শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মানবতার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩৩

আমরা একটি ক্রান্তিকালে বসবাস করিতেছি। কোভিড-১৯ মহামারির কষ্ট, যন্ত্রণা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকিয়া আমাদের প্রার্থনা ছিল কবে শেষ হইবে এই দুঃসময়। করোনা মহামারি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতিতে আমরা এই আশায় বুক বাঁধিয়া ছিলাম যে, পৃথিবীতে সকল কিছু আবার স্বাভাবিক হইয়া আসিবে; কিন্তু করোনার ধকল না কাটিতেই বিশ্ববাসী ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কবলে পড়িয়া জ্বালানি ও খাদ্যসংকটে হাহাকার করিয়া উঠিল। ইহারই মধ্যে ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘর্ষ, ইরান ও উত্তর কোরিয়া ইস্যু লইয়া উত্তেজনা, বিশ্বে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা, কসোভো-সার্বিয়া অশান্তি এবং সর্বশেষ মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফর লইয়া চীন-আমেরিকা দ্বৈরথ, যুদ্ধের মহড়া ইত্যাদি আমাদের নূতন করিয়া ভাবাইয়া তুলিতেছে। পৃথিবীতে আরো যুদ্ধ আসন্ন এমন ভবিষ্যদ্বাণীতে আমরা আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।

পৃথিবী নামক এই গ্রহে আরো কী ঘটিবে তাহা আমরা জানি না। শুধু এইটুকু জানি, ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে দেশে দেশে যে মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন দেখা দেয়, তাহা ঠেকাইতে গিয়া এখন মন্দার কবলে পড়িয়াছে বিশ্ব অর্থনীতি। ইহাতে সমগ্র বিশ্বে, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে অশান্তি ও অস্থিরতা আরো বাড়িবে। তাহার পরও মানুষ আশা লইয়াই বাঁচিতে চাহে। এমন আশাবাদের ছোট্ট একটি ঘটনা ঘটিয়াছে ইউক্রেনে। যে ইউক্রেনকে বলা হয় পৃথিবীর শস্যভান্ডার এবং যেইখানে যুদ্ধের কারণে খাদ্য সরবরাহ করিতে না পারায় বিশ্বে খাদ্যসংকট দেখা দিয়াছে, সেই ইউক্রেন হইতে খাদ্যবোঝাই প্রথম জাহাজটি বন্দর ছাড়িয়াছে। তুরস্ক ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যে চুক্তি হয়, তাহার অধীনে এই জাহাজ ২৬ হাজার টন খাদ্যশস্য লইয়া ওডেসা বন্দর হইতে রওয়ানা হইয়াছে। এই খবর আমাদের জন্যও আশাব্যঞ্জক। কেননা, যেই সকল দেশে ইউক্রেনের গম সবচাইতে অধিক রপ্তানি হয়, তাহার মধ্যে প্রথম তিনটি দেশ হইল মিশর, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ।

উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর দিকেই রাশিয়া ইউক্রেনের বন্দরগুলি অবরোধ করিয়া ফেলে। ইহাতে পৃথিবীব্যাপী উপরোক্ত খাদ্যশস্যের সংকট দেখা দেয়। কেননা, খাদ্যশস্য রপ্তানির দিক দিয়া বিশ্বে ইউক্রেনের অবস্থান চতুর্থ। বিশ্বের সানফ্লাওয়ার তেলের ৪২ শতাংশ, ভুট্টার ১৬ শতাংশ ও গমের ৯ শতাংশ উৎপাদিত হয় ইউক্রেনে। জানামতে, আরো ১৬টি জাহাজ ৬ লক্ষ টন খাদ্য লইয়া ওডেসা ও তাহার আশপাশের বন্দরগুলিতে অপেক্ষা করিতেছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যাইবে। এই খাদ্যবাহী জাহাজগুলির যাতায়াত নিষ্কণ্টক হইলে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ যেই সকল দেশে খাদ্যের অভাব দেখা দিয়াছে, তাহার অনেকটা পূরণ করা সম্ভব হইবে। ইহা পৃথিবীব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্বস্তিদায়ক। ইহাতে বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের দাম হ্রাস পাইবে। এই যে মানবতার সামান্যতম রেশ আমরা দেখিতেছি, ইহাতে যতই শর্তারোপ করা হউক না কেন, এই উদ্যোগকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত। ইহাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের নাগরিকগণেরও কিছু অর্থসংস্থান হইবে।

চতুর্দিকে যখন শক্তিধর দেশগুলি আগুন লইয়া খেলিতেছে, তখন ইহার মধ্যেও মানবতার কিছু স্ফুরণ দেখা গেল। ইহাই বা কম কীসের? একবিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্ত্তচু্যত হইয়াছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশের যেই সকল মানুষ একসময় সচ্ছল জীবনযাপন করিত, তাহারা এখন অন্য দেশে গিয়া শরণার্থীর খাতায় নাম লেখাইয়াছে। যুদ্ধ তাহাদের রাতারাতি ভিখারিতে পরিণত করিয়াছে। এই মুহূর্তে তিনটা বড় শক্তির দেশ যেই ভাষায় কথা বলিতেছে, তাহাতে মনে হইতেছে তাহাদের কণ্ঠ দিয়া আগুন বাহির হইতেছে। অতএব, ইহার মধ্যেও যাহারা মানবতার জয়গান গাহিলেন এবং বিশ্ববাসীর দুর্ভোগ দূরীকরণে কাজ করিলেন, তাহাদের আমরা সাধুবাদ জানাই। পৃথিবীতে যখন আরেকটা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে এবং যুদ্ধবিগ্রহের কারণে আমাদের বিবেক দংশিত হইতে হইতে যখন শূন্য হইয়া পড়িবার দশা তৈরি হইয়াছে, তখন মানবতার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন