বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার ন্যায্য দাম পাচ্ছি না কেন? 

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০২:৩৬

এবার একটি সুখবর রয়েছে। শুভ সংবাদটি হলো সারা দেশ থেকে সাভারের ট্যানারিগুলোতে যে কোরবানির পশুর চামড়া এসেছে, তা গত বছরের তুলনায় পশুর চামড়া নষ্ট হওয়ার পরিমাণ বেশ কম। সংবাদমাধ্যমগুলোকে এ কথা জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকেরা। এতে বোঝা যায়, কোরবানির ঈদের দিন পশুর চামড়া সঠিকভাবে ছাড়ানোর সময় আমাদের সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে চামড়াশিল্পের জন্য একটি দুঃসংবাদও রয়েছে যেটা এই শিল্পের বিকাশের বড় একটি অন্তরায় বলে মনে করি। সেটা হলো, বিশ্বের চামড়াজাত পণ্যের বড় বড় ব্র্যান্ড ইউরোপ-আমেরিকার। কিন্তু আমরা সরাসরি তাদের কাছে বহুলাংশে চামড়াজাত পণ্য বিক্রয় করতে না পারায় আর্থিকভাবে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

বিষয়টি একটু পরিষ্কার ও খোলাসা করা প্রয়োজন। ইউরোপ-আমেরিকার ব্র্যান্ডের ক্রেতারা চামড়া কেনার সময় এর মান, ট্যানারিগুলোর পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক রয়েছে কি না তা সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। এজন্য অবশ্যই থাকা লাগে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ। কিন্তু সেই পূর্ণাঙ্গ সনদ আছে আমাদের দেশের একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের। যে কারণে চামড়ার মান ভালো হওয়ার পরও বিশ্ববাজারে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কম দামে চামড়া কিনে নিয়ে যাচ্ছে চীনের কোম্পানিগুলো।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) বলছে, দেশ থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়। রপ্তানির অর্ধেকই যাচ্ছে শুধু চীনে। বাকি ৩০ শতাংশ ব্যবহার হয় দেশের স্থানীয় শিল্পে। রপ্তানিযোগ্য চামড়ার মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং ইউরোপের তিনটি দেশ ইংল্যান্ড, ইতালি ও পতু‌র্গালে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। এছাড়া আমেরিকার কিছু দেশে কিছু চামড়া যায়। এসব দেশ মিলে যে পরিমাণ চামড়া রপ্তানি হয়, তার সমপরিমাণ অথবা কিছুটা বেশি চামড়া রপ্তানি হয় শুধু চীনে। যেখানে চামড়ার দাম ঐসব দেশের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এর কারণটা কী? এর কারণ হলো, শুধু কমপ্লায়েন্স ইস্যু ঠিক না থাকার কারণে আমরা বাধ্য হয়ে চীনের সিন্ডিকেট মার্কেটে পড়ে রয়েছি। এ থেকে কি আমাদের উত্তরণ ঘটবে না? 
বিশ্বব্যাপী অবারিত উৎস থাকার পরও আমরা সেটা কাজে লাগাতে পারছি না, যা দুঃখজনক। চামড়াশিল্পের বৈশ্বিক মানসনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) থেকে আমরা কেন সনদ পাচ্ছি না? এই সনদ পাচ্ছি না বলে বড় বাজার ধরতে ব্যর্থ হচ্ছি। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম পাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে করোনার প্রভাব কাটিয়ে চামড়াজাত পণ্যের বিক্রি বেড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে দামও চড়া। ফলে আমরা কেন আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হবো? ইউরোপ-আমেরিকার ব্র্যান্ডগুলো এখন এলডব্লিউজি সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে। চামড়াশিল্পের উন্নয়ন করতে হলে সরকারকে এই বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই দুঃসময়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে কোনো সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

উল্লেখ্য, চামড়াশিল্প বাংলাদেশের বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি খাত হিসেবে চামড়াশিল্পের অবস্থান ছিল। এ শিল্পের মাধ্যমে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চামড়াশিল্পের সঙ্গে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার জন জড়িত রয়েছেন। ১৯৬৫ সালে ট্যানারির সংখ্যা ছিল ৩০টি। বর্তমানে বাংলাদেশে ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ২০০টি এবং দেশে প্রতি বছর ৩৪ কোটি বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৯০টি বড় পরিসরের পাদুকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ছোট ও মধ্যম ধরনের পাদুকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০-এর অধিক। বাংলাদেশের মোট অশোধিত চামড়ার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ইউনিট এবং এর মধ্যে ৫০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় শুধু ঈদুল আজহার সময়। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের উৎপাদিত চামড়া জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

২০২০ সালে বাংলাদেশে বিশ্বের অষ্টম পাদুকা উৎপাদনকারী দেশ ছিল। এছাড়া চামড়াজাত দ্রব্য যেমন বেল্ট, জ্যাকেট, ব্যাগ ইত্যাদি বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে চামড়ার জুতা রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। বিশ্বের মোট চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্যের চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা হয়। উপর্যুক্ত তথ্য প্রমাণ করে, আমাদের দেশের চামড়াশিল্পের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা অত্যধিক। তবে চামড়াশিল্পের কারণে বায়ু, পানি, মাটি প্রভৃতি দূষণ বৃদ্ধি পায়। সরকারকে চামড়া শিল্পের এই দূষণের পরিমাণ হ্রাস করার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। দূষণরোধ করার জন্য হাজারী বাগের ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু গতকাল ইত্তেফাকের এক খবরে বলা হয়েছে, সাভারের ট্যানারিগুলির কারণে তুরাগ, বংশী ও ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে এখন তিনটি নদী হয়ে উঠছে বিষময়। এখানে আধুনিক কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি চালু ও কার্যকর করা অতি প্রয়োজন। আমরা জানি, সরকারের ‘লেদার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দূষণ অনেকাংশে রোধ করা যাবে বলে আশা করা যায়। এছাড়াও রাজশাহী এবং চট্টগ্রামে দুটি নতুন ‘ট্যানারি ভিলেজ’ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। গবাদি পশু চামড়া সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়াটির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। ছোট এবং মধ্যম পরিসরের ট্যানারিগুলোর অনেক সময় অর্থসংকট দেখা যায়। ট্যানারিগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া ট্যানারিগুলোর বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়া উন্নত করতে হবে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দূর করতে হবে।

আমরা যদি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়াটি পরিবেশবান্ধব করতে পারি, তাহলে এলডব্লিউজি সনদ পেতে ও ইউরোপ-আমেরিকার বাজার ধরতে আমাদের কোনো বেগ পেতে হবে না। সেদিকেই আমাদের মনোযোগ এখন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন