দেয়। সেখানে তারা বলেছে, বসবাসের সূচকে ঢাকার তলানিতে থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অধিক জনঘনত্ব। উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনঘনত্ব এবং অবকাঠোমো ও নাগরিক সুযোগ সুবিধার আলোকে নগরের ভার বহন ক্ষমতা বিবেচনা করা না হলে সেই নগর বাসযোগ্যতা হারায়। ঢাকা শহর এর অন্যতম উদাহরণ। তবে রাজধানীর জন্য যে ডিটেইল এরিয়া প্লান (ড্রাপ) তৈরি করা হয়েছে তাতে মানুষের ঘনত্ব পরিকল্পনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। উল্লেখ্য, ড্রাপের মধ্যে পরিকল্পিত এলাকার জন্য প্রতি একর আয়তনে আড়াইশ জন মানুষের বসবাসের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য এলাকাতে গড়ে ২০০ জনের বসবাসের কথা বলা হয়েছে। তবে বিআইপি তাদের চিঠিতে বলেছে, একটি বড় শহরের জনঘনত্বের জন্য মানদণ্ড ধরা হয় প্রতি একরে ৭০ থেকে ৮০ জন। সেদিক থেকে ঢাকার বর্তমান অবস্থা অকল্পনীয়।

  • পেছনের কথা

১৯৫০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তৎকালীন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩ লাখ ৩৬ হাজার। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই জনসংখ্যা এসে দাঁড়ায় সোয়া ২ কোটিতে। অবশ্য এটি সরকারি হিসাব। কিন্তু ঢাকার জনসংখ্যা কত? ঢাকার আয়তনও বা কত? এ নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধির চিত্রটি এ রকম। ১৯৬১ সালে ৫ লাখ ৪৪ হাজার, ১৯৭১ সালে ১৫ লাখ ২৩ হাজার, ১৯৮১ সালে ৩৫ লাখ ১৯ হাজার, ১৯৯১ সালে ৭০ লাখ ৪১ হাজার, ২০০১ সালে এক কোটি ৭০ লাখ, ২০১১ সালে ২ কোটি ১৫ লাখ ২৬ হাজার এবং ২০২১ সালে এটি সোয়া ২ কোটিতে উন্নীত হয়। ১৯৫১ সালের পর থেকে ঢাকার জনসংখ্যা ১০ শতাংশ হারে বাড়তে থাকে। কিন্তু ১৯৭৪ সাল থেকে এই বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। তখন থেকে ঢাকার জনসংখ্যা সাড়ে ৩ শতাংশ হারে বাড়তে থাকে। অবশ্য রাজধানী ঢাকা শহরের আয়তনও বেড়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকা, সিটি করপোরেশন এবং বৃহত্তর ঢাকা হিসেবে ঢাকাকে বিচার করা হয়। তবে এখন নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর প্রভৃতি এলাকায়ও ঢাকার মতো জনঘনত্ব রয়েছে। এসব এলাকায় অধিকাংশ কারখানা থাকায় মানুষের সমাগমও বেশি।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শোক দিবসের কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা 

বিশেষ সংবাদ

নির্মাণকাজে ধীরগতি, বন্ধ পার্কে ভবঘুরেদের আস্তানা

এটিএম বুথে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ব্যবসায়ী নিহত

বিএনডিএফ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ওসি মনিরুলের সম্পদের অনুসন্ধান চেয়ে দুদকে চিঠি

‘ম্যাট্রিমনি মিডিয়ার ধারণা নতুন হলেও সম্ভাবনাময়’

করোনার টিকা পেলো ৫-১১ বছর বয়সী শিশুরা 

বিমানবন্দর কর্মীদের ‘ভালো ব্যবহারের কোর্স’ করানোর হবে