শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যুবশক্তির মানসপটে বিভাসিত শেখ কামাল 

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ০৪:২০

শোক ও বেদনাবিধুর একটি মাসের নাম আগস্ট। বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার জায়গায় একটি বড় ধরনের আঘাত আসে এ আগস্ট মাসেই। বাংলাদেশের স্থপতি ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে নিহত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। শেখ কামাল বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে। যুব-তারুণ্যের অহংকার শেখ কামালও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সেদিন শাহাদতবরণ করেন। ঘুরেফিরে শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে আগস্ট ফিরে আসে আমাদের মধ্যে। 

১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট শেখ কামালের জন্ম হয়। ১৯৭৫ সালের মৃত্যুর এক মাস আগে তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। অর্থাৎ ১৯৭৫-এর ১৪ জুলাই কৃতিত্বের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। ক্রীড়া ও সংস্কৃতির প্রাণ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন যুব বয়সেই। ১৯৭২ সালে ক্রীড়াজগতের কিংবদন্তি নাম আবাহনী ক্লাব গঠন করেছিলেন, যে ক্লাব ক্রীড়া ঐতিহ্য ধারণ করে প্রবহমান খরস্রোতা নদীর মতো আজও বহমান। ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন আত্মোপলব্ধির সোপান হিসেবে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উৎকর্ষসাধনে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির নিগূঢ় সত্যে নির্ভরশীল হতে পারলে সবকিছুই কল্যাণমুখী হবে—এ বোধ তার মধ্যে প্রবলভাবে জেগে উঠেছিল। অথচ তাকে নিয়ে কত প্রপাগান্ডা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র কামালকে নিয়ে কত রকম মিথ্যাচার করেছে। কিন্তু সত্য যে কত শক্তিশালী একটি অনুষঙ্গ তা শত্রুরা বুঝতে পারেনি। সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে সত্য উদ্ভাসিত হয় প্রকৃতির নিয়মেই। তিনি নিহত হলেও কিছুই হারাননি, বরং সমৃদ্ধ করেছেন সকল যুবক ও সংস্কৃতিমান মানুষকে একই পথের সহযাত্রী জ্ঞানে।

শেখ কামাল রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের পুত্র ছিলেন, তিনি পর্যাপ্ত ক্ষমতাধর হলেও ক্ষমতা প্রয়োগে সচেতন ছিলেন। মানুষের কল্যাণ দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগাতে ক্রীড়া-সংস্কৃতিকে বিশেষ দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ কথাটি পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত যে, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি যদি জীবন চলার অন্যতম প্রধান বাহন হয়, তাহলে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। এটা কোয়ান্টাম পদ্ধতিতেও স্বীকৃত। জীবাত্মার পক্ষে পরমাত্মার সম্পর্ক তৈরি হলে অকল্যাণকর কোনো কিছুই স্পর্শ করতে পারে না। শেখ কামাল সে পথেই হাঁটছিলেন। কিন্তু কিছু লোক কামালের সঙ্গে কৃত্রিম বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করে তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে তারা সফল হলেও পরবর্তীকালে তারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

আজ শেখ কামালের জন্মদিন উপলক্ষ্যে লিখতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই এত কথা আমাকে বলতে হলো। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে করোনা, ডেঙ্গু ও বন্যার প্রভাবে নানাভাবে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। আমরা একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে কথার যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছি। এ মুহূর্তে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমাদের তারুণ্যশক্তির একটা ব্যাপক মজুত থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেই। যুব ও তারুণ্যকে দুর্যোগে কাজে লাগাতে একটা নেতৃত্ব দরকার। তাই শেখ কামালের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। যুবশক্তিকে কীভাবে জনতার কল্যাণে কাজে লাগানো যায় তা শেখ কামাল দেখিয়ে গেছেন। প্রিয় পাঠক, আপনাদের হয়তো অনেকের জানা নেই। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর প্রথম এই ভয়াবহ বন্যায় সারা বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের অবকাঠামোও ছিল দুর্বল। বন্যাকবলিত মানুষকে বাঁচাতে সরকারি কর্ম-তৎপরতার বাইরেও শেখ কামাল ক্রীড়াবিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন অসহায় মানুষের কল্যাণে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগসহ নানা রোগে আক্রান্তদের স্বাস্থ্যসেবায় নানা কর্মসূচি প্রণীত হয়েছিল কামালের নেতৃত্বে। তখনকার আবাহনী ক্লাব অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। দেশের প্রান্তিক ক্রীড়াবিদদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন মানবতার সেবায়। তখন তো আর এত মিডিয়া ছিল না, সেজন্য তার কর্মকাণ্ড ব্যাপক প্রচারেও আসেনি। তবে তিনি প্রচারের জন্য কাজ করেননি। আজকাল তো জনসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণের আগেই প্রচারমাধ্যমকে ‘ঠিক’ করা হয় প্রচারের জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তিবৃদ্ধি ও কোটি কোটি মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে সাহায্য করতে প্রয়োজন একটি তত্ত্বনির্ধারক দর্শনের। যে দর্শন শেখ হাসিনা দিয়েছেন উত্তরাধিকারভাবেই তিনি সেটা দিতে পেরেছেন। উল্লেখ্য, ক্ষমতা লাভের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু জানতে হবে কীভাবে রাষ্ট্রের কল্যাণে জনতার কল্যাণে এর প্রকৃষ্ট ব্যবহার করা যায়। ক্ষমতার দাম্ভিকতা নয়; ক্ষমতাকে হজম করতে হবে। সেই হজমশক্তি আসে জীবনের অন্তর্নিহিত এক গভীরতার উৎস থেকে, যা মানবসত্তার আধ্যাত্মিক প্রকৃতি। সেই শক্তির বিকাশ ঘটাতে পারলে সবকিছুই সহজ হয়ে যাবে। তখন কোনো অবিচার নয়, কোনো দলন নয়, কোনো শোষণ নয়, কেবল মানবিকতার ভাব জেগে উঠবে। সেবার ভাবই অনুপ্রাণিত করবে সারা কর্মজীবন।

শেখ কামালের জন্মদিনে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বলতে চাই, অবশেষে মহাদুঃখ অবসান প্রায় প্রতীত হচ্ছে। মহানিদ্রায় নিদ্রিত তার শব যেন জাগ্রত হচ্ছে আমাদের এই মাতৃভূমিতে। গভীর নিদ্রা পরিত্যাগ করে তিনি জেগে উঠছেন কোটি যুবকের প্রাণে। আর কেউ গতিরোধ করতে পারবে না। কোনো বহিঃশক্তিই এখন আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না। কুম্ভকর্ণের দীর্ঘ নিদ্রা ভাঙতে চলেছে, বাঙালি তার পায়ের ওপর দাঁড়াবেই।

লেখক: কলাম লেখক

ইত্তেফাক/এএইচপি