বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২, ২ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিধানসমূহ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২২, ০৬:২২

আমাদের সমাজে নারী ও শিশুদের ওপর ঘৃণ্য অপরাধের জন্য দণ্ডবিধির বিধানসমূহ অপর্যাপ্ত থাকায় সরকার ১৯৯৫ সালে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ১৯৯৫’ প্রণয়ন করেন, যা সর্বশেষ ২০২০ সালে সংশোধিত হয় এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ নামে অভিহিত।

সংশোধিত এ আইনের উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন এবং একজন আইনজীবী হিসেবে আইনি পরামর্শ দিতে গিয়ে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা ভিকটিম যেসব বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন, তা অভিজ্ঞতার আলোকে আলোচনার প্রয়াস থেকে আজকের এই লেখা।

পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকার করলে করণীয় : প্রথম যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তা হচ্ছে, পুলিশের কাছে অভিযোগ করার পরেও পুলিশ মামলা গ্রহণ করছে না। এখন কী করব? সাধারণত অপরাধের শিকার ব্যক্তির বর্ণিত ঘটনা এমন থাকে যে, অপরাধ যিনি করেছেন (অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি) তিনি স্হানীয়ভাবে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুলিশ গ্রহণ করছেন না। ওপরে বর্ণিত বর্ণনা অনুযায়ী কারণ বা অন্য যে কোনো কারণে হোক, কোনো অভিযোগকারী যদি পুলিশের কাছে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ করার অনুরোধ করে ব্যর্থ হন, তাহলে এই আইনের ২৭ ধারা অনুযায়ী অভিযোগকারী ব্যক্তি কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে কোনো অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়েছেন—এই মর্মে হলফনামা সহকারে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কাছে অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন অপরাধ বিচারের জন্য প্রত্যেক জেলা সদরে একটি করে ট্রাইব্যুনাল থাকে (প্রয়োজন অনুসারে একাধিক ট্রাইব্যুনালও থাকতে পারে)। এইরূপ ট্রাইব্যুনাল ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’ নামে অভিহিত বা পরিচিত।

কখন এই আইনের ১১ (গ) ধারার অধীন মামলা দায়ের করা যায় :বৈবাহিক জীবনে পারস্পরিক মনোমালিন্যের জের ধরে ঘটে যাওয়া শারীরিক নির্যাতনের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই সবাই ১১(গ) ধারা, যৌতুকের জন্য সাধারণ আঘাত মামলা করতে চান। শারীরিক নির্যাতন বা মারামারি ঘটলেই তার জন্য ১১(গ)-তে ঢালাওভাবে মামলা করা যাবে না। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ঘটলে কেবল তখনই ১১(গ)-তে মামলা করা যায়। বিবাহিত জীবনে অন্য কোনো কারণে (যেমন:পরকীয়া আসক্ত হয়ে, ঝগড়া ইত্যাদি) মনোমালিন্য থেকে শারীরিক আঘাতে সাধারণ বা গুরুতর আঘাত করলে তার জন্য দণ্ডবিধির অধীন মামলা হতে পারে, তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০২০-এর অধীনে মামলা চলবে না।

বিএলসি (২০২০) ৮৫৭ :তালাকের পরে অর্থাৎ পূর্বে সংগঠিত অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান অবস্হায় সংঘটিত অপরাধের জন্য ন্যায়বিচারের স্বার্থে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১১ (গ) ধারার অধীনে মামলা করতে পারবেন। তালাক হয়ে যাওয়া বা দাম্পত্য সম্পর্ক আর না থাকাতে মামলা করার অধিকার শেষ হয়ে যায় না। ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর মামলা চলবে কি না, তা বিচার চলাকালীন সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। [মো. তৌয়ব আলী মোল্লা বনাম সুলতান এবং গং ২২ বিএলটি ৮৮]

মামলা আপস করা যাবে কি না : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ সালের পর ১১(গ) ধারা যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম ঘটানো অপরাধ এখন আপসযোগ্য। যৌতুকের দাবিতে সাধারণ জখম ঘটনানোর অপরাধে মামলা চলাকালীন পক্ষদ্বয়ের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে এবং তারা বর্তমানে একত্রে বসবাস ও দাম্পত্য জীবন বলবৎ রেখেছেন মর্মে আদালতে আপসমূলে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন।

রায় ঘোষণার পরও আপস করা যাবে কি না : মামলার বর্তমান অবস্হা অনুযায়ী যদি মামলা শেষে অভিযুক্ত ব্যক্তি দণ্ডিত হন, তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৬১-এ অনুযায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ আপসের অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দিয়ে দণ্ডিত দরখাস্তকারীর দণ্ড বাতিল এবং সাজা মওকুফ করতে পারবেন। [সাইফুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র ২৫ বিএলসি (২০২০) ৭৫৮]

আপিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কোনো আদেশ রায় বা আরোপিত দণ্ড দ্বারা সংক্ষুব্ধ পক্ষের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করার সময় ৬০ দিন। সংক্ষুব্ধ পক্ষ যদি উল্লিখিত সময় পার করে ফেলে, তাহলে তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ধারা ৫-এর অধীনে বিলম্ব মওকুফ পাবে না। কারণ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন একটি বিশেষ আইন।

মিথ্যা মামলা, অভিযোগ দায়ের দণ্ডনীয় অপরাধ : অভিযুক্ত ব্যক্তির অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মিথ্যা অভিযোগ, মামলা দায়ের করায় সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে, যদি কোনো ব্যক্তি কারো ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে, ন্যাঘ্য বা আইনানুগ কারণ না জেনেও এই আইনের কোনো ধারার অধীনে মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেন, তাহলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ।

অন্য উল্লেখযোগ্য সংশোধনীসমূহ :এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০-এর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সংশোধনীসমূহ হচ্ছে ৯(১) ধারার অধীন ধর্ষণের শাস্তি বর্তমানে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয়।

ধারা ৩২-এর অধীন ‘অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিক্যাল পরীক্ষা’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিক্যাল পরীক্ষা’ শব্দগুলি প্রতিস্হাপিত হয়েছে।

সেই সঙ্গে ধারা ৩২-এর পরে ধারা ৩২ক সন্নিবেশিত হয়েছে, যথা ৩২ক অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (DNA) পরীক্ষা। এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা ৩২-এর অধীন মেডিক্যাল পরীক্ষা ছাড়াও, উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, DNA আইন, ২০১৪ -এর বিধান অনুযায়ী উঘঅ পরীক্ষা করতে হবে।’ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ একটি বিশেষ আইন, যা সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত। তবে আইনের অধীনে আনীত অভিযোগ পোক্ত ও জোরালো আইনগত সাক্ষ্য দ্বারা অবশ্যই প্রমাণিত হতে হবে।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন