শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শেখ কামাল ও বাংলাদেশের যুবসমাজ 

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ০৪:৪৫

আজ ৫ আগস্ট যুবসমাজের অহংকার শহিদ ক্যাপটেন শেখ কামালের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান শেখ কামাল একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ ছিলেন। বাবা-মার আদর্শ সন্তান, তারুণ্যের প্রতীক শেখ কামাল ছিলেন অমায়িক, দক্ষ সংগঠক, বৈজ্ঞানিক রাজনৈতিক চিন্তার অধিকারী, মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সেনা কর্মকর্তা, ভালো ছাত্র, সংস্কৃতিমনা, দক্ষ ক্রীড়াসংগঠক, মানবতার কল্যাণে বিশ্বাসী একজন উদীয়মান প্রগতিশীল সমাজসচেতন নেতা। যে নেতার নেতৃত্ব থেকে বাঙালি জাতি বঞ্চিত হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের যুবসমাজ। শেখ কামাল ছিলেন বাবা-মায়ের আদর্শ সন্তান। নিরহংকার একজন সাদামনের মানুষ। অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। অতি সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। পোশাকে-আশাকে, কথাবার্তায়, চালচলনে কেউ বলে না দিলে অথবা না জানলে বোঝার উপায় ছিল না, উনি বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান।

শেখ কামাল অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। ছয় দফা এবং ১১ দফা দাবি আদায়ের সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে ছাত্রলীগকে সঙ্গে নিয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সুফল পেতে তিনি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় লাভের মধ্য দিয়ে বস্ত্তত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সূচনা ও প্রস্ত্ততি শুরু হয়।

শেখ কামাল একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নেন মুক্তিযুদ্ধ করার জন্য। উনি শুধু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকও ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলতে অদম্য এবং অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ, মুক্তিবাহিনী এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা ও অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের একটি অনস্বীকার্য অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধে শেখ কামালের এই অবদানের কথা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সবাই জানেন। অথচ নির্লোভ প্রচারবিমুখ সত্যিকারের দেশপ্রেমিক এই মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির আশায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট পর্যন্ত নেননি।

শেখ কামাল একজন দক্ষ মেধাবী সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, উনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকালীন সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজ যোগ্যতা বলে মুক্তিযুদ্ধে বাহিনীপ্রধান জেনারেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বাংলদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপটেন পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তারুণ্য ও মানবতার প্রতীক শেখ কামাল সেনাবাহিনীর লোভনীয় পদবি এবং চাকচিক্যময় জীবন ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্নাতকোত্তর ফলাফল তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। শেখ কামাল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাধারণ ছাত্রদের মতো ক্লাস, এমনকি টিউটোরিয়ালে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। ভালো ছাত্র ও সাংগঠনিক প্রতিভার অধিকারী শেখ কামাল স্কুলজীবনে ডাবল প্রমোশনও পেয়েছিলেন। শাহীন স্কুলে পড়ার সময় তার অমায়িক ব্যবহার এবং নেতৃত্বদানের গুণাবলির জন্য তিতুমীর হাউজের ক্যাপটেন নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেখ কামাল একজন উদীয়মান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠক ছিলেন। স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠীর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, ছায়ানটের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। 

শেখ কামাল নিজেই ভালো গান গাইতেন, সেতার ও গিটার বাজাতেন। ক্লাসিক্যাল মিউজিক চর্চার অনুরাগী হিসেবে তখনকার সংগীতাঙ্গনে তিনি পরিচিত ছিলেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের যুবসমাজের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এবং জাতি গঠনে তার সংগীত অনুরাগ এবং সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেভাবে যুবসমাজকে বিপথে পরিচালিত করতে চাইছিল সেই অপশক্তির হাত থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা এবং সঠিক পথে পরিচালনার জন্য শেখ কামালের সংস্কৃতিচর্চা একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। আমরা জানি, সংস্কৃতিচর্চা মানুষের সৃজনশীল গুণাবলির বিকাশ সাধন করে। একজন সৃজনশীল মানুষ কখনই ভয়ংকর কিছু করতে পারে না। একজন সৃজনশীল মানুষ সব সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের চিন্তা করেন। শেখ কামাল এভাবেই বাঙালি জাতির যুবসমাজকে ইতিবাচকভাবে সংগঠিত করতে উদ্যোগী ছিলেন। সংগীতে অনুরাগের পাশাপাশি বহু প্রতিভার অধিকারী শেখ কামাল একজন দক্ষ ক্রীড়াবিদ এবং ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন। বাংলাদেশে আধুনিক ক্রীড়া জগতের যাত্রা শুরু হয় শেখ কামালের হাত ধরে। একজন দক্ষ ক্রীড়াবিদ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সুস্থ দেহমনের অধিকারী মানুষ হলো প্রকৃত মানবসম্পদ। 

আজকের বাংলাদেশে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে যাওয়ার জন্য আমরা বর্তমান যুবসমাজকে যেভাবে দক্ষ মানবসম্পদে গড়ে তুলতে চাইছি, শেখ কামাল ১৯৭২ সালেই সেটা চিন্তা করেছিলেন। স্বাধীনতার পরপরই তিনি আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে আধুনিক ধারায় পেশাদারি খেলাধুলার সূচনা করেন। বিদেশ থেকে পেশাদারি কোচ এনে দেশে খেলোয়াড় তৈরির প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা নেন, যা দেশের যুবসমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেখ কামালের দূরদর্শিতা এবং অনন্য ভূমিকার ফলে খেলাধুলা পেশাদারিত্ব লাভ করে এবং খেলাধুলা যুবসমাজের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বিভ্রান্ত যুবসমাজ শেখ কামালের দেখানো পথে পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের শক্তি ও উদ্যম দিয়ে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াজগতের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে শেখ কামালের তারুণ্যের আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে গেল। দেশের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এলো শূন্যতা ও বিষাদের ছায়া। কলঙ্কজনক এই হত্যাকাণ্ডে জাতির জনকের সঙ্গে বাঙালি শেখ কামালের মতো উদীয়মান নেতাকেও হারায়।

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াশীল ধারার সূচনা হয়, শুরু হয় ইতিহাস বিকৃতি। মিথ্যা ও বিকৃত তথ্যপ্রবাহ এবং প্রচারের মাধ্যমে ইতিহাসের নায়ক-মহানায়কদের খলনায়কে পরিণত করার অপচেষ্টা চলতে থাকে। শেখ কামালের তারুণ্যনির্ভর প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়া কার্যক্রম মুছে ফেলার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের যুবসমাজকে বিপথগামী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। খেলাধুলা ও সংস্কৃতির ধারার পরিবর্তে যুবসমাজের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িকতা এবং বৈষয়িক ভাবধারার জন্ম দেওয়া হয়। দেশের যুবসমাজের বিরাট অংশ অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, টেন্ডারবাজি, জবরদখল, বখাটেপনা প্রভৃতি অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি স্বীয় স্বার্থে যুবসমাজের এই অধঃপতনে প্রশয় ও সহযোগিতা করে। দেশের একশ্রেণির যুবসমাজ আদর্শের পথ হারায়, সত্য ইতিহাস জানতে না পেরে শেখ কামালের দেখানো সংস্কৃতিমনা প্রগতিশীলতার পথ হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা ও শেখ কামালের বড় বোন বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রকৃত ইতিহাস এবং যুব সমাজের জন্য রেখে যাওয়া শেখ কামালের কর্ম, জীবন এবং আদর্শিক ভাবনার পুনর্জাগরণ হয়। যুবসমাজ নতুন করে অনুপ্রেরণা পায়, কিন্তু শেখ কামালের অবর্তমানে ইতিমধ্যে যে ক্ষতি ও আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটেছে তা শিগগির পূরণ হওয়ার নয়। তাই আজ জন্মদিনে শেখ কামাল এবং তার জীবনাচরণ শ্রদ্ধাভরে স্মরণে আসছে। অমর এই প্রতিভাবান ক্ষণজন্মা সংগঠক শেখ কামাল বাঙালি যুবসমাজের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক। রাষ্ট্র যতদিন শেখ কামালকে ধারণ করবে ততদিন, পথ হারাবে না বাঙালি যুবসমাজ।

লেখক: প্রো-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এএইচপি