শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিজ্ঞান প্রচারে রবীন্দ্রনাথ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২২, ০৬:০০

মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উনিশ শতকে ছাপাখানার ইতিহাস শুরু। প্রায় একইসঙ্গে বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চারও সূচনা। বিজ্ঞানগ্রম্হ প্রকাশের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা মুদ্রিত হতে দেখা যায় সাময়িকীগুলোতে। একসময় বাংলাভাষায় বিজ্ঞান পত্রিকারও আত্মপ্রকাশ ঘটে। বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তত্কালে অনেকেই। তাঁদের একটা বড় অংশ বিজ্ঞানী ছিলেন না, কিন্তু বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটিয়েছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখে।

রবীন্দ্রনাথের কাছে বিজ্ঞান ছিল সংস্কৃতিরই একটা অঙ্গ। তাই বিজ্ঞানের মাঝে লুকিয়ে থাকা রসকে বারংবার চিনে নিতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনদর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে বিজ্ঞান মনস্কতা। মাত্র সাড়ে বারো বছর বয়সে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ অস্বাক্ষরিত বিজ্ঞানভিত্তিক একটি প্রবন্ধ লেখেন; শিরোনাম ‘গ্রহগণ জীবের আবাসভূমি’। সাধনা, ভারতী, নবপর্যায়-বঙ্গদর্শন, ভাণ্ডার ও তত্ত্ববোধিনী—এই পাঁচটি পত্রিকা রবীন্দ্রনাথ সম্পাদনা করেছেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের পারিবারিক মুখপত্র ‘বালক’ পত্রিকার তিনি ছিলেন কর্মাধ্যক্ষ। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত ‘বালক’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মেজ বৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর নাম ছাপা হলেও আসলে বালকের লেখা নির্বাচন ও সম্পাদনার যাবতীয় কাজ সামলাতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। 

বালক পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নরেন্দ্রবালা দেবীর প্রবন্ধ ‘সূর্যের কথা’। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের বড় মেয়ে সৌদামিনীর পুত্র সত্যপ্রসাদ। সত্যপ্রসাদের স্ত্রী নরেন্দ্রবালা দেবী। বালক পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় (বঙ্গাব্দ ১২৯২-এর জ্যৈষ্ঠ) লিখেছিলেন ‘সূর্যকিরণের ঢেউ’ ও তৃতীয় সংখ্যায় (বঙ্গাব্দ ১২৯২-এর আষাঢ়) ‘সূর্যকিরণের কার্য’। নরেন্দ্রবালার এই লেখাগুলোতে নিউটনের কথা এসেছে। বালক পত্রিকার কার্তিক ১২৯২ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখলেন ‘বৈজ্ঞানিক সংবাদ’। বিজ্ঞানের সাহিত্য কী করে রমণীয় সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে তারই নিদর্শন রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই লেখায়—‘পণ্ডিতবর টাইলর সাহেব বলেন পরীক্ষা করিয়া দেখিলে উদ্ভিদের কার্যেও কতকটা যেন স্বাধীন বুদ্ধির আভাস দেখিতে পাওয়া যায়। বৃক্ষ নিতান্ত যে জড়যন্ত্রের মতো কাজ করে তাহা নহে, কতকটা যেন বিচার করে চলে। টাইলর সাহেব এই বিষয়ে অনেক বত্সর ধরিয়া পরীক্ষা করিয়া আসিতেছেন। তিনি বলেন কৃত্রিম বাধা স্হাপন করিলে গাছেরা তাহা নানা উপায়ে অতিক্রম করিবার চেষ্টা করে, এমনকি নিজের সুবিধা অনুসারে পল্লব সংস্হানের বন্দোবস্ত পরিবর্তন করে থাকে।’ 

রবীন্দ্র-অগ্রজা স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা বড় প্রবন্ধ ‘ছায়াপথ’ বালক পত্রিকার ফাল্গুন ১২৯২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। স্বর্ণকুমারী দেবীকে যেমন পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করেছিলেন, তেমনই করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ কৈশোরেই চিনে ফেলেছিলেন আকাশ ভরা সূর্য তারা, গ্রহ-নক্ষত্র। রবীন্দ্র রচনায় রয়েছে সে বর্ণনা। ‘পৃথিবী’ স্বর্ণকুমারীর লেখা বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক পুস্তক, ১২৮৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। ‘সাধনা’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ মুখ্যত নিজেই বিজ্ঞানের হাল ধরেছিলেন। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই ‘বৈজ্ঞানিক সংবাদ’ নামে বিভাগ চালু করেছিলেন, সেটা ১২৯৮ বঙ্গাব্দ, অগ্রহায়ণ। এই বিভাগেই ছাপা হয় তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক চারটি লেখা—১. গতিনির্ণয়ের ইন্দ্রিয়, ২. ইচ্ছামৃতু্য, ৩. মাকড়সা-সমাজে স্ত্রী জাতির গৌরব, ৪. উটপক্ষীর লাথি। পরের সংখ্যাতে একই বিভাগে আরো তিনটি লেখা—১. জীবনের শক্তি, ২. ভূতের গল্পের প্রামাণিকতা, ৩. মানবশরীর। 

পত্রিকার সূচনা থেকেই রবীন্দ্রনাথ পাঠকদের বিজ্ঞানসচেতন করে তোলার পরিকল্পনা নেন । তাই কাগজের প্রথম দুটি সংখ্যায় বিজ্ঞান নিয়ে নিজেই লিখলেন। পরে এই বিভাগে অন্যদের দিয়ে বিজ্ঞানের নানা প্রবন্ধ লেখাতে লাগলেন। সাধনায় মুদ্রিত কয়েকটি প্রবন্ধ ও তাঁর রচয়িতার নাম—‘জ্যোতির্বিজ্ঞান-স্পেকট্রোস্কোপ ও ফটোগ্রাফি’—সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১২৯৮ বঙ্গাব্দ মাঘ; ‘আকাশ তরঙ্গ’—রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ জ্যৈষ্ঠ, ‘প্রতীচ্য গণিত’—জগদানন্দ রায়, ১৩০১ বঙ্গাব্দ আষাঢ় । রবীন্দ্রনাথের লেখা স্বতন্ত্র বিজ্ঞান প্রবন্ধ ‘ভূগর্ভস্হ জল এবং বায়ুপ্রবাহ’, ১৩০১ বঙ্গাব্দ আশ্বিন। ১৩০৫ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় জগদানন্দ রায়ের লেখা ‘বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গ’। 

১৩০৮ থেকে ১৩১২ বঙ্গাব্দ, এই সময়পর্ব রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় বিজ্ঞান প্রচারের ভূমিকা যথেষ্ট উজ্জ্বল। উনিশ শতকের বঙ্গদর্শনে বঙ্কিমচন্দ্র বিজ্ঞানকে একটি বিশেষ স্হান ও মর্যাদা দিয়েছিলেন। বঙ্গসমাজে বিজ্ঞানকে প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। নবপর্যায় বঙ্গদর্শনে রবীন্দ্রনাথও সেখান থেকে সরে এলেন না। এই পত্রিকায় বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ ও সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথের বিশেষ সহায়ক হলেন জগদানন্দ রায়। বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রম্হ ‘বিশ্ব পরিচয়’ যখন লেখেন কবি, তাঁর বয়স তখন ৭৬ বছর। এই বইতে ভূলোক, গ্রহলোক, সৌরজগত্, নক্ষত্রলোক, পরমাণুলোক, অতিক্ষুদ্র এবং অতিবৃহত্ বিশ্বের নানা তথ্য ও তত্ত্বের জটিল ও দুরূহ বিষয়ের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে ও মাতৃভাষায়। রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞান প্রচারের ক্ষেত্রে যে অগ্রসর চেতনার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলা ভাষাভাষীর জন্য গৌরবের সামগ্রী। 

লেখক: প্রকৌশলী, জার্মান ইন্সটিটিউট অব অলটারনেটিভ এনার্জির বাংলাদেশ প্রতিনিধি 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন