বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বরিস জনসন ও রাজনীতিতে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২২, ০৬:৫০

বরিস জনসনের বিদায়ের মধ্য দিয়ে আরো একবার সামনে এলো রাজনীতির চিরাচরিত দৃশ্য। ক্ষমতার পালাবদলের চরম নিয়তি হলো—যতটা আগ্রহ-আনন্দ নিয়ে ক্ষমতায় আসেন নেতারা, বিদায় বেলায় তা আর থাকে না; বরং দেখা যায় উলটো চিত্র। ক্ষমতাসীন কোনো প্রধানমন্ত্রীকেই হাসোজ্জ্বল বদনে বিদায় নিতে দেখা যায় না। সাগ্রহে, সানন্দে ক্ষমতা ছাড়তে চান না কেউই। ব্রিটেনের রাজনীতিতে দু-একটি ব্যতিক্রম রয়েছে বইকি। তবে, বাকি সব ক্ষেত্রেই চরম নিয়তিকে মেনে নিয়েই অফিস ত্যাগ করতে হয়েছে ব্রিটেনের নেতাদের। মেজাজ খারাপ করে কিংবা ক্ষোভে ফুঁসতে থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের প্রাক্তন বাসিন্দা হার্বার্ট অ্যাসকুইথ এবং এডওয়ার্ড হিথের বেলায়ই একই বিষয় ঘটেছে। এ দুজন নেতাও তাদের পতনকে মেনে নিতে পারেননি। মানিয়ে নিতে পারেনি বেদনাবিধুর বিদায়কে। কাকতালীয়ভাবে তারা দুজন এবং বরিস জনসন শিক্ষা লাভ করেছেন একই অক্সফোর্ড কলেজে!

ইতিহাস বলে, বেশির ভাগ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীই অন্ততপক্ষে একটি ভালো মানের ‘গ্রহণযোগ্যতা’ থাকা অবস্হায় বিদায় নিতে চান। যদিও তা বেশ ‘দাঁত নিশপিশ’ করা বিষাদময় মুচকি হাসির মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কারো কারো অবশ্য পরবর্তীকালে অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় কাজ করার নজিরও আছে। আর্থার বেলফোর, নেভিল চেম্বার লেন এবং অ্যালেক ডগলাস-হোম আছেন এই তালিকায়। বেশ কিছু রসাত্মক ঘটনাও আছে এ নিয়ে। যেমন—১৯৩৭ সালে স্ট্যানলি ব্যাল্ডউইন তার বিদায়ের সময় ডাউনিং স্ট্রিটের দরজায় এক পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন—পায়ে স্প্রিং নিয়ে তিনি বেরিয়ে যাচ্ছেন!

বস্ত্তত ক্ষমতা এমন একটি ‘ওষুধ’ যা শুরুতে রাজনীতিবিদরা ভালোভাবেই গ্রহণ করেন। তবে যখন ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সময় আসে, তা হয়ে ওঠে বেদনাদায়ক এবং অপমানজনক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও চরম ব্যথা নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। যদিও মার্কিন জটিল সিস্টেম পরিস্হিতিকে সামলে নিয়েছে। ‘ঘা’কে নরম করার জন্য বিকল্প ওষুধ ব্যবহার করতে পেরেছেন মার্কিনিরা। যার অভাব রয়েছে ব্রিটেনের। মানতেই হবে, ক্ষমতা হারানোর বেদনা অনুভব করেন সবাই। এমনকি সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরাও এর ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন না। ক্ষমতা অপসারণের বিরুদ্ধে লড়াই একটি প্রাকৃতিক প্রতিচ্ছবি, যার মোকাবিলা করতে হিমশিম খেতে হয় সকলকেই।

রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে আমরা এটা জানি। কিন্তু এই শিক্ষার প্রতিফলন আছে পুরাণেও। ওয়াগনারের মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্ত্ত হলো—দেবতাদের অধিপতি ওটানের যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রচেষ্টা। তিনি যে কোনো উপায়ে বিশ্বশক্তিকে ধরে রাখতে মরিয়া। তবে শেষমেশ ওটান স্বীকার করেন যে, তার যুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধে হেরে গেছেন তিনি। এই গল্পের মধ্য দিয়ে ওয়াগনার মূলত দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা একটি বাস্তব বার্তা দিতে চেয়েছেন। বার্তাটি হলো, পুরোনো ব্যবস্হা ভেঙে নতুন ব্যবস্হার উদয় ঘটবে। পুরোনো আদেশের পরিবর্তে আসবে সম্পূর্ণ নতুন আদেশ। নিয়তি এটাই। এই নিয়তির ব্যত্যয় ঘটানো মুশকিল। যদিও ক্ষমতার পালাবদলে ভঙ্গুর শক্তি নিয়েও ক্ষুধার্তের মতো আচরণ করে বিদায়ি শক্তি। যেমনটা করেছে গল্পের ওটান—ভগ্ন সামর্থ্য নিয়েও ক্ষুধার্তের মতো আচরণ করেছে, অবশেষে হয়েছে পরাজিত।

জনসন দেবতাদের প্রভু নন। তবে হাস্যকর কথা হলো, তিনি একবার কথাচ্ছলে বলেছিলেন—‘আমি সমগ্র বিশ্বের রাজা হতে চাই’। কিন্তু ওটান কিংবা পূর্বে বিদায় নিতে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের মতো তাকেও যে বিদায় নিতে হবে চুপিসারে—এই বাস্তব সত্য মানতে পারছেন না তিনি। তিনি যে আর ক্ষমতার মঞ্চে নেই, তিনি যে আর নেতৃত্ব দিতে পারবেন না, ব্রিটেনের জনগণ যে আর তার নেতৃত্ব মেনে নিতে চান না— এই সত্য জানার পরও এর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন জনসন। বরং জনসনের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়াই করা আরো বেশি কঠিন। এর জন্য দায়ী তার ‘নিজের ঢাক ঢোল নিজেই পেটানো’ দৃষ্টিভঙ্গি। এরূপ ব্যক্তিত্ব নিয়েই স্পটলাইটের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে তাকে। যদিও এর ফলাফল সবারই জানা—দেশের প্রচলিত নিয়ম ও প্রথা উপেক্ষা করে তিনি যে ‘সুনাম’ কুড়িয়েছেন তা তাকে তার উপযুক্ত গন্তব্যেই নিয়ে যাবে।

এই সম্ভাবনা এখনো অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে যে, জনসন আসলে কি করতে চলেছেন। তিনি কি প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করবেন? নাকি করুণ, মস্তকবণত বিদায়ই তার শেষ পরিণতি; এসব নিয়ে জনসনের সমর্থক কিংবা বিরোধীরা রয়েছেন এক বিরাট দোলাচলের মধ্যে। জনসনের বিরুদ্ধে যে প্রচারাভিযান চলছে তাতে উঠে আসছে তার নানা অতীত কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডগুলো। উঠে আসছে, তিনি ডাউনিং স্ট্রিট বক্তৃতায় কী সব আবোলতাবোল বকেছেন। ডাউনিং স্ট্রিটে জন্মদিনের পার্টি করে তিনি যে বিশ্বাসঘাতকতার বীজ বপন করেছিলেন, তাতেই মূলত তার বিদায়ঘণ্টা বেজে যায়—সবার পক্ষ থেকে দাবি ওঠে—‘হাস্তা লা ভিস্তা’—বিদায়, বিদায়।

নানা রকম ঘটনা সামনে আসছে। এই সপ্তাহের একটি সংবাদ বলছে, টোরি সদস্যদের ৫৩ শতাংশ মনে করে যে, জনসনকে ক্ষমতাচ্যুত করা ভুল ছিল। এখন লিজ ট্রাস এবং ঋষি সুনাককে তাদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে রাখার অর্থও হচ্ছে জনসনের দ্বিতীয় আগমনকে এগিয়ে রাখা। যদিও বাস্তবতা বলছে, এই সম্ভাবনা ম্লান হবে, বই কিছুই নয়।

এ রকম কিছু ঘটবে বলে যারা বলছেন তারা সম্ভবত কিছু বাস্তবতা এড়িয়ে চলছেন কিংবা বুঝতে ভুল করছেন। বর্তমান নিয়ম অনুসারে, টোরি নেতৃত্বের রিটার্নে প্রার্থী হতে জনসনকে অবশ্যই একজন এমপি থাকতে হবে প্রথমে। এটি কয়েকটি বিষয়কে সামনে আনছে। যেমন—জনসন পার্টিগেটের বিষয়ে সংসদকে বিভ্রান্ত করেছেন কি না সে বিষয়ে কমন্সের বিশেষাধিকার কমিটি রিপোর্ট করার পরে তাকে স্হগিত করা এড়াতে হবে। তাছাড়া, সাধারণ নির্বাচনে তাকে অবশ্যই তার উক্সব্রিজ এবং দক্ষিণ রুইসলিপ নির্বাচনি এলাকা ধরে রাখতে হবে, যা সহজ নাও হতে পারে এবং সবশেষে, সেপ্টেম্বর থেকে তিনি কমন্সে কী ভূমিকা পালন করবেন, তা তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবেচিন্তে।

এখানে বিভিন্ন কৌশলের মতোই আসবে ‘মেজাজের’ প্রশ্নও। স্বভাবগতভাবে জনসন শুধুমাত্র স্পটলাইটেই আসতে চাচ্ছেন না, বরং প্রতিশোধও চান তিনি। তিনি স্বভাবতই প্রতিশোধপরায়ণ এবং অবিশ্বাসী। কারণ একটি জাতির পুরো প্রজন্মের টোরি প্রতিভাকে কুক্ষিগত করেছেন তিনি। মনে রাখতে হবে, মার্গারেট থ্যাচার ১৯৯০ সালে ক্ষমতাচু্যত হওয়ার পর নিজের অবস্হান ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি চেষ্টা করেছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত তাকে হাঁটতে হয়েছে ব্যর্থতার পথ ধরে। জনসনের ক্ষেত্রেও বিপরীত কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না।

জনসনের আসল সমস্যা হচ্ছে ‘কৌশলের অভাব’। কোন কৌশল ধরে হাঁটছেন তিনি? তিনি মূলত প্রতিশোধ নেওয়ার আশায় আছেন। এই জনসন হলেন এমন একজন জনসন, যিনি ব্যাকবেঞ্চ থেকে টোরিকে নেতৃত্ব দিতে চাচ্ছেন। এবং তারপর সুযোগ বুঝে নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ করবেন। ক্ষমতায় বসতে চাইবেন। সে ক্ষেত্রে একটি জটিল হিসাবনিকাশ আছে। যদি সুনাক জিতে যায়, তবে এই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু যদি ট্রাস জিতে যায়, তাহলে তো এই প্রচেষ্টা আর খাটবে না। ট্রাস এখন ডানের নতুন নেতা এবং তিনিই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে জনসন যদি প্রত্যাবর্তন চান, তবে তিনি কেবল ট্রাসের ব্যর্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন। কিংবা তাকে কীভাবে ব্যর্থ করা যায়, সেই চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু, তা কি বাস্তবে আদৌ ঘটবে? কাজেই, জনসনের বেলায় কোনো কৌশলই খাঁটছে না! সম্ভবত জনসন টোরি পার্টিতে নেতৃত্বের প্রতিশোধের গল্প শুরু করতে চলেছেন, যা হ্যামলেটকে লজ্জায় ফেলে দেবে। জনসন মূলত একজন জন্মগত অভিনয়শিল্পী। শেষ পর্যন্ত তিনি আর কী কী করতে পারেন—সেটাই সামনের দিনে দেখার বিষয়।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের সহযোগী সম্পাদক এবং কলামিস্ট

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন